kalerkantho


বিএনপির মাথাব্যথা নেই নিবন্ধন নিয়ে

এনাম আবেদীন ও কাজী হাফিজ   

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিএনপির মাথাব্যথা নেই নিবন্ধন নিয়ে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যদি অংশ নাও নেয় তবু সামনের দুটি উপনির্বাচনে অংশ নিলেই নিবন্ধন রক্ষা হবে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী দল বিএনপির। কিন্তু নিবন্ধন রক্ষার ওই সুযোগকে পাত্তা দিতেই রাজি নয় দলটি। যদিও উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নে বিএনপি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসলে নিবন্ধন নিয়ে দলটির কোনো মাথাব্যথাই নেই।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০জ অনুচ্ছেদের ১(ঙ) ধারা অনুসারে কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল পর পর দুই মেয়াদে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সেই দলের নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে।

সরকারি দলের কয়েকজন নেতা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, আগামী (একাদশ) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়াটা বিএনপির জন্য বাধ্যতামূলক। ফলে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন বর্জন করলে বিএনপির নিবন্ধন বাতিল হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে। কিন্তু সম্প্রতি শূন্য হওয়া গাইবান্ধা-১ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নিলে দলটির নিবন্ধন বাতিল হওয়ার আশঙ্কা আর থাকে না।

এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০জ-এর (ঙ) ধারায় ‘পর পর দুই মেয়াদে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলে’ বলা হয়েছে। এতে ‘সাধারণ নির্বাচন’ কথাটি উল্লেখ নেই। সে কারণে নিবন্ধিত যেসব দল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়নি সেসব দল এই সংসদের কোনো সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে অংশ নিলে তাদের ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাতিলের ওই ধারাটি প্রযোজ্য হবে না।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হকের মৃত্যুতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ এবং সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফার মৃত্যুতে গাইবান্ধা-১ আসনটি শূন্য রয়েছে। গত ৯ জানুয়ারি ইসি জানিয়েছে, ওই দুটি আসনের উপনির্বাচন হবে আগামী ১৩ মার্চ এবং এর তফসিল ঘোষণা করা হবে ৫ ফেব্রুয়ারি।

ওই দুটি উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে কৌশলগত কারণে বিএনপি লাভবান হতে পারে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে। আবার কৌশলগত কারণে শুধু নিবন্ধন রক্ষার জন্য উপনির্বাচনে অংশ নেওয়া বিএনপির জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, নিবন্ধন বাতিল হবে এই ভয়ে বিএনপি রাজনীতি করে না। তিনি আরো বলেন, ‘উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে নিবন্ধন রক্ষার চিন্তাও আমরা করি না।’ তিনি জানান, বিএনপি যে রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে নিবন্ধন থাকবে কি থাকবে না সেটি বিষয়ই নয়। রাজনীতির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাই বিএনপির এখনকার উদ্দেশ্য।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এটি নীতিগতভাবেই বিএনপি করবে না। তিনি বলেন, ‘নিবন্ধন বাতিলের ভয় বিএনপি পায় না। একটি রাজনৈতিক দল রাজনীতি করে তার আদর্শ বাস্তবায়ন তথা গণতন্ত্র রক্ষার জন্য, নিবন্ধন রক্ষার জন্য নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘দশম সংসদের কোনো উপনির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। দশম সংসদকে আমরা বৈধ বলে মনেও করি না।’

বিএনপি স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার অবশ্য জানান, উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। সাবেক এই স্পিকার বলেন, ‘যদি দল সিদ্ধান্ত নেয় যে নির্বাচনে যাবে না, সে ক্ষেত্রে নিবন্ধন থাকা না থাকায় কিছু এসে যায় না। তা ছাড়া নিবন্ধন পরে আবারও নেওয়া যাবে।’

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি ও এর মিত্ররা। এরপর রংপুর-৬, টাঙ্গাইল-৮, বরিশাল-৫, নারায়ণগঞ্জ-৫, সিরাজগঞ্জ-৩, মাগুরা-১, মৌলভীবাজার-৩, টাঙ্গাইল-৪, গাইবান্ধা-১, ময়মনসিংহ ১ ও ৩ এবং সুনামগঞ্জ-২ আসনে উপনির্বাচন হলেও বিএনপি তাতে অংশ নেয়নি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয় এবং সে অংশগ্রহণকে ‘কৌশলগত’ বলে দাবি করে দলটি। যদিও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়ার সঙ্গে দলের নিবন্ধন থাকা না থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নয়।

তবে গাইবান্ধা-১ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে কৌশলগত কারণে বিএনপি লাভবান হতে পারে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ দশম সংসদ নির্বাচনকে বিএনপি ‘অবৈধ’ বলে মনে করে। আবার ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ’ সরকারের দাবি পূরণ না হলে একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলটি অংশ নেবে কি না তাও এখনো নিশ্চিত নয়। বর্তমান সরকারের অধীনে এবং প্রশাসনসহ রাষ্ট্রযন্ত্রকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্বাচন হলে তা শেষ পর্যন্ত বিএনপি বর্জন করতে পারে বলে বিএনপির পাশাপাশি বাইরেও আলোচনা আছে। সম্ভাব্য এমন পরিস্থিতিতে নিবন্ধন বাতিলের প্রসঙ্গটি আলোচনায় বারবার উঠছে। আবার সরকারি দলের নেতারাও প্রসঙ্গটি বারবার তুলে বিএনপিকে চাপে রাখতে চাইছেন। কিন্তু যে সংসদ নির্বাচনকেই বিএনপি ‘অবৈধ’ বলে মনে করে, সেই নির্বাচনের কোনো উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার অর্থ দশম সংসদকে বৈধতা দেওয়া বা মেনে নেওয়া, যা কৌশলগত কারণেই বিএনপির জন্য সহজ হচ্ছে না।     

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই সময় নিবন্ধিত ৩৮টি দলের সবকটিই অংশ নিয়েছিল। ইসি সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সে কারণে ওই দলগুলোর মধ্যে যেসব দল দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ইসির নেই। তবে দশম জাতীয় সংসদের সাধারণ ও উপনির্বাচনে যে ২৫টি দল অংশ নেয়নি সেসব দল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ না নিলে তাদের নিবন্ধন বাতিল হতে পারে। অবশ্য এ বিষয়ে ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দলগুলো হাইকোর্টে আপিল করার সুযোগ পাবে।


মন্তব্য