kalerkantho


জঙ্গিবাদে বদলায় আচরণ

সচেতনতায় নামতে চায় ভুক্তভোগী স্বজনরা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সচেতনতায় নামতে চায় ভুক্তভোগী স্বজনরা

জঙ্গিবাদবিরোধী সচেতনতায় এবার নিহত এবং গ্রেপ্তার জঙ্গিদের স্বজনদের নিয়ে কাজ শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। স্বজনরাও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

গতকাল শনিবার পুলিশের সিটিটিসি ইউনিট আয়োজিত ‘র‌্যাডিক্যালাইজেশন ও উগ্রবাদ প্রতিরোধ : পরিবার ও সমাজের ভূমিকা’ শীর্ষক কর্মশালায় জঙ্গিদের স্বজনরা এই আগ্রহের কথা জানায়।

কর্মশালায় উঠে আসে তরুণদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার নানা চিত্র। এতে দেখা গেছে, যারা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে, তাদের মধ্যে হঠাৎ করেই বেশ কিছু পরিবর্তন আসে। ধর্মের কথা বলায় স্বজনরা দৃশ্যমান পরিবর্তনকেও ভালোভাবে নেয়। আর এ কারণে বিপথগামী হয়ে ওঠার আগে তাদের কাছে বিষয়গুলো ধরাই পড়ে না।

কর্মশালার তথ্যে বলা হয়, দেশে যারা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে নিহত এবং গ্রেপ্তার হয়েছে, তাদের জীবনধারা পাল্টে গিয়েছিল। অনেক সময় চঞ্চল প্রকৃতির ছেলেটিও চুপচাপ হয়ে যায়।

বাসা থেকে বাইরে বের হতো কম। তারা ওয়াক্তের নামাজের পাশাপাশি রাত জেগে নামাজেও মনোযোগী হয়। নিজেদের নামাজ পড়ার ধরন পাল্টায়। নিজ এলাকার মসজিদে নামাজ না পড়ে অন্য এলাকায় যায়। সরকারি মসজিদে নামাজ পড়ে না। পরিবারের সদস্যদের নামাজ ও পর্দার ব্যাপারে চাপ দেয়। নিজেদের মত ছাড়া অন্য কারো মতামত নিতে চায় না। রাত জেগে ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং গোপনীয়তা বজায় রাখে। কথায় কথায় ‘কাফের’ ও ‘তাগুদ’ শব্দ ব্যবহার করে। হারাম-হালাল নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। মোবাইল ফোনে অ্যাপস থাকে। রাত জেগে ফোনে কাজ করে।

এ কর্মশালায় অংশ নিয়ে গুলশানের হলি আর্টিজানসহ বিভিন্ন অভিযানে নিহত এবং গ্রেপ্তার ১৪ জনের স্বজনরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিজেদের অভিজ্ঞতা জানায়। তারা জঙ্গিবাদবিরোধী সচেতনতায় কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে বলে, জঙ্গিবাদে জড়িতরা মেধাবী ও সৎ ছিল। জঙ্গিরা তাদেরই খুঁজে প্ররোচিত করে। ইন্টারনেটের অপব্যবহারের ফলেও ছড়িয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদ। তবে সচেতনতা বাড়ানো গেলে তরুণদের ধর্মের খণ্ডিত ও ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে উগ্রপন্থায় ঠেলে দেওয়া যাবে না। স্বজনরা জানায়, কারাবন্দিরা বড় জঙ্গিদের সঙ্গে থেকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসা এবং বন্দিদের পুনর্বাসন করার দাবিও জানায় তারা।

সিটিটিসি ইউনিটের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনার মাধ্যমে বলেন, কেবল অভিযান চালিয়েই জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এ জন্য সমাজে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। আর ভুক্তভোগীরা তাদের সমস্যা জানালেই সে কাজটি সহজ হবে। এ কারণেই পরিবারগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সচেতনতামূলক কাজ করতে চাইছে পুলিশের এই বিশেষ ইউনিট। দেশে এ ধরনের উদ্যোগ এটিই প্রথম।

কর্মশালার মূল আলোচক সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গিবাদ সমাজের অন্য সব অপরাধের মতো নয়। এর মূলে থাকে আদর্শিক ক্ষোভ। যারা এই ভুল পথে যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে, কারাগারে ভরে সমস্যার সমাধান হবে না। কাউন্টার র‌্যাডিক্যালাইজ কার্যক্রম চালাতে হবে। তিনি বলেন, সবার কাছে ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরতে হবে। আর ভুল ক্ষোভের যেন জন্ম না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

অভিজ্ঞতায় পাওয়া তথ্য জানিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ইংরেজি মাধ্যম ও মাদরাসার ছাত্ররাই বেশি র‌্যাডিক্যালাইজড হচ্ছে। কারণ তাদের মধ্যে দেশপ্রেম ও মানবিক বোধ তৈরি হচ্ছে না। খেলাধুলাও নেই। মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটের জগতে তারা হারিয়ে যাচ্ছে।’

