kalerkantho


উঁচু দেয়ালঘেরা নিচু যত কর্ম

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



উঁচু দেয়ালঘেরা নিচু যত কর্ম

মাইকেল ওলফের ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’ গ্রন্থ নিয়ে কেন তোলপাড়? জানতে পড়ুন বাছাই অংশ। ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস

‘ম্যানো অ্যা ম্যানো’ তথা ষাঁড়ের লড়াইয়ের জগতে বাস করছিলেন ট্রাম্প, যেখানে বালাই নেই আত্মমর্যাদাবোধের। এই লড়াইয়ে খেলাটাকে ব্যক্তিগতভাবে না নিলেই চরম সুবিধা; যেমন নেয় না কোনো ষাঁড়। যদি ব্যক্তিগতভাবে নেন এবং ভাবেন যে ষাঁড়ের লড়াই মানেই হচ্ছে প্রতিপক্ষকে খুন করা বা নিজে খুন হওয়া—সম্ভবত আপনি কোনো দিনই প্রতিদ্বন্দ্বী খুঁজে পাবেন না। তবে ট্রাম্প সব কিছুই ব্যক্তিগতভাবে নিচ্ছিলেন। তিনি হোয়াইট হাউসে বলে বেড়াচ্ছিলেন, ‘মুয়েলার! আমি তার চাকরি খাব।’ তার এই অসন্তুষ্টি ধীরে ধীরে নিষ্ঠুরতা ও নোংরাভাবে আক্রমণের দিকে গড়াল। মুয়েলারের পর তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল সেশনসের পেছনে লাগলেন। ‘বাটুল একটা! মিস্টার মাগুর মতো। দক্ষিণের গাঁইয়া ভাষায় কথা বলে।’ ট্রাম্প এসব বিষয় নিয়ে এত ঘনঘন নিজের ভেতর গজর গজর করছিলেন ওভাল অফিসের দেয়ালের ওপার থেকেও হয়তো শোনা যাচ্ছিল! হোয়াইট হাউসের মুখ্য কৌঁসুলি স্টিভ ব্যানন ভাবছিলেন, ট্রাম্প এভাবে মেয়ে ও জামাতার মাঝখানেই যদি পাক খান, বেরোতে না পারেন, প্রেসিডেন্সি টিকবে না। ইভানকা-কুশনাররা বলছিলেন অন্য কথা : ব্যানন ও তাঁর সাঙ্গাতরাই ট্রাম্পের দানব ভাবমূর্তি তৈরি করছেন এবং এই ব্যাননিজম ট্রাম্পকে ডোবাবে।

৮ জুন সকাল ১০টার পর থেকে প্রায় দুপুর ১টা পর্যন্ত বরখাস্ত হওয়া এফবিআই প্রধান কোমে সাক্ষ্য দিলেন সিনেট ইনটেলিজেন্স কমিটির সামনে। তাঁর সাক্ষ্য থেকে গোটা আমেরিকা একটি বার্তাই পেল—প্রেসিডেন্ট বোকার হদ্দ এবং নিশ্চিতভাবে একটা মিথ্যাবাদী। আধুনিক গণমাধ্যমের এই যুগে খুব কম প্রেসিডেন্টই এভাবে প্রত্যক্ষভাবে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছেন এবং কংগ্রেসের সামনে মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হয়েছেন। সাবেক এফবিআই প্রধান সাক্ষ্যে বলেন, প্রেসিডেন্ট তাঁর পক্ষে কাজ করার জন্য এফবিআইকে চাপ দিচ্ছিলেন। বলছিলেন, রাশিয়াবিষয়ক তদন্তগুলো বন্ধ করে দিতে। শুনানি শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে অনেককেই বললেন, কোমের সাক্ষ্যদানের দৃশ্য টিভিতে তাঁর দেখা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করল না।

গণমাধ্যম ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারিজুরি ফাঁস করে দিচ্ছিল—তবে এমএসএনবিসির জো স্কারবরগ ও মিকা ব্রজেজিনসকির মতো কাজটি সম্ভবত আর কেউ পারেনি। একটা অনুষ্ঠান কত ন্যক্কারজনকভাবে একজনের পেছনে লাগতে পারে সে গবেষণা হলে মর্নিং জো নামের অনুষ্ঠানটিকে রাখতে হবে। তাদের ব্রেকফাস্ট শোতে নিয়মিত বলা হচ্ছিল কিভাবে ট্রাম্প নিজেই নিজেকে হাস্যকর করে তুলছেন। আর ট্রাম্প বলছিলেন, টিভিটি বাড়াবাড়ি করছে এবং তিনি অনুষ্ঠানটি দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। ট্রাম্প যদিও বলছিলেন তিনি অনুষ্ঠানটি দেখেন না, হোপ হিকস নামের যে মেয়েটি গণমাধ্যম মনিটর করেন, তিনি রিপোর্টে জানিয়ে দিতেন কী কী বলা হলো। এ নিয়ে ট্রাম্প রাগের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন ২৯ জুন মিকা ব্রজেজিনসকি নিয়ে দেওয়া টুইটে। প্রেসিডেন্ট প্রথমে লিখলেন : ‘মিকার আইকিউ খারাপ’; পরে লিখলেন : প্লাস্টিক সার্জারি করায় মিকার মুখ থেকে রক্ত ঝরছে।’

ট্রাম্প খুব ভেবেচিন্তে কিছু করেন না। তাঁর মানসিকতাই হচ্ছে—ইট মেরেছ তো পাটকেল খাবে। কী বলছেন এ নিয়ে মাথা যেমন ঘামান না, পরে এমনও বলেন, ‘এ কথা বলেছি নাকি?’ ছয় মাসের প্রেসিডেন্সিতে আমলাতন্ত্রের যেসব প্রক্রিয়া রয়েছে তার প্রায় কিছুই ট্রাম্প ধরে উঠতে পারেননি। সুপ্রিম কোর্টে নিজের নমিনি দেওয়ার বিষয়টি বাদ দিলে তাঁর অর্জন বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। আবার একই সময় তিনি মানুষকে নানাভাবে হতবুদ্ধি করেছেন। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির বড় চমক যদি কোনো কিছু থেকে থাকে তা হচ্ছে মানুষের নজর কাড়া। অবস্থা অনেকটাই এমন হয় যে ট্রাম্প ছাড়া কোনো খবরই নেই আমেরিকায়, একই অবস্থা বিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চলে। প্রতিদিনকার উত্তেজনা, বাইরের দুনিয়ার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া—স্বাভাবিকভাবেই হোয়াইট হাউসে আনন্দের কারণ হয়নি। বরং পরিবেশ তিক্ত হয়েছে।

ছেলে ৩৯ বছর বয়সী ডন জুনিয়র এবং ৩৩ বছর বয়সী এরিকের সঙ্গে এমন ব্যবহার করতেন ট্রাম্প যেন তাঁরা শিশু। তাঁদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হতো। ব্যাপারটি দুই প্রেসিডেন্টপুত্রের জন্য ছিল বিব্রতকর। ট্রাম্পের উত্তরাধিকার ও পরিবারের সদস্য—এ ছাড়া তাঁদের আর কোনো পরিচিতি যেন ছিল না। ট্রাম্প নিয়মিত ছেলেদের এই বলে খ্যাপাতেন—ঈশ্বর তোমাদের মস্তিষ্ক দিয়েছেন, কিন্তু তোমাদের বাড়ির পেছন দিকে পড়ে থাকতে হচ্ছে! ট্রাম্পের মধ্যে আরো একটা প্রবণতা দেখা যেত : আমার চেয়ে বেশি স্মার্ট হওয়ার ভাব দেখিয়েছ তো খবর আছে! ট্রাম্পের এই দুই ছেলেই পারিবারিক ব্যবসা দেখেন। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়ে যখন নামলেন তাঁর অনুপস্থিতি ব্যবসার জন্য ভালোই হয়েছিল। দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়ালই ভালো!

এরই মধ্যে ফাঁস হলো ১৩ মাস আগে ট্রাম্প টাওয়ারে অনুষ্ঠিত এক গোপন বৈঠকের খবর। ২০১৬ সালের ৯ জুনের সেই বৈঠকে ট্রাম্পপুত্র ডন জুনিয়র এবং জামাতা কুশনারের সঙ্গে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁদের একজন ছিলেন রুশ আইনজীবী, যাঁকে অনেকেই মনে করে থাকেন রুশ গুপ্তচর। নির্বাচনের আগে রাশিয়ানদের সঙ্গে ট্রাম্প পরিবারের লোকজনের এই বৈঠকের নেপথ্যে কী ছিল এ নিয়ে অনেক কথাই শোনা যায়।

