kalerkantho


উদোম রাজার দেশে অসহায় রাজকন্যা

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



উদোম রাজার দেশে অসহায় রাজকন্যা

মাইকেল ওলফের ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’ গ্রন্থ নিয়ে কেন তোলপাড়? জানতে পড়ুন বাছাই অংশ। ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস

‘... বাচ্চা এফবিআইপ্রধানকে ছাঁটাই করতে যাচ্ছে।’ এ গালি ট্রাম্পকে দিয়েছিলেন তাঁরই বন্ধু, ফক্স নিউজের সাবেক সিইও রজার এইলস। আশঙ্কাটি সত্যিও হয়েছিল। রজার এইলস ১২ মে নিউ ইয়র্ক ফিরবেন পাম বিচ থেকে, ট্রাম্প সমর্থক পিটার থিয়েলের সঙ্গে মিলে নতুন একটি টিভি চ্যানেল খোলার কথা পাকা হবে। রজার ও থিয়েল উদ্বিগ্ন, ‘ট্রাম্পবাদ’ সর্বনাশ ডেকে আনছে; ঠেকাতে দরকার নতুন নিউজ চ্যানেল। বৈঠকের

দুই দিন আগে রজার বাথরুমে পড়ে মাথায় চোট খেলেন। কোমায় যাওয়ার আগে তিনি স্ত্রীকে শুধু এটুকু বলতে পেরেছিলেন, ‘থিয়েলের শিডিউলটা পিছিয়ে দিয়ো না।’ কিন্তু এক সপ্তাহ পর মারাই গেলেন রজার। ২০ মে পাম বিচে শেষকৃত্য, রজারের শোকার্ত স্ত্রী অভিমানে স্বামীর অনুসারীদেরই শুধু আসতে বলেছিলেন। শেষকৃত্যের দিন সকাল। বিমানে করে উড়ে আসছে ফক্স নিউজের বর্তমান ও সাবেক সাংবাদিকদের একটি দল। দলটির সদস্যরা জানতেন, ট্রাম্প বন্ধুর স্ত্রীকে সহানুভূতি জানিয়ে একটা ফোন পর্যন্ত দেননি। ওই প্রসঙ্গ উঠলে সাংবাদিক লিজ ট্রট্টা বলেন, ‘হি ইজ অ্যান ইডিয়ট, অবভিয়াসলি।’ অশ্লীল গালি আটকাতে পারলেন না সিন হান্নিটি : ‘হোয়াট দ্য ফা...ইজ রং উইথ হিম?’

ডোনান্ড ট্রাম্পের জয়ে বিশ্বের উদারপন্থীদের নেতৃত্ব যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব হলো এর উল্টো। যুদ্ধবাজ বুশ, পিঠে ছুরি মারা ক্লিনটন ও অতিবাস্তববাদী ওবামার পর অন্য রকম ট্রাম্পে আরববিশ্ব একটা ভরসা দেখল। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ট্রাম্পের যদি কোনো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে থাকে তা ছিল ‘ইরান ইজ ব্যাড গাই’। আর ইরানবিরোধী মানেই ‘গুড গাই’। যেন শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু! এবার চলুন ঘুরে আসি সৌদি পরিবারের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মেদ বিন সালমান বিন আবুল আজিজ আল সাউদ ওরফে ‘এমবিএস’-এর প্রাসাদ থেকে। তখন এমবিএসের বাবা সৌদি কিংয়ের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সৌদি রাজপরিবারের সবাই অনুভব করছে আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা। এমবিএস নিজে যদিও ভিডিও গেমের পোকা, সৌদি নেতৃত্বে নতুন ব্যক্তিত্বের দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। ট্রাম্পের ও সৌদি নেতৃত্বে একটা মজার মিল আছে। যেমন এমবিএস (মোহাম্মেদ বিন সালমান) জানাশোনার দৌড় সৌদি পর্যন্তই। এই দিক থেকে ট্রাম্প ও এমবিএস যেন এক পাটাতনে দাঁড়ানো। ‘তুমি কম জান, আমিও কম জানি! যুক্তরাষ্ট্রের এত দিনের পররাষ্ট্রনীতির মূলে ছিল হুমকি ও আত্মস্বার্থের মতো কিছু বিষয়ের বীজগণিত। ট্রাম্পের রাজত্বে কষা হচ্ছিল সরল অঙ্ক। ফর্মুলায় তিন শক্তি : যেসব শক্তির সঙ্গে আমরা কাজ করতে পারি, যেসব শক্তির সঙ্গে আমরা কাজ করতে পারি না এবং আরো একটি পক্ষ যাদের বেশি শক্তিই নেই এবং আমরা ছাড় দিতে পারি। আর এখানে চালকের আসনে জামাই কুশনার; যাঁকে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে চীন, মেক্সিকো, কানাডা এবং এই সৌদি আরবকে দিয়ে।’

