kalerkantho


বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে বিএনপির অভিযোগ

নির্বাচন সামনে রেখে খালেদাকে হেনস্তা করছে সরকার

মেহেদী হাসান ও শফিক সাফি   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নির্বাচন সামনে রেখে খালেদাকে হেনস্তা করছে সরকার

দুর্নীতির অভিযোগের মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হওয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ ১৫টি দেশের কূটনীতিক বা কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের কাছে নানা অভিযোগ তুলে ধরেছে দলটি। কারাবিধি অনুযায়ী ডিভিশন না দেওয়া, অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ভয়, মামলার সার্টিফায়েড কপি দিতে দেরিসহ বিভিন্নভাবে খালেদা জিয়াকে হেনস্তা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। সরকার আগামী নির্বাচন সামনে রেখেই এসব করছে বলে তারা কূটনীতিকদের কাছে অভিযোগ করেছে।

তবে খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডাদেশে বিএনপি আগের চেয়ে আরো জনপ্রিয় ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলে কূটনীতিকদের কাছে দাবি করেছে দলটি। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য আয়োজিত ব্রিফিংয়ে বিএনপি এই দাবি করে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত। ওই দিন থেকেই তিনি কারাবন্দি।

এর আগে গত ৩০ জানুয়ারি কূটনীতিকদের জন্য আয়োজিত ব্রিফিংয়ে বিএনপি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে প্রহসনের বিচারের নামে খালেদা জিয়াকে অন্যায়ভাবে কারাগারে পাঠানো হবে। সেই আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে বলে গতকাল কূটনীতিকদের জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা। বিএনপি অভিযোগ করে, কারাবিধি অনুযায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কারাগারে খালেদা জিয়া ডিভিশনপ্রাপ্য হলেও আদালতের নির্দেশনার আগ পর্যন্ত তিন দিন তাঁকে সেই সুবিধা দেওয়া হয়নি। খালেদা জিয়ার সঙ্গে গুরুতর অন্যায় করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, কূটনীতিকদের ব্রিফিংয়ে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা ধরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও অন্য নেতারা তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন। এমনকি ব্রিফিং শেষে চা-কফি পর্বেও বিদেশি কূটনীতিকরা প্রশ্ন করেছেন এবং বিএনপি নেতারা উত্তর দিয়েছেন।

কূটনীতিকদের ব্রিফিংয়ের পর বিএনপি এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের কিছু জানায়নি। তবে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘দলের কারাবন্দি নেত্রীর মামলার সর্বশেষ তথ্য তাঁদের কাছে আমরা তুলে ধরেছি। জেল কোড অনুযায়ী ডিভিশন না দেওয়া, অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ভয়, মামলার সার্টিফায়েড কপি দিতে দেরিসহ বিভিন্নভাবে খালেদা জিয়াকে কিভাবে হেস্তনেস্ত করা হচ্ছে সেসব বিষয়ই মূলত তাঁদের জানানো হয়েছে।’

ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিই চালিয়ে যাওয়া হবে বলে কূটনীতিকদের বলা হয়েছে। কারো প্ররোচনায় গণতান্ত্রিক পন্থা থেকে বিএনপি পিছপা হবে না বলেও কূটনীতিকদের জানানো হয়।

বিএনপির আন্দোলন সম্পর্কে কূটনীতিকদের অবস্থান নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইনাম আহমেদ বলেন, ‘গণতান্ত্রিক পন্থায় বিএনপির আন্দোলনকে তাঁরা (কূটনীতিকরা) ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।’

এদিকে ব্রিফিং শেষে পশ্চিমা এক কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপি জোর দিয়ে বলেছে যে খালেদা জিয়ার সঙ্গে ভয়াবহ অন্যায়-অবিচার করা হয়েছে। দলটির আশঙ্কা, একের পর এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁর কারাবাস দীর্ঘমেয়াদি করে তোলার চেষ্টা করা হবে। সরকার আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখেই এসব করছে।

ওই কূটনীতিক বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর ছেলে তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে লন্ডন থেকে দল চালাচ্ছেন বলেও ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে। বিএনপি দাবি করেছে, দেশবাসী মনে করছে যে খালেদা জিয়ার সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে। এর ফলে বিএনপির জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছে। বিএনপি দুর্বল হয়নি। বরং এই সংকট দলকে আরো শক্তিশালী করেছে। আগামী নির্বাচন বা ভবিষ্যৎ নিয়ে বিএনপির পরিকল্পনার বিষয়ে কূটনীতিকরা জানতে চেয়েছেন বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন আরেক কূটনীতিক। তিনি বলেন, বিএনপি বারবার বলার চেষ্টা করেছে যে খালেদা জিয়ার সঙ্গে এত বড় অন্যায় হলেও তারা সহিংসতার পথ বেছে নেয়নি। গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আগামীতেও তা অব্যাহত থাকবে।

নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ (সবার জন্য সমান সুযোগ) থাকার প্রয়োজনীয়তা কূটনীতিকদের কাছে তুলে ধরেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তাঁকে সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে দুইদিন আদালতে ছুটতে হয়। দলের বাকি নেতাকর্মীদেরও একই অবস্থা। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না হলে তাদের নির্বাচনের জন্য কাজ করাই কঠিন হয়ে উঠবে।

ব্রিফিংয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, রিয়াজ রহমান, বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন প্রমুখ।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, সৌদি আরব, পাকিস্তান ছাড়াও কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, জার্মানি, তুরস্ক, স্পেন, সুইডেনসহ প্রায় ১৫টি দেশের কূটনীতিক বা কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা ব্রিফিংয়ে অংশ নেন বলে জানা গেছে।


মন্তব্য