kalerkantho


পাইলট আবিদের স্বপ্ন পূরণ হলো না

কেবিন ক্রু নাবিলার শিশুসন্তান পুলিশ হেফাজতে

সরোয়ার আলম   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পাইলট আবিদের স্বপ্ন পূরণ হলো না

ফাইল ছবি

‘অনেক স্বপ্ন ছিল পাইলট আবিদ সুলতানের। একমাত্র সন্তান জামবিন সুলতান মাহিমকে পাইলট বানিয়ে তবেই অবসরে যাবেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই অকালে পরপারে চলে যেত হলো তাঁকে। তাঁকে ছাড়া আমরা কী করে বাঁচব জানি না। আর মাহিম কি পাইলট হতে পারবে? তা-ও জানি না। তাঁর মৃত্যুতে ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। অসময়ে এভাবে আবিদের চলে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতি। শুধু দোয়া করবেন ও যেন জান্নাতবাসী হয়।’ গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে উত্তরায় নিজ বাসায় কালের কণ্ঠকে কথাগুলো বলছিলেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের পাইলট আবিদের শোকাহত স্ত্রী আফসানা খানম টনি। গতকাল সকালে আবিদের মৃত্যুর খবর শুনে স্বজন ও প্রতিবেশীরা বাসায় ভিড় জমিয়েছে। কান্নায় ভেঙে পড়েছে। স্বজনরা জানায়, আবিদের বাবাও পাইলট ছিলেন। বাবার মতোই একজন দক্ষ পাইলট ছিলেন তিনি। ৩২ বছরের ক্যারিয়ারে কোনো প্রকার সম্পদের মালিক হননি। ভাড়া বাসায় স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বসবাস করতেন

 তিনি। এদিকে ইউএস-বাংলার কেবিন ক্রু নাবিলার পরিবারেও চলছে মাতম। তাঁর একমাত্র সন্তান মাকে হারানোর পাশাপাশি ঘটেছে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় গৃহকর্মীকে ফুঁসলিয়ে শিশুটিকে অন্যত্র নিয়ে গেছে। এ নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি পর্যন্ত করতে হয়েছে। শেষে গতকাল দুপুরে ঢাকার ভাসানটেকে নানির বাসা থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ।

আরেকদিকে পরিকল্পনা কমিশনের সহকারী প্রধান উম্মে সালমাকে হারিয়ে স্তব্ধ পরিবারের সদস্যরা কাঁদতেও যেন ভুলে গেছে। গতকাল তাঁর দক্ষিণখানের বাসায় গিয়ে দেখা গেছে, আড়াই বছরের শিশু সামারা ইতিউতি মাকে খুঁজছে। ‘আম্মু, আম্মু’ বলে কাঁদছে। মায়ের ছবিতে চুমু খাচ্ছে। স্বজনরা তাকে কোলে নিয়ে সামলানোর চেষ্টা করছে। লাশ আনতে তাঁর স্বামী ও বড় ভাই নেপাল গেছেন।

নেপালে সোমবার ইউএস-বাংলার বিমান বিধ্বস্ত হয়ে এ পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দুর্ঘটনার পর বেঁচে ছিলেন ওই বিমানের পাইলট আবিদ সুলতান। আবিদ সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন এমন আশায় বুক বেঁধে ছিল তাঁর পরিবার। কিন্তু আবিদ আর ফিরলেন না। গতকাল সকালে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ আসে পরিবারের কাছে। সে খবরে অন্ধকার নেমে আসে পরিবারটির ওপর। সেই থেকে উত্তরা  ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের ৩৮ নম্বর বাসায় চলছে মাতম। গতকাল দুপুরে আবিদের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, আত্মীয়-স্বজনের ভিড়। ছেলে জামবিন সুলতান মাহিমের গলা জড়িয়ে কাঁদছেন মা। বাবাহারা সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভাবনায় ব্যাকুল তিনি। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘তাঁর এই চলে যাওয়া কল্পনাতীত। ও খুব ইনোসেন্ট ও দক্ষ ছিল। দোয়া চাই, ওপারে ভালো থাকুক আবিদ। আবিদ সুলতানের বাবা এম ও কাশেমও পাইলট ছিলেন। আবিদরা পাঁচ ভাই। খুরশিদ মাহমুদ, সুলতান মাহমুদ, সেলিম মাহমুদ ও আমির মাহমুদ—সবাই প্রতিষ্ঠিত।’

কথা হয় ভাই খুরশিদ মাহমুদের সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, “একমাত্র সন্তান জামবিন সুলতান মাহিম এবার ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা দেবে। অসময়ে ও এতিম হলো। আমরা ভাই হারালাম। ও খুব পারদর্শী, ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি’। এমন দুর্ঘটনা মানতে পারছি না।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কিছু অনলাইন ও গণমাধ্যম ভুল বার্তা দিয়েছে। আবিদের নামটাও শুদ্ধ লেখেনি। টিভিতেও ভুল নামে স্ক্রল গেছে। এসব কারণে আমরা বেশি প্রেসারে পড়ে গেছি। সব শেষে ওর মৃত্যুর খবর সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে পাইলটের কোনো ত্রুটি ছিল না। আমরা তাই মনে করি।’ তিনি আরো বলেন, ‘দুর্ঘটনায় যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের প্রতিটি পরিবারকে যেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, তাঁদের শোকাহত মুহূর্তগুলোকে যেন তাচ্ছিল্য করা না হয়। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’

আবিদদের গ্রামের বাড়ি নওগাঁর রানীনগর। তিনি নেপালের কাঠমাণ্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজের প্রধান বৈমানিক ছিলেন। কাঠমাণ্ডুর নরভিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকালে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জেনারেল ম্যানেজার রাজকুমার ছেত্রী আবিদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। রাজকুমার ছেত্রী বলেন, ‘বিমান দুর্ঘটনায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল ২২ জনকে। তাঁদের মধ্যে আবিদ সুলতানও ছিলেন। তাঁর শরীরের বেশির ভাগ অংশই পুড়ে গিয়েছিল। গুরুতর আহত অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে লড়তে তিনি মারা যান।’

সূত্র জানায়, এক মাস আগে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বহরে একটি ড্যাশ-৮ বিমান যুক্ত হয়। এই বিমানটি ক্যাপ্টেন আবিদ কানাডা থেকে চালিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে বিধ্বস্ত হওয়া বিমানটি বাংলাদেশ থেকে রওনা দেওয়ার আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যাতায়াত করেছে। পাইলট ছিলেন ক্যাপ্টেন আবিদ। তিনি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসে শুধু বিমানই চালাতেন না, এই এয়ারলাইনসের প্রশিক্ষকও ছিলেন। এয়ারলাইনস সেক্টরে তাঁর ছাত্রের সংখ্যাও কম নয়। ড্যাশ-৮ এয়ারক্রাফট চালাতেন তিনি। সদালাপী, ছাত্রদের অতি প্রিয় ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতানের এভাবে চলে যাওয়া তাঁর বন্ধু, ছাত্রদের হতবাক করেছে।

ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতানের কোর্সমেট ক্যাপ্টেন সিকদার মেজবাহ আহমেদ বলেন, ‘আবিদ ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য পাইলট। বিমানবাহিনীর একজন ফাইটার পাইলট হিসেবে তাঁর সুনাম ছিল। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ৩৫ স্ক্রোয়াড্রনে ছিলেন তিনি। বিমানবাহিনীতে মিগ ২১ ও এফ ৭-ও চালিয়েছেন তিনি।’

নাবিলার দুই বছরের সন্তান পুলিশ হেফাজতে : নেপালে ইউএস-বাংলার বিধ্বস্ত হওয়া বিমানের কেবিন ক্রু নাবিলার উত্তরার বাসা থেকে কাজের বুয়াসহ নিখোঁজ হওয়া দুই বছরের মেয়ে হিয়ার সন্ধান মিলেছে। গতকাল দুপুরে ভাসানটেকে তার নানির বাসা থেকে হিয়াকে উদ্ধার করে পুলিশ। এখন সে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।

উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলী হোসেন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে হিয়ার খোঁজ মেলে। নানির পরিবারকে শিশুটিসহ থানায় ডাকা হয়। হিয়ার দাদি ও নানি দুজনই নাতনিকে নিতে চান। এই নিয়ে আমরা বিপদে আছি। তাঁদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’ তিনি আরো বলেন, বাসার কাজের বুয়াকে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। হিয়া আকার ইঙ্গিতে বোঝাচ্ছে সে তার দাদির কাছে থাকবে। তার পরও আলোচনা চলছে। 

গতকাল দুপুরে থানাহাজতে কাজের বুয়া রুনা কালের কণ্ঠকে জানান, ‘প্রায় এক মাস ধরে কাজ করি। স্যার বাসায় আসেন না। তিনি দেশের বাইরে থাকেন। তবে ম্যাডামের খালাতো বোন নুসরাত প্রায়ই বাসায় আসতেন। ম্যাডাম আমার কাছে হিয়াকে রেখে কর্মস্থলে চলে যান। ম্যাডামের মৃত্যুর খবর শুনে নুসরাত ম্যাডাম বাসায় আসেন। হিয়াকে তিনি নিয়ে যান। তারপর স্যারের মা বিবি হাজেরা বাসায় আসেন। নাতনিকে না পেয়ে বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেন। আমাকে দোষারোপ করা হয়। আমি নাকি তাকে লুকিয়ে রেখেছি।’ রুনা আরো বলেন, ‘আমাকে ফুঁসলিয়ে নুসরাত হিয়াকে নিয়ে গেছেন।’

শুধু মাকে খুঁজছে উম্মে সালমার শিশুসন্তান : মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রথম বড় স্বপ্ন ছিলেন উম্মে সালমা। বুয়েট থেকে পাস করে যোগ দেন পিডিবিতে। দুই বছর পর বিসিএস দিয়ে যোগ দিয়েছিলেন পরিকল্পনা কমিশনে। দক্ষিণখানের ইসলামবাগে বাবার বাড়িতেই থাকতেন বেশি। উম্মে সালমার অকালমৃত্যুর সংবাদ বিষাদ ছড়িয়ে দিয়েছে পুরো দক্ষিণখান এলাকায়। গতকাল দুপুরে ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৮৪ নম্বর বাইতুস সালাম নামের বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, সালমার আড়াই বছরের শিশু সামারা শুধু মাকে খুঁজছে। মায়ের ছবি নিয়ে আদর করছে। সালমার বড় ভাই আনোয়ার সাদত বলেন, ‘চাকরির সুবাদে বেইলি রোডের সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারে থাকত সালমা। প্রায়ই এখানে আসত। মৃত্যুর খবর আসার পর আমাদের ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।’ সালমার মা ফজিলাতুন্নেছা বলেন, ‘সামারাকে এখন কিভাবে রাখব, বুঝতে পারছি না। সামারা এখনো জানে না মা নেই। তার পরও মা মা করে কান্নাকাটি করছে। মা হয়ে সন্তানের মৃত্যুর খবর শোনা বড় কষ্টের।

 


মন্তব্য