কোনো তরুণের মধ্যে পরিবর্তন দেখা গেলে সচেতনভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান মনিরুল। তিনি বলেন, ‘সন্তানকে তাদের মতো করে বোঝান। তার কথা শুনুন। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে তার ঝুঁকি জানুন। এরপর নিজের যুক্তি বুঝিয়ে বলুন। এর পরও কাজ না হলে কাউন্সেলিং করুন। এতেও ব্যর্থ হলে আমাদের সাহায্য নিন।’

রাজধানীর রূপনগরে অভিযানে নিহত নব্য জেএমবির প্রশিক্ষক মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামের শ্বশুর বৃদ্ধ মমিনুল হক বলেন, ‘২০১৪ সালে আমার জামাই কানাডায় প্রশিক্ষণে যায়। ফিরে এসেই সে বলে চাকরি করবে না। ডিফেন্সের চাকরি নাকি শেরেক! আমরা অনেক বোঝালাম। কাজ হয়নি। সে ভিন্নভাবে নামাজ পড়া শুরু করেছিল। আমাদেরও বলেছিল। কিন্তু আমরা সেটা শুনিনি বলে যোগাযোগ এক রকম বন্ধ করে দিয়েছিল। আমার মেয়েকে (জাহিদুলের স্ত্রী কারাবন্দি জেবুন্নাহার শিলা) সে চাপ দিয়ে তার সঙ্গে নিয়ে যায়।’

মমিনুল হক আরো বলেন, ‘এসব ব্যাপারে দেশের সব মানুষের মধ্যে সচেতনতা দরকার। আমরা কথা বলব।’

জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর মুক্তি পাওয়া এক যুবক বলেন, এখন জঙ্গিরা মেধাবী ও অন্ধ মতাদর্শীদের টার্গেট করছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ক্ষেত্রে সমন্বয় নেই। জঙ্গিদের কারাগারে এক ভবনে রাখলে অভিজ্ঞতা বিনিময় করে আরো বিপথগামী হয়ে উঠতে পারে বলেও মন্তব্য তাঁর।

জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্ত এক উচ্চশিক্ষিত যুবকের মা বলেন, ‘এখনকার অভিভাবকরা এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ধার্মিক পরিবারের সন্তানরা যদি নামাজের কথা বলে, একটু বদলায়, তা কি বোঝা যায়? এখনকার সন্তানরা এত সেনসেটিভ! ইন্টারনেটে তারা কী করছে, তা বুঝব কী করে? এরা তো ভালো ছেলে। ওদের মিস গাইড করা হচ্ছে।’ ছেলের পরিবর্তনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সে আমাকে হিজাব পরতে চাপ দিয়েছিল। মোবাইল ফোনে আইএসের ভিডিও লেকচার দেখত।’

গুলশানে নিহত আরেকজনের বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলেকে মোবাইল ফোনই শেষ করেছে।’

গ্রেপ্তারের পর কারাগারে থাকা রাজধানীর এক তরুণের বাবা বলেন, ‘আমার ছেলেকে বিপথগামী করেছে গৃহশিক্ষক। এক শিক্ষক সিরিয়ায় চলে গেছে। আমি আগে টের পাইনি।’

হলি আর্টিজানে নিহত বগুড়ার উজ্জলের বাবা বদিউজ্জামান বলেন, ‘আমার ছেলে দেখি নামাজ পড়ে। আমাকে দাড়ি রাখতে বলে। ভালো ১ নম্বর ছেলে ভেতরে ভেতরে যে ১৮ নম্বর হয়ে গেছে, তা তো বুঝিনি।’

পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার আব্দুল মান্নান জানান, কোরআন-হাদিসের অংশিক বিষয়ে অর্থ বলে ব্যাখ্যা না দিয়ে বোঝানো হয়। যারা জঙ্গি দলে নিচ্ছে তারা সৎ ও আদর্শবান। তাদের কথা টার্গেট গ্রুপ বিশ্বাস করে। টার্গেট তারাই যারা ধর্মের প্রতি অনুগত। বিশ্বের মুসলমানদের প্রতি নির্যাতনে ক্ষুব্ধ এবং ব্যক্তিগত বা সামাজিক কারণে হতাশাগ্রস্ত। আব্দুল মান্নান বলেন, জড়িয়ে পড়ার পর তরুণরা বাসার বাইরে কম যায়। টাকনুর ওপর কাপড় পরে। কথায় কথায় ‘কাফের’ ও ‘তাগুদ’ বলে।  হারাম ও হালাল খোঁজে। বিয়ে করতে মা-বাবা লাগে না বলে বিশ্বাস করে। দূরের মসজিদে নামাজ পড়তে যায় এবং সরকারি মসজিদে নামাজ পড়ে না। মোবাইল ফোনে অপ্রচলিত অ্যাপস থাকে, যার মাধ্যমে যোগাযোগ করে।

কর্মশালার স্বাগত বক্তব্যে সিটিটিসি ইউনিটের যুগ্ম কমিশনার আমিনুল ইসলাম বলেন, ধর্ম নিয়ে জ্ঞানের বাড়াবাড়ি অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। আর এই মতপার্থক্য কাজে লাগিয়ে একটি গোষ্ঠী উগ্রপন্থা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ইন্টারনেটে ধর্ম শিখতে গিয়েও আমাদের ছেলে-মেয়েরা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে।


মন্তব্য