এই সময় এসে হোয়াইট হাউসে দলাদলি প্রকাশ্যেই চলল। একপক্ষে ট্রাম্পের জামাতা কুশনার, মেয়ে ইভানকা, হোপস; অন্যপক্ষে প্রিবাস, স্পাইস, কনওয়ে, আর সবার আগে ব্যানন। ট্রাম্প টাওয়ারের গোপন বৈঠকের খবর জানাজানি হওয়ার পর খামাখাই ট্রাম্প চেষ্টা করলেন উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে তথা সেশনসের ওপর চাপাতে। এ বিষয়ে সেশনসের পক্ষ নিলেন ব্যানন। তিনি ফোন দিয়ে হোপ হিকসকে যাচ্ছেতাই ভাষায় বললেন, হিকস ইভানকা-কুশনারের হয়ে ব্যাননের ক্ষতি করছেন।

ফোনে হিকসের ওপর ব্যাননের একহাত নেওয়ার পরদিন সাংবাদিকরা ট্রাম্প টাওয়ারের গোপন বৈঠকে আরো বেশি জেঁকে ধরেন ব্যাননকে। আগের দিন ফোনে ঝেরেছিলেন, আজ ব্যানন ক্যাবিনেট রুমে মুখোমুখিই হলেন হিকসের। বলেন, ট্রাম্পকন্যা ও জামাতার হয়ে হিকস কেন নোংরামি করছেন। এই হিকস-ব্যানন দ্বৈরথ হোয়াইট হাউসের বিবদমান দুটি শিবিরকে রীতিমতো যুদ্ধের প্রান্তে নিয়ে যায়। সেদিন হিকসকে অশ্রাব্য ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন ব্যানন। তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘তুমি জান না তুমি কী করছ।’ ব্যানন সরাসরি প্রশ্ন করেন, হিকস কার জন্য দায়িত্ব পালন করছেন, হোয়াইট হাউসের, নাকি ইভানকার। ‘তুমি জান না কত বড় বিপদে তুমি পড়েছ’ গলা আরো চড়িয়ে বলেছিলেন ব্যানন। সঙ্গে যোগ করেন, হিকস নিজে থেকে কোনো আইনজীবী নিয়োগ না করলে তাঁর বাবার সঙ্গে ব্যানন নিজে এ নিয়ে কথা বলবেন। তারপর ব্যানন ক্যাবিনেট কক্ষ থেকে বেরিয়ে যে খোলা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে হিকসের উদ্দেশে চিৎকার করলেন সব কথা ট্রাম্পেরও কানে যাওয়ার কথা। ব্যানন চরম অশ্রাব্য ভাষায় বললেন, ‘তুমি একটা অপদার্থ।  আই এম গোইং টু...ইউ এবং ইউর লিটল গ্রুপ।’ এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট নিজেও ভ্যাবাচেকা খেয়ে যান এবং কোনো রকমে বলেন, কী হচ্ছে এসব!

এ ঘটনা নিয়ে জারভানকা (জামাই জারেদ-কন্যা ইভানকা চক্র) শিবির থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তা হচ্ছে—হিকস সেদিন দৌড়ে পালিয়ে এসেছিলেন, কাঁদছিলেন পাগলের মতো; তাঁকে দেখাচ্ছিল চরম আতঙ্কগ্রস্ত। হোয়াইট হাউসের অন্যদের চোখে এ ছিল দুই শিবিরে শত্রুতার চরম প্রকাশ। জারভানকা শিবির বিহিত চেয়ে প্রিবাসকে চাপ দেয় ঘটনাটি উপদেষ্টা পরিষদে তুলতে। তারা বলছিল, ওয়েস্ট উইংয়ের ইতিহাসে যদি নাও হয় বর্তমান প্রেসিডেন্সির সময় এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা আর ঘটেনি। এদিকে ব্যানন বলছিলেন, তিনি নন, জারভানকা গ্রুপই কোমে-মুয়েলারের সঙ্গে ষড়যন্ত্রের হাত মিলিয়েছিল; এখন তারা আতঙ্ক থেকে বেসামাল আচরণ করছে।

এই ঘটনার পর ব্যানন যে কদিন হোয়াইট হাউসে ছিলেন একবারের জন্যও হিকসের সঙ্গে কথা বলেননি।


মন্তব্য