ক্রাউন প্রিন্স এমবিএসও আমেরিকা ছুটে এলেন রাজতন্ত্রে নিজেদের ‘পাওয়ার প্লে’ পোক্ত করতে। হোয়াইট হাউস তাঁকে স্বাগত জানাল, বিনিময়ে ক্রাউন প্রিন্স আশ্বাস দিলেন এক ঝুড়ি চুক্তির। প্রেসিডেন্টও বললেন, ‘আমি সৌদি আরব আসছি। আরো পরে সৌদি আরবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের গাড়িবহর ছুটছে, রাজপথের দুই পাশে ঢাউস সব বিলবোর্ডে ট্রাম্প ও সৌদি কিংয়ের (এমবিএসের ৮১ বছর বয়সী বাবা) বিশাল প্রতিকৃতি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম দেশের বাইরে পা রাখা ট্রাম্প সৌদি আরবের জনগণের উদ্দেশে বলেন, তাঁর এই সফর ‘গেম চেঞ্জার’ তথা দিনবদলের নিয়ামক হবে, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের পথে নিয়ে আসবে বড় অগ্রগতি। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে, এরপর সৌদি আরব ১১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যে আমেরিকান অস্ত্র ক্রয় করবে এবং ১০ বছরে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনবে মোট সাড়ে তিন শ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র। এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরো বক্তব্য ছিল, ‘যুক্তরাষ্ট্রে শ শ বিলিয়ন ডলারের (সৌদি) বিনিয়োগ এবং চাকরি, চাকরি, অসংখ্য চাকরি।’

রিয়াদ থেকে জেরুজালেম গিয়েছিল প্রেসিডেন্টবহর। নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখা করে ট্রাম্প পৌঁছলেন বেথেলহেম; এবার সাক্ষাৎ আব্বাসের সঙ্গে। হাওয়ায় ভাসল আশাবাদ, ‘ট্রাম্পের হাত ধরে শান্তি আসছে!’ তারপর ট্রাম্প রোম গেলেন, পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে। সেখান থেকে ব্রাসেলস, যার ফলে পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির নতুন করে সংযোগও স্থাপিত হবে। তবে তাঁর এই মেগা বিদেশ সফর, প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিগত দিনগুলোর মূল্যায়ন—সব কিছুতেই একটা বিষয় বারবার প্রমাণ হচ্ছিল, ট্রাম্প কজ অ্যান্ড অ্যাফেক্ট কি জানেন না; অর্থাৎ কারণ ছাড়া যে কার্য হয় না এ তার বোধেরই অতীত।

ট্রাম্পকে নিয়ে তাঁর চারপাশের মানুষগুলোর ভাবনা তাহলে কী? প্রাসঙ্গিক এ প্রশ্ন তাঁর কাছের মানুষগুলোকেও ঘুরেফিরে চিন্তিত করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা প্রশ্নটি হজম করে গেছেন; এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল কোমে ও মুয়েলারকে বরখাস্ত করার ঘটনাটি। এই দুটি ছাঁটাইয়ের ঘটনায় প্রেসিডেন্টের পরিবারের বাইরের প্রত্যেকটি স্টাফ ট্রাম্পকে পরে দায়ী করেছেন।

গল্পের রাজাকে উদোম দেখেও তাঁর পারিষদরা মুখ খুলছিল না পাছে নিজের বোকামি ধরে পড়ে! এই পর্যায়ে এসে ট্রাম্পের রাজ্যে লজ্জার বাঁধ অনেকের ভেঙে যায়। তাঁরা তাঁর বিচারবুদ্ধি, দূরদর্শিতা, বিশেষ করে তাঁকে যেসব উপদেশ দেওয়া হচ্ছে সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকে। ‘ট্রাম্প ক্ষ্যাপাই শুধু নয়, গর্দভও’ বলেছিলেন ট্রাম্পেরই বহু বছরের পুরনো বন্ধু বিলিয়নেয়ার টম বারাক। এমনকি এফবিআইপ্রধানকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ব্যক্তি ট্রাম্পকেও বিব্রত দেখাচ্ছিল। এ পরিস্থিতি শাপে বর হয়ে এলো প্রধান কৌঁসুলি স্টিভ ব্যাননের জন্য।

