kalerkantho


হাতুরাসিংহের শ্রীলঙ্কাকে বিক্ষত করে ফাইনালে বাংলাদেশ

মাসুদ পারভেজ    

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



হাতুরাসিংহের শ্রীলঙ্কাকে বিক্ষত করে ফাইনালে বাংলাদেশ

শ্রীলঙ্কা বধের দুই নায়ক সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের উচ্ছ্বাস। ছবি : মীর ফরিদ

বাংলাদেশ : ৫০ ওভারে ৩২০/৭ শ্রীলঙ্কা : ৩২.২ ওভারে ১৫৭ ফল : বাংলাদেশ ১৬৩ রানে জয়ী

সফল হতে গেলে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স লাগেই। সেটি বাংলাদেশ পেয়েছেও। তবে ২০১৫-র বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের উত্থানে চন্দিকা হাতুরাসিংহের ক্রিকেট মেধার তারিফ করতেও দ্বিধা করে না কেউ। সাফল্য এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে ধুরন্ধর এই ট্যাকটিশিয়ানকেও অন্যতম অস্ত্র বলে ধরা হয়ে এসেছে তাই। তিনি চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ায় অস্ত্রটা হাতছাড়া হলেও ট্রেনিংটা যে নয়, তাঁর বর্তমান দল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই সেটির অনুপম এক প্রদর্শনী হয়ে গেল কাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে।

সদলবলে সেটি করল বাংলাদেশ। হয়তো সদ্য সাবেক কোচকে দেখিয়ে দেওয়ার তাগিদ থেকে আরো বেশি। জ্বলে ওঠার সে তাড়নায় ব্যাটে-বলে সম্মিলিত পারফরম্যান্সের এমন এক ফুল ফুটল, যার সৌরভে সুরভিত বাংলাদেশ। আর কাটায় একদম ক্ষতবিক্ষত হাতুরাসিংহের শ্রীলঙ্কা। তা নয়তো কী? স্বাগতিকদের ৩২০ রান তাড়া করতে নেমে ১৫৭ রানেই গুটিয়ে গিয়ে ১৬৩ রানের বিশাল ব্যবধানের হার, যা আবার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ের রেকর্ডও। রানের দিক থেকে এর আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয় ১৬০ রানের, ২০১২ সালে খুলনায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। রেকর্ড জয়ের পাশাপাশি টানা দুই ম্যাচে বোনাস পয়েন্টসহ জেতায় ত্রিদেশীয় সিরিজে মাশরাফি বিন মর্তুজার দলের ফাইনালও নিশ্চিত হয়ে গেল।

সেই সঙ্গে এটিও প্রমাণিত হয়ে গেল যে খেলোয়াড়রা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে না পারলে হাতুরাসিংহের মতো কোচও এমন কোনো পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন না। তিনি হেড কোচ থাকাকালীন বাংলাদেশের সিনিয়র ক্রিকেটাররা একযোগে পারফর্ম করতে শুরু করেছিলেন। এবার প্রতিপক্ষ শিবিরে থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতেও পেলেন সেই প্রাণ ভোমরাদেরই হুলের ব্যথাতুর স্বাদ। কেউ নিজেকে মেলে ধরলেন না? ক্রমেই নিজেকে পরিণত করতে থাকা তামিম ইকবাল যথারীতি উজ্জ্বল। তিন নম্বরে নেমে সাকিব আল হাসানও করলেন বলের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া ব্যাটিং। তুলনায় সেটি আরো বেশি করলেন মুশফিকুর রহিমও।

তামিম দশম ওয়ানডে সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েও ফিরলেন ৮৪ রান করে। তাঁর সঙ্গে ফিফটি সাকিব (৬৩ বলে ৬৭) ও মুশফিকেরও (৫২ বলে ৬২)। সময়ের দাবি মিটিয়ে মাহমুদ উল্লাহও (২৩ বলে ২৪) খেললেন ছোট্ট কিন্তু কার্যকর ইনিংস। শেষে তরুণ সাব্বির রহমানও (১২ বলে ২৪*) ঝড় তুলে দলকে নিয়ে গেলেন সোয়া তিনশোর কাছাকাছি। জিম্বাবুয়ে ম্যাচে দুই বাঁ হাতি স্পিনারকে দিয়ে শুরু করানো মাশরাফি এবার ছক পাল্টে শুরুতে নিয়ে এলেন অফস্পিনার নাসির হোসেনকে। বাংলাদেশের বিপক্ষে বেশ কিছু ভালো ইনিংস খেলা কুশল পেরেরা যে বাঁ হাতি। ফলও মিলল দ্রুতই, তৃতীয় ওভারেই ফিরে গেলেন ঝড় তুলতে জানা এ ওপেনার।

