kalerkantho


আ. লীগ নেতাসহ ৩৯ জনের ফাঁসি

আসাদুজ্জামান দারা, ফেনী   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আ. লীগ নেতাসহ ৩৯ জনের ফাঁসি

প্রকাশ্যে গুলি করে, কুপিয়ে ও গাড়িতে আগুন দিয়ে ফুলগাজী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা একরামুল হক একরামকে হত্যা করার ঘটনাটি ফেনীসহ সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। চার বছর পর গতকাল মঙ্গলবার বহুল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় দিয়েছেন আদালত, যাতে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাসহ ৩৯ জনের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে।

রায়ে মামলার প্রধান আসামি ফেনী জেলা তাঁতী দলের আহ্বায়ক মাহতাবউদ্দিন চৌধুরী মিনার ও অন্যতম প্রধান আসামি ফেনী পৌর যুবলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক জিয়াউল আলম মিষ্টারসহ ১৬ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আমিনুল হক গতকাল বিকেল ৪টায় রায় ঘোষণা করেন। বিচারক তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, একরামের সঙ্গে আসামিদের রাজনৈতিক ও ব্যাবসায়িক বিরোধ ছিল। তাঁকে হত্যার ঘটনাটি ফেনীতে ব্যাপক ভীতির সঞ্চার করে। মামলার বাদী রেজাউল হক জসিম ও একরামের স্ত্রী তাসনিম রহমান ভয়ে কারো নাম বলতে পারেননি। এ ছাড়া সাক্ষীরাও নিরাপত্তার কারণে আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার সময় কারো নাম বলেননি। তবে ১৬৪ ধারায় যাঁরা জবানবন্দি দিয়েছেন তা বিশ্বাসযোগ্য ছিল।

বিচারক রায় প্রসঙ্গে বলেন, ১৬ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁদের বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। আর বাকি ৩৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়।

আদালত সূত্রের বরাত দিয়ে সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) হাফেজ আহাম্মদ সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা  করা হয়েছে।

পিপি জানান, ফাঁসির আদেশ পাওয়া আসামিরা হলো ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল আফসার ওরফে জাহিদ চৌধুরী জিহাদ, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির আদেল, ফেনী পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহিল মাহমুদ শিবলু, আবিদুল ইসলাম আবিদ, এমরান হোসেন রাসেল ওরফে ইঞ্জিনিয়ার রাসেল, জিয়াউর রহমান বাপ্পি, আজমীর হোসেন রায়হান, শাহজালাল উদ্দিন শিপন, কাজী শানান মাহমুদ, নুর উদ্দিন মিয়া, আব্দুল কাইয়ুম, সাজ্জাদুল ইসলাম পাটোয়ারী সিফাত, জাহিদুল হাশেম মজুমদার সৈকত, আবু বকর সিদ্দিক (বক্কর), আলমগীর ওরফে আলাউদ্দিন, আরমান হোসেন কাউছার, চৌধুরী নাফিজ উদ্দিন অনিক, ফেরদৌস মাহমুদ হীরা, সজীব, মো. আরিফ ওরফে পাংকু আরিফ, ইসমাইল হোসেন, জসিম উদ্দিন নয়ন, মামুন, সোহান চৌধুরী, মানিক, কফিল উদ্দিন মাহমুদ আবির, টিটু (১), টিটু (২), নিজাম উদ্দিন আবু, রাহাত মোহাম্মদ এরফান ওরফে আমজাদ, মো. আরিফ ওরফে নাতি আরিফ, রাশেদুল ইসলাম রাজু ওরফে বাটা রাজু, রুবেল, বাবলু, সফিকুর রহমান ময়না, একরাম হোসেন আকরাম, মহিউদ্দিন আনিস, মোসলেহউদ্দিন আসিফ।

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ১৭ জন পলাতক রয়েছে। তাদের মধ্যে আছে আবিদ, জিহাদ, অনিক, সৈকত, রাসেল, বাপ্পি, কাউছার, নয়ন, ছুট্টু, আবির, টিটু, আমজাদ, বাবলু, ময়না, আকরাম ও আসিফ।

মিনার ও মিস্টার ছাড়া খালাসপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও আনন্দপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য বেলায়েত হোসেন পাটোয়ারী ওরফে বেলাল মেম্বার, কালামিয়া, আলাউদ্দিন, আব্দুর রহমান রউফ, আব্দুল কাদের, শাখাওয়াত হোসেন, সাইদুল করিম পবন, জাহিদুল ইসলাম ভূঞা, রিপন, ফারুক, খায়রুল কবির, ইকবাল হোসেন, শরীফুল জামিল পিয়াস, ইউনুস ভূঁইয়া শামীম ওরফে টপ শামীম। খালাস পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে শেষের দুজন পলাতক আছেন।

আরেক আসামি মো. সোহেল ওরফে রুটি সোহেল র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।

আদালত সূত্র জানায়, মামলায় ৩৪১, ৩২৩, ৩২৬, ৩০৭, ৪৩৫, ৪৩৭, ২০১, ১০৯/৩৪ ধারায় রায় দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার পর দণ্ডপ্রাপ্তদের স্বজনদের অনেকেই আদালত প্রাঙ্গণে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এর আগে বিকেল ৩টার দিকে আসামিদের কড়া পুলিশ পাহারায় আদালতে আনা হয়।

মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে ফেনী আদালত এলাকায় ছিল উত্তেজনা। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। আদালত এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য। রায় ঘোষণাকালে একরামুল হকের ভাই ও মামলার বাদী রেজাউল হক জসিম বা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য আদালতে উপস্থিত ছিল না।

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হক একরামকে ২০১৪ সালের ২০ মে সকাল ১১টার দিকে ফেনী সদরের একাডেমি এলাকায় হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর ভাই রেজাউল হক জসিম বাদী হয়ে বিএনপি নেতা মাহাতাব উদ্দিন মিনারের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরো ৩০-৩৫ জনকে আসামি করে ফেনী মডেল থানায় মামলা করেন। ওই বছরের ২৮ আগস্ট ৫৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ অভিযুক্তদের বিচার শুরু করেন আদালত।

এ মামলায় বিভিন্ন সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে ১৫ জন।

রাষ্ট্রপক্ষের সন্তোষ, আপিল করবেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা : রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সরকারি কৌঁসুলি হাফেজ আহাম্মদ বলেন, ‘এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। এটা একটা ঐতিহাসিক রায়। এর আগে ফেনীর আদালতে এত বড় রায় আর হয়নি।’

বিএনপি নেতা ও মামলার প্রধান আসামি মাহতাবউদ্দিন চৌধুরী মিনারের আইনজীবী মেজবাহউদ্দিন খাঁন ও শাহাবউদ্দিন সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এ মামলায় মিনারকে আসামি করা হয়েছিল। তিনি যে নির্দোষ ছিলেন তা এ রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।

যুবলীগ নেতা জিয়াউল আলম মিস্টারের আইনজীবী কামরুল হাসান তাঁর মক্কেল খালাস পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির আদেলসহ কয়েকজন আসামির আইনজীবী আহসান কবির বেঙ্গল ও জাহিদ হোসেন কমল বলেন, তাঁরা এ রায়ে সন্তুষ্ট নন। উচ্চ আদালতে আপিল করবেন তাঁরা।

 


মন্তব্য