ট্রাম্প ডুবছিলেন, আর বাঁশি বাজাচ্ছিলেন ব্যানন। প্রেসিডেন্টকে উদ্ধারে চিফ অফ স্টাফ প্রিবাসকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ওয়েস্ট উইংয়ে কড়াকড়ি আরোপ করলেন, সেই সঙ্গে পৃথক আইন ও যোগাযোগ স্টাফ নিয়োগেরও চেষ্টা করলেন। ‘ওদের মতো আমাদের পৃথক যুদ্ধ কক্ষ, পৃথক আইনজীবী প্যানেক, পৃথক মুখপাত্র থাকবে’, কুশনার শিবিরের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন ব্যানন। কেউ রাজি হলো না। সব মিলিয়ে বড় বড় ৯টি প্রতিষ্ঠান ‘না’ বলে দিয়েছিল।

এদিকে ইভানকা-কুশনারপন্থীরা আতঙ্কে। ব্যাননের সীমানা মাড়িয়ে গেলে বিপদ হবে না তো! আর উল্লাস ব্যানন শিবিরে : ব্যানন ফিরেছে! বলছিলেন তাঁর পন্থীরা। ব্যানন নিজেও ঘোষণা দিলেন, ‘আমি ফিরে এসেছি। আমি তাদের আগেই বলেছিলাম, এ কাজ কোরো না। এফবিআইপ্রধানকে বরখাস্ত কোরো না। কিন্তু এখানকারা জিনিয়াসরা পাত্তা দিল না।’ এ পরিস্থিতিতে ব্যাননকে তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা সাবধান করে দিচ্ছিলেন, ট্রাম্প পরিবারের বিরুদ্ধে তুমি জিততে পারবে না। তবে ব্যাননকে দেখাচ্ছিল আত্মবিশ্বাসী, প্রতিপক্ষকে হারিয়েই ছাড়বেন! একদিন ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট পিতার উপস্থিতিতেই কন্যা ইভানকার দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে তেড়ে যান ব্যানন, ‘ইউ আর এ ফা...ং লায়ার।’ ‘তুমি ডাহা মিথ্যাবাদী।’ অতীতে মেয়ের এজাতীয় অভিযোগে ট্রাম্প ব্যাননকে শাসিয়েছেন। আজ শুধু মেয়েকে বললেন, ‘বেবি, আমি তোমাকে আগেই বলেছি, এই শহরটা জটিল।’

ব্যানন সত্যিই ফিরে এসেছেন বললে ফিরে আসা কথাটিরই হয়তো ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। ট্রাম্প ট্রাম্পই। তিনি কি ভুলে গেছেন, এই ব্যাননকে তিনি বরখাস্ত করতে চেয়েছিলেন? ট্রাম্প ভুলে গেছেন, এ কথা অন্যদেরও মনেও হয়নি। বরং প্রেসিডেন্ট এ নিয়ে ভেবেছেন, নিজের মধ্যে গজগজ করেছেন। হোয়াইট হাউসের পেশাদার অংশটি যখন অ্যামেচার ফ্যামিলি হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধে একাট্টা, জারভানকা শিবিরের মনে হয়েছে, প্রেসিডেন্টকে ব্ল্যাকমেইল করছেন ব্যানন।

৩১ মে ব্যাননের প্রতীক্ষিত প্রতিরক্ষা দুর্গটি স্থাপিত হলো। এখন থেকে আর প্রেসিডেন্ট নন, রাশিয়া, মুয়েলার ও কংগ্রেসের তদন্ত কার্যক্রম দেখবে ব্যাননের পছন্দের কাসোইউতজের দল। ব্যাননের প্রত্যাবর্তনের মাইলফলক হিসেবে যদি উজ্জ্বল কোনো তারিখ থাকে সেটি হচ্ছে ১ জুন। হোয়াইট হাউসে দীর্ঘ ও তীব্র বিতর্কের পর প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দিলেন তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন।

ব্যাননের কাছে এ ছিল চরম শান্তির দিন। উদারপন্থীদের সততার গালে অবশেষে তিনি কষে একটি চড় লাগাতে পেরেছেন; জয় হয়েছে ট্রাম্পের ব্যাননাইট প্রেরণারও। সেদিন ট্রাম্পের বাণিজ্য পরিষদ থেকে তাৎক্ষণিক পদত্যাগ করেছিলেন ইলন মাস্ট ও বব ইগার। এ ছিল এমন এক ঘটনা, হোয়াইট হাউসে যার বাস্তবায়ন ঠেকাতে ইভানকা কঠিনতম লড়াইটি করে এসেছেন। এই ঘটনায় ট্রাম্পকন্যাকে হারাতে ব্যাননের মুখে ছিল জয়ের হাসি। ‘অবশেষে কুত্তার বাচ্চাটি মরেছে’, বলেছিলেন প্রেসিডেন্টের প্রধান কৌঁসুলি।

[চলবে]


মন্তব্য