kalerkantho


ঢাকা ৬ ঘণ্টা বিচ্ছিন্ন

► টঙ্গীতে ট্রেনের চার বগি লাইনচ্যুত নিহত ৪
► কুষ্টিয়ায় ট্রেনের ধাক্কায় নিহত দুই স্কুলছাত্র

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকা ৬ ঘণ্টা বিচ্ছিন্ন

টঙ্গীতে ট্রেনের লাইনচ্যুত বগি। ছবি : শেখ হাসান

গাজীপুরের টঙ্গীতে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়ে চারজন নিহত হয়েছে। গতকাল রবিবার দুপুরের এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে কমপক্ষে ২৫ জন। এর জের ধরে টানা ছয় ঘণ্টা ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। ঘটনা তদন্তে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে। একই দিন পৃথক ঘটনায় কুষ্টিয়ায় লেভেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে মোটরসাইকেল আরোহী দুই স্কুল ছাত্র।

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর ও টঙ্গী প্রতিনিধি জানান, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে ঢাকা অভিমুখে ছেড়ে আসা একটি কমিউটার ট্রেন গাজীপুরের টঙ্গীতে এসে দুর্ঘটনায় পড়ে। গতকাল দুপুরে টঙ্গী জংশনসংলগ্ন নতুনবাজার এলাকায় ট্রেনটির চারটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এ সময় চারজন নিহত ও কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়। নিহতরা হলেন গাজীপুরের শ্রীপুরের দুর্লভপুর গ্রামের আবদুল আলীর ছেলে খোকন (৪৫), ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার নামা লঙ্গাইর গ্রামের ছামান উদ্দিন বেপারীর ছেলে আমির উদ্দিন (৩৫) ও মশাখালী গ্রামের শাহ আলম (৩৫) এবং ময়মনসিংহের শাহাদাত হোসেন।

দুর্ঘটনার পর ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। বগি উদ্ধার ও লাইন মেরামতের পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরু হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী কমিউটার ট্রেনটি টঙ্গী জংশনে দীর্ঘ যাত্রাবিরতি শেষে ঢাকার দিকে যাচ্ছিল। নতুনবাজার এলাকায় গিয়ে একটি পয়েন্ট অতিক্রমের সময় ট্রেনের ইঞ্জিনসহ কয়েকটি বগি আপ লাইনে এবং পেছনের চারটি বগি ডাউন লাইনে ঢুকে পড়ে। ফলে একটি বগি বিকট শব্দে লাইনচ্যুত হয়ে দুই লাইনের ওপর আড়াআড়ি হয়ে পড়ে। এ অবস্থায়ও ট্রেনটি সামনে এগোতে থাকে। একই সময় ঢাকা থেকে একটি কমিউটার ট্রেন টঙ্গী অভিমুখে ছুটে আসছিল। এ সময় আতঙ্কে অনেক যাত্রী নিচে লাফিয়ে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হয়। স্থানীয় লোকজন, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পরে হাসপাতালে আরো একজনের মৃত্যু হয়।

ট্রেনের আহত যাত্রী লিয়াকত আলী, নজরুল ইসলাম ও আব্দুল বাতেন জানান, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে ভোর ৪টার দিকে ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। লোকাল ট্রেনটি প্রতিটি স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে আসায় ভেতরে ও ছাদে যাত্রীর ভিড় ছিল অত্যধিক। অধিকাংশ যাত্রী স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষ হওয়ায় তারা সাধারণত ট্রেনের ছাদে অল্প বা বিনা ভাড়ায় যাতায়াত করে থাকে। হতাহতদের প্রায় সবাই রাজধানীতে রিকশাচালক, মাটিকাটা শ্রমিক ও ইটভাঙা শ্রমিক ছিল।

টঙ্গীর শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক পারভেজ হোসেন জানান, আহত অবস্থায় ২৬ জনকে আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে মো. বাদল, সবুজ, ইসরাফিল, আলমগীর, বাