kalerkantho


রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু নিয়ে সংশয়

অঙ্গীকার সত্ত্বেও রাখাইন থেকে এ দেশে আসা ঠেকাচ্ছে না মিয়ানমার

মেহেদী হাসান   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু নিয়ে সংশয়

মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী আগামীকাল সোমবারের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়াটি এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। তবে প্রত্যাবাসনের আগে আরো বেশ কিছু কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

এদিকে প্রত্যাবাসন উদ্যোগের মধ্যেও রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। বিষয়টি প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মুখপাত্র ফিয়োনা ম্যাকগ্রেগর গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে গত ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ছয় লাখ ৫৫ হাজার ৫০০ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নতুন করে এসেছে।

সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সপ্তাহের শেষ দুই দিনে শতাধিক রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়ায় এসেছে। গতকালও এসেছে প্রায় ৫৫ জন রোহিঙ্গা।

প্রত্যাবাসন উদ্যোগের মধ্যে নতুন করে রোহিঙ্গা আসায় সমস্যা সৃষ্টি হবে কি না জানতে চাইলে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সমস্যা তো বটেই। একদিকে আমরা ফেরত পাঠানোর কথা বলছি, অন্যদিকে যদি আরো আসতে থাকে—এটা তো একটা বিভ্রান্তিকর বিষয়। সে জন্যই তাদের (মিয়ানমারকে) অনুরোধ জানানো হয়েছে, লোক আসা বন্ধে তারা যেন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়।’ তিনি বলেন, ‘যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সময়ও মিয়ানমারকে বলা হয়েছিল। গত সপ্তাহের বৈঠকেও মিয়ানমারকে জোরেশোরে বলা হয়েছে।’

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়ার বিষয়ে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার বলেন, “এক হিসাবে প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া তো শুরু হয়েই গেছে। প্রত্যাবাসন চুক্তি, যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডাব্লিউজি) গঠন ও কার্যপরিধি নির্ধারণ, জেডাব্লিউজির প্রথম বৈঠক ও ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ সই হয়েছে। সেই হিসাবে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া তা শুরু হয়েছে।’ তিনি বলেন, ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজ আছে। সেগুলো সম্পন্ন করতে কিছু সময় লাগতে পারে।

আগামীকাল ২২ জানুয়ারি প্রত্যাবাসন শুরু সম্ভব কি না জানতে চাইলে মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, ‘২২ জানুয়ারি সম্ভব নয়। এখানে প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। তালিকা তৈরি করা, কারা যাবে, স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে আগ্রহী হওয়া, তালিকা তাদের (মিয়ানমার) দেওয়া—এই প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করেই প্রত্যাবাসন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সুতরাং ২২ তারিখেই শুরু হবে—এমনটা মনে হয় সম্ভব নয়।’

উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের দুই মাসের মধ্যেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা। গত ২৩ নভেম্বর চুক্তি সইয়ের পর দুই মাস পূর্ণ হচ্ছে আগামীকাল। ঢাকার সরকারি সূত্রগুলো বলছে, আগামী সোমবার না হলেও খুব শিগগির প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরু করতে চায় বাংলাদেশ। তবে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শঙ্কার মধ্যে এখনই রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে রাজি করানোও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। যে জঙ্গিগোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) কথিত হামলার প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার বাহিনী গত ২৫ জানুয়ারি রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযান শুরু করেছিল, সেই আরসাও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন উদ্যোগের সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছে। কথিত আরসা আসলে কার স্বার্থে কাজ করে তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে সন্দেহ রয়েছে। তবে মিয়ানমার গত সপ্তাহে আরসা সম্পর্কে বাংলাদেশকে সতর্ক করে বলেছে, ওই গোষ্ঠী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া বানচালের চেষ্টা চালাতে পারে।

এদিকে মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয় কয়েক শ ‘আরসা জঙ্গি’র ছবি প্রকাশ করে তাদের সম্পর্কে তথ্য চেয়েছে।

গত সপ্তাহে নেপিডোতে জেডাব্লিউজির প্রথম বৈঠক শেষে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আগামী ২২ জানুয়ারিই প্রথম দফায় ৭৫০ জন মুসলমান ও ৫০৮ জন হিন্দু রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে চায় মিয়ানমার। মিয়ানমার সরকার এরই মধ্যে তাদের তথ্য যাচাই-বাছাই করেছে। প্রত্যাবাসনের জন্য প্রথম দলে তাদের রাখতে মিয়ানমার বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছে।

মিয়ানমার কিভাবে তাদের পরিচয় যাচাই করেছে তা স্পষ্ট নয়। এর আগে মিয়ানমার একতরফাভাবে হিন্দু রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন শুরুর ঘোষণা দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ শুরুতেই ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রত্যাবাসন উদ্যোগকে সমর্থন করেছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত সপ্তাহে মিয়ানমারের সঙ্গে সমঝোতা অনুযায়ী বাংলাদেশ এ দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পরিবারভিত্তিক তালিকা তৈরি করে নেপিডোকে দেবে। মিয়ানমার সেগুলো যাচাই-বাছাই করে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেবে।


মন্তব্য