kalerkantho


রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের তাগিদ নিরাপত্তা পরিষদে

‘মিয়ানমারের ভূমিকা দেখার অপেক্ষায় সারা বিশ্ব’

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘মিয়ানমারের ভূমিকা দেখার অপেক্ষায় সারা বিশ্ব’

চীন ও রাশিয়া ছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী সদস্যরা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের কালক্ষেপণে উদ্বেগ জানিয়েছে। বেশির ভাগ সদস্যই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাকে (ইউএনএইচসিআর) যুক্ত করে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির (বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ইউএনএইচসিআর) ওপর জোর দিয়েছে। দু-একটি দেশ ছাড়া প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিই বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। মিয়ানমারকে দ্রুত রোহিঙ্গাদের ফেরার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে নিউ ইয়র্কে মিয়ানমার ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের ব্রিফিংয়ের আনুষ্ঠানিক পর্বে জাতিসংঘের রাজনৈতিক বিভাগের সহকারী মহাসচিব ওটার জার্গেন্স, ইউএনএইচসিআর প্রধান ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি এবং বাংলাদেশ, মিয়ানমারসহ মোট ১৭টি দেশের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি বলেছেন, ‘বিশ্ব তাকিয়ে দেখছে এবং মিয়ানমারের ভূমিকা দেখার অপেক্ষায় আছে। আমরা এ যাবৎ যা দেখেছি তা নিষ্ঠুর ও বর্বর। আর এখন তারা গণমাধ্যমকে দোষারোপ শুরু করেছে।’

গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে নতুন করে নিধনযজ্ঞ শুরুর প্রায় ছয় মাসের মাথায় জাতিসংঘে গত রাতে মিয়ানমারবিষয়ক ব্রিফিংয়ে যেসব বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে সেগুলো হলো রাখাইন পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের করণীয়, ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা, রোহিঙ্গা শিবির পরিস্থিতি, মিয়ানমারে আটক রয়টার্সের দুই সাংবাদিককে মুক্তির আহ্বান, মিয়ানমারে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন ও মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত নিয়োগ।

জাতিসংঘের রাজনৈতিক বিভাগের সহকারী মহাসচিব ওটার জার্গেন্স ব্রিফিংয়ে বলেন, গত ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘ মহাসচিব মিয়ানমারকে যে তিনটি আহ্বান জানিয়েছিলেন সেগুলোর কোনোটিই পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।

ইউএনএইচসিআর প্রধান ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ব্রিফিংয়ে নিরাপত্তা পরিষদকে বারবার বাস্তুচ্যুতি, রাষ্ট্রহীনতা ও ভয়ংকর সহিংসতার এই বৃত্ত ভাঙার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত থাকতে হবে।

ফ্রান্সের প্রতিনিধি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যুক্ত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তবে চীনের প্রতিনিধি রাখাইন পরিস্থিতির আগের চেয়ে উন্নতি হয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই এ সমাধানের পক্ষে মত দেন।

সুইডেনের প্রতিনিধি বলেন, নিরুপায় না হলে কেউ সব ফেলে দেশ ছেড়ে পালায় না। পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত উদ্বেগ জানিয়েছেন পেরুর প্রতিনিধি। ইথিওপিয়ার প্রতিনিধি রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন। নেদারল্যান্ডসের প্রতিনিধি বলেছেন, মিয়ানমার সম্পর্কে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা অত্যন্ত হতাশাজনক। রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকার বিচার একদিন ইতিহাস করবে বলে জানিয়েছেন পোল্যান্ডের প্রতিনিধি।

রাশিয়ার প্রতিনিধি রোহিঙ্গা সংকটকে অত্যন্ত জটিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, রাখাইন পরিস্থিতি এখনো জটিল হলেও নিয়ন্ত্রণে আছে। কিছু কিছু দেশ নিরাপদ প্রত্যাবাসনের কথা বলে পুরো প্রক্রিয়াকেই থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি ও কুয়েতের প্রতিনিধি বলেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যে নিপীড়ন হয়েছে তা জাতিগত নিধনযজ্ঞ।

মিয়ানমারের প্রতিনিধি বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর দেশের নিবিড় যোগাযোগ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তি ও আলোচনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জাতিসংঘের গঠনমূলক উদ্যোগের প্রশংসা করে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি আরো বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে প্রস্তুত।

বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বর্তমানে সীমান্তে শূন্যরেখায় অবস্থানরত প্রায় ৬০ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের আন্তরিকতার পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই রোহিঙ্গারা সীমান্ত অতিক্রম করে এখনো বাংলাদেশে ঢোকেনি। অথচ তাদের প্রকারান্তরে বাংলাদেশে ঢুকতে মিয়ানমার চাপ দিচ্ছে। আবার মিয়ানমারে ফিরতে গেলেও তাদের নাগরিকত্বের পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

মাসুদ বিন মোমেন রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ বসতভূমিতে ফেরানোর তাগিদ দেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনে কৃত্রিম খাদ্য সংকট সৃষ্টি, চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপ ও হুমকি দিয়ে বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আগ্রহী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের, এর সমাধানও মিয়ানমারকেই করতে হবে।

আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিই রাখাইনে গণমাধ্যম ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর অবাধ প্রবেশাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। এ ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের অভিযোগ তদন্তে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনকে প্রবেশ করতে দিতেও তাঁরা মিয়ানমারকে তাগিদ দেন।


মন্তব্য