kalerkantho


মেয়ে হওয়ায় জীবন দিতে হলো ৪৫ দিনের শিশুকে

পাবনা প্রতিনিধি   

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মেয়ে হওয়ায় জীবন দিতে হলো ৪৫ দিনের শিশুকে

দেড় মাস বয়সী শিশু আতিকার হত্যাকাণ্ড যেন পুরো সমাজকে অপরাধী করে দিয়েছে। মূলত মেয়ে হওয়ায় বাবা ও দাদারা ৪৫ দিনের এ শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে—প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ কর্মকর্তারা এমনটাই ধারণা করছেন।

গত শনিবার ঈশ্বরদীর অড়োনকোলায় মর্মান্তিক এ ঘটনায় পুলিশ আতিকার বাবা আশরাফুল ইসলাম, দাদা আইয়ুব আলী, দাদি সেলিনা খান ও আশরাফুলের মামি জ্যোত্স্না খাতুনকে গ্রেপ্তার করেছে।

পুলিশ বলছে, আশরাফুল ও নিশি দম্পতির প্রথম সন্তান মেয়ে। তার বয়স ১৪ মাস। এরপর আতিকার জন্ম। তবে অপরিপক্ব অবস্থায় (সাত মাসের সময়) শিশুটির জন্ম হয়।

পুলিশ আরো বলছে, শিশুটিকে নৃশংসভাবে হত্যার পরে লাশ লুকিয়ে রেখে ‘শিশু চুরির’ অভিযোগে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে প্রতিবেশীদের। প্রায় ১২ ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে পুলিশ আতিকার লাশ উদ্ধার করেছে বাড়ির শোবার ঘরের আলমারির মধ্য থেকে।

পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, অড়োনকোলা গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলামের পরিবারের পক্ষ থেকে শনিবার দুপুরে থানায় জানানো হয়, তাঁদের বাড়ির শোবার ঘরে রাখা ৪৫ দিনের শিশুটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে পুলিশকে জানানো হয়েছিল, ‘এদিন সকালে অন্যদিনের মতো আতিকার বাবা আশরাফুল বাজারের দোকানে যান। সকাল ১১টার দিকে আতিকার দাদা নিজ ঘরে ঘুমাচ্ছিলেন, দাদি হাসপাতালে ছিলেন আর আতিকার মা নিশি খাতুন আতিকাকে ঘরের বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে ছাদে কাপড় শুকাতে যান। ছাদ থেকে ঘরে এসে বিছানায় মেয়েকে দেখতে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। না পেয়ে পুলিশকে অবহিত করা হয়।’

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস আরো জানান, প্রাথমিকভাবে শিশু চুরির বিষয়টি মাথায় রেখে পুলিশ তল্লাশি অভিযানে নামে। অভিযানের একপর্যায়ে আতিকার পরিবার থেকে প্রতিবেশী মোক্তার হোসেনের সঙ্গে পারিবারিক দ্বন্দ্বের কথা জানিয়ে শিশু চুরির জন্য এ প্রতিবেশীর পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন আতিকার বাবা, দাদাসহ অন্যরা। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ দুপুরেই মোক্তার হোসেন ও তাঁর পরিবারের পাঁচ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যায়।

পাবনার পুলিশ সুপার জিহাদুল কবীর জানান, আতিকাদের বাড়িটি অনেক সুরক্ষিত। বাড়ির প্রধান ফটক থেকে শোবার ঘর অনেক ভেতরে। পরিচিত বা অপরিচিত কারো পক্ষে হুটহাট ঘরে ঢুকে কোনো কিছু চুরি করে পালানো সহজ কাজ নয়। এসব দেখার পর পুলিশের ধারণা হয়, বাড়ির ভেতরের কেউ আতিকাকে চুরির সঙ্গে জড়িত। বিষয়টি মাথায় রেখে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। পাশাপাশি বাড়ির আশপাশসহ বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান অব্যাহত থাকে। রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে অভিযানের মধ্যেই আতিকার দাদা মোবাইল ফোনে পুলিশ কর্মকর্তাদের জানান যে একটি চিরকুট পাওয়া গেছে, যেখানে শিশুটিকে ঘরের আলমারির মধ্যে রাখা আছে বলে জানানো হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা ওই চিরকুটের লেখা অনুযায়ী শোয়ার ঘরের আলমারি থেকে শিশুটির নিথর দেহ উদ্ধার করেন। মেয়েদের প্রসাধনী আই লাইনার দিয়ে লেখা ওই চিরকুটে লেখা ছিল, ‘নিশি নিচে আশায় নিতে পারিনি। তোর মেয়ে আলমারির মধ্যে আছে। ভাবছিলাম পরে এসে নেব। ক্ষমা করিস।’

পুলিশ সুপার আরো জানান, চিরকুট পাওয়ার পর পুলিশ ওই বাড়ির সবার হাতের লেখা পরীক্ষা করে চিরকুটের লেখার সঙ্গে শিশু আতিকার দাদা আইয়ুব আলীর হাতের লেখার হুবহু মিল খুঁজে পান। পাশাপাশি যে প্যাডের কাগজে চিরকুট লেখা হয়েছিল সেই প্যাডটি আতিকার বাবা আশরাফুলের ওয়ার্ডরোব থেকে উদ্ধার করেন। হত্যাকারীরা আতিকাকে শ্বাসরোধে হত্যার পর মরদেহ কাপড়ে পেঁচিয়ে আলমারির মধ্যে রেখে দিয়েছিল বলে পুলিশ ধারণা করছে। পুলিশ কর্মকর্তা জানান, শনিবার রাতেই আতিকার মা নিশি খাতুন বাদী হয়ে আশরাফুল, আইয়ুব আলী, সেলিনা খাতুন ও জ্যোত্স্না খাতুনকে আসামি করে ঈশ্বরদী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। পুলিশ এই মামলায় অভিযুক্ত চারজনকে শনিবার রাতেই গ্রেপ্তার করে।


মন্তব্য