আর নাসিরের সঙ্গে অন্য প্রান্তে শুরু করা অধিনায়ক মাশরাফি টানা ৮ ওভারের স্পেলে নিজেও কম গেলেন না। ৩০ রান খরচায় তুলে নেন অন্য ওপেনার উপুল থারাঙ্গা (২৫) ও কুশল মেন্ডিসকে (১৯)। দারুণ ব্যাটিংয়ের অনুপ্রেরণা বোলিংয়েও অবদান রাখার তাগিদ বাড়িয়ে দিয়েছিল সাকিবেরও। তিনি সেই কাজ শুরুর আগে মুস্তাফিজুর রহমান শ্রীলঙ্কার উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান নিরোশান ডিকভেলার স্ট্যাম্প এলোমেলো করে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরার পথ খোলেন আরো। শিকারযজ্ঞ শুরুর আগে অবশ্য কাজের কাজ আরেকটি করেছেন সাকিব। ইনজুরিতে পড়া নিয়মিত অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুজের পরিবর্তে লঙ্কানদের নেতৃত্ব দেওয়া দীনেশ চান্দিমালকে (২৮) এক্সট্রা কাভার থেকে সরাসরি দুর্দান্ত এক থ্রোতে করেছেন রানআউট।

১০৬ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ততক্ষণে ব্যাটিং মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে সফরকারীদের। এরপর দরকার ছিল শুধু সেই চাপটা অব্যাহত রেখে যাওয়া। পরপর দুই বলে আসেলা গুনারত্নে (১৬) ও ওয়ানিদু হাশারাঙ্গাকে (০) তুলে নিয়ে তা রাখেনও সাকিব। এরপর নিভে যাওয়ার আগে ধপ করে কিছুক্ষণ জ্বললেন থিসারা পেরেরা। একই ওভারে দুটি করে ছক্কা আর বাউন্ডারি মেরে হলেন সেই সাকিবেরই শিকার। ঝড়ো ব্যাটিংয়ের পর ৪৭ রানে ৩ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি একটি রানআউট। নাহ, ম্যাচ সেরা হওয়ার ক্ষেত্রে এই ম্যাচেও সাকিবের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না কেউ।

তবে মাঠে নিজেদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা অবশ্যই আছে। একই ম্যাচে তাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে যথাক্রমে ১১ ও ১০ হাজার রানের মাইলফলক পেরোলেন তামিম ও সাকিব। দ্বিতীয় উইকেটে ম্যাচ সর্বোচ্চ ৯৯ রানের পার্টনারশিপও তাঁদেরই গড়া। পারফর্ম করার প্রতিযোগিতায় শামিল হলেন অন্য সিনিয়র ক্রিকেটাররাও। যাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত হয়েছেন হাতুরাসিংহের সময়ে। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে মাশরাফিকে জোর করে অবসরে পাঠানোর নেপথ্যে যে ওই লঙ্কানই মূল ভূমিকা রেখেছেন, সেটি আর এখন গোপন কোনো বিষয় নয়। টেস্ট অধিনায়ক মুশফিককে নিয়ে হাতুরাসিংহের সমস্যাও শেষে আরো প্রকাশ্য হয়ে গিয়েছিল। টেস্ট দলে মাহমুদ উল্লাহর জায়গাও নড়ে গিয়েছিল তাঁর সময়েই। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের টেস্ট সিরিজ থেকে সাকিবের ছুটি নেওয়াও ভালো চোখে দেখেননি হাতুরাসিংহে।

তাই মুখে না বললেও তাঁকে দেখিয়ে দেওয়ার জেদ মনে নিশ্চিতভাবেই ছিল তাঁদের। সেটিরই সম্মিলিত প্রকাশ কাল বুঝিয়ে দিল অস্ত্র হাতছাড়া হলেও সমস্যা হয় না যদি সদলবলে পারফর্ম করার ট্রেনিংটা থাকে! যে ট্রেনিংয়ের সার্থক প্রয়োগে ক্ষতবিক্ষত খোদ হাতুরাসিংহেও!


মন্তব্য