kalerkantho


উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ

ঝক্কি সামলানোর প্রস্তুতি এখনই

আরিফুর রহমান   

১৮ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ঝক্কি সামলানোর প্রস্তুতি এখনই

কথায় কথায় এখন আর কেউ বাংলাদেশকে গরিব  দেশ বলে অবজ্ঞা করতে পারবে না। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের পর এবার জাতিসংঘ থেকে এলো বহুল প্রতীক্ষিত সেই স্বীকৃতি—গরিব দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জন। ১৯৭৫ সালে অন্তর্ভুক্তি, ৪৩ বছর পর ২০১৮ সালে মিলল এই স্বীকৃতি। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার তিনটি সূচকের মধ্যে সব কটিই পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের শুরু থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিন বছর নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতিপত্র দিয়েছে গত শুক্রবার। ওই দিন বিকেলে সিডিপি এসংক্রান্ত চিঠি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেনের কাছে হস্তান্তর করেছে। আরো তিন বছর—২০২১ পর্যন্ত দ্বিতীয় দফা এবং পরের তিন বছর তৃতীয় দফা পর্যবেক্ষণে রেখে সূচকগুলো অর্জনের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঘোষণা দেবে জাতিসংঘ।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ছয় বছর বাকি থাকলেও এ অবস্থান থেকে নিচে নামার সুযোগ নেই বাংলাদেশের। ২০২৪ সালের পর আরো তিন বছর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পেয়ে যাবে। ২০২৭ সাল থেকে বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বে রপ্তানিপণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার আর পাবে না। এ ছাড়া উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সহজ শর্তে স্বল্প সুদে ঋণও আর পাবে না। তাই এই ৯ বছরে দক্ষতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোর পথ খুঁজতে হবে বাংলাদেশকে।   

এর পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের সিঁড়িতে ওঠার পর লাভ-ক্ষতির হিসাব কষতে শুরু করেছে সরকার। উন্নয়নশীল দেশের ঘোষণা এলে বাংলাদেশ কোথায় কোথায় সুযোগ-সুবিধা হারাবে, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত হতে পারে, এসব বিষয় জানতে গবেষণার কাজ শুরু করেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। ১০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে গবেষণাটি পরিচালনার জন্য। অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটকে (পিআরআই) আলাদা একটি গবেষণার দায়িত্ব দিতে যাচ্ছে সরকার। এর পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) মাধ্যমে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত যেসব সুবিধা স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ এখন পেয়ে থাকে, উন্নয়নশীল হলে তাতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে সেটি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে যে কম চাঁদা দিতে হয়, উন্নয়নশীল দেশ হলে চাঁদার পরিমাণ কত বাড়বে, সেটি বিশ্লেষণ করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। শিল্পনীতি নিয়ে কাজ করছে শিল্প মন্ত্রণালয়। জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা থেকে শুরু করে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ।

জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, জাতিসংঘের একটি জটিল পদ্ধতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে ওঠার যোগ্যতাপত্র অর্জন করেছে। এখানে কোনো লবিং হয়নি। ভোটাভুটি হয়নি। বাংলাদেশকে আর কেউ দারিদ্র্যপ্রবণ দেশ বলবে না। এই অর্জন গৌরবের। অহংকারের। তিনি বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশ হলে বাংলাদেশ বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা হারাবে—বিভিন্ন মহল থেকে এমন কথা বলা হচ্ছে। বিষয়গুলো সরকারও জানে। কিন্তু কারো কাছে কোনো তথ্য নেই—আসলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত হবে। সে জন্য আমরা একটি বিস্তারিত গবেষণার কাজে হাত দিয়েছি। কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের কাজ শেষ হবে।  তা ছাড়া জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছর মেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিসি) বাস্তবায়নের জন্য সরকার যে কর্মকৌশল হাতে নিয়েছে, সেখানে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার বিষয়টিও মাথায় রাখা হয়েছে। ফলে সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতিই রয়েছে।’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার পর বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি নিয়ে একটি গবেষণা করতে সরকারের সঙ্গে আমাদের আলাপ-আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’ তিনি বলেন, সরকারের হাতে এখনো প্রায় এক দশক সময় থাকলেও প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডাসহ অন্যান্য দেশে বাজার সুবিধা হারানোর পর বিকল্প কী সুবিধা তৈরি করা যেতে পারে, সে জন্য এখন থেকে কাজ শুরু করতে হবে। জিএসপি হারালে জিএসপি প্লাস কিভাবে পাওয়া যেতে পারে, সে কৌশল এখন থেকে নিতে হবে। আমাদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা খুবই কম। সেটি বাড়াতে এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’

সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইকোনমিস্ট পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আকারে বাংলাদেশের উন্নয়নচিত্র তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০ থেকে ২৫ মার্চ রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত ঐতিহাসিক এই অর্জনকে উদ্‌যাপন করা হবে। জাতিসংঘের সিডিপি থেকে প্রতিনিধি এসে ২২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতাপত্র তুলে দেবেন। এসব অর্জন বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পাশাপাশি বিদেশি গণমাধ্যমেও প্রকাশ করা হবে। এতে বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।

সিডিপির তথ্য মতে, মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক—এই তিনটি সূচকের সব কটিই পূরণ করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের দেওয়া মানদণ্ড অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশ হতে হলে একটি দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় এক হাজার ২৩০ ডলার থাকতে হবে। বাংলাদেশের এখন আছে এক হাজার ২৭২ ডলার। মানবসম্পদ সূচকে ১০০-র মধ্যে ৬৬ বা তার বেশি থাকতে হবে, বাংলাদেশের সেখানে আছে ৭২। আর অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে ৩২ বা তার কম থাকতে হবে, বাংলাদেশের আছে ২৫।

ইআরডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২১ সালের পর আংকটাড ও ইউএনডেসা আলাদাভাবে দুটি গবেষণা করবে। দুটি গবেষণার উদ্দেশ্য থাকবে, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর কিভাবে চলবে সেই পরামর্শ দেওয়া।

বাংলাদেশের এখন থেকে কোন কোন প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি সে প্রসঙ্গে ড. শামসুল আলম, আহসান মনসুর ও ড. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে প্রায় একই ভাষ্যে বলেন, দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে তাদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এখন থেকে। পোশাকশিল্প এখন একক রপ্তানিমুখী খাত। এখানে যত দ্রুত সম্ভব বৈচিত্র্য আনতে হবে। অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এখন থেকে জোর প্রস্তুতি নিতে হবে। জিএসপি হারানোর আগেই জিএসপি প্লাস পেতে উদ্যোগ নিতে হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া কমে যাবে, তাই এখন থেকে বিকল্প অর্থায়নের পথ খুঁজতে হবে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় মোট জিডিপির অনুপাতে অনেক কম। এটি বাড়াতে হবে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসনও নিশ্চিত করার কথা বলেছেন তাঁরা।

উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ার পর বাংলাদেশ কী কী সুবিধা হারাতে পারে তা নিয়ে গবেষণা করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও মোস্তাফিজুর রহমান। তাঁদের দুজনের তৈরি করা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে প্রথমেই বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়বে জিডিপির প্রবৃদ্ধির ওপর। জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি প্রবাসীদের পাঠানো আয় (রেমিট্যান্স) এবং উন্নত দেশ থেকে সরকারিভাবে দেওয়া সহযোগিতা (ওডিএ) কমে যাবে। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার পর রপ্তানিতেও বড় আঘাত আসবে। উন্নয়নশীল দেশের কাতারে গেলে জিএসপি সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে রপ্তানিতে বিশেষ ভর্তুকি দেওয়ার যে সুযোগ পেয়ে বাংলাদেশ, সেটি আর থাকবে না। উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নাম লেখার সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানি করা পণ্যে অতিরিক্ত ৬.৭ শতাংশ শুল্ক বসবে। এতে বছরে রপ্তানি কমবে ২৭০ কোটি ডলার বা প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ এখন যেমন মেধাস্বত্বের মাধ্যমে বিদেশ থেকে ওষুধের কাঁচামাল আমদানি করে সেটি বিদেশে রপ্তানি করে, উন্নয়নশীল দেশ হলে সে সুবিধা আর থাকবে না।

অন্যদিকে ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ এখন রপ্তানিতে বিশেষ ভর্তুকি দিয়ে থাকে, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। উন্নয়নশীল দেশে গেলে রপ্তানিতে বিশেষ ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। স্বল্পোন্নত দেশ হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশ উন্নত বিশ্ব থেকে অনুদান পেয়ে থাকে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সভায় অংশগ্রহণ করতে সরকারি প্রতিনিধিদল বিনা পয়সায় যাওয়ার যে সুযোগ পেয়ে থাকে, সেটিও বন্ধ হবে।

যদিও  সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এসব তথ্য কতটা সঠিক, তা নিয়ে সংশয় আছে। সে জন্য সরকার আলাদাভাবে গবেষণার কাজ শুরু করেছে।


মন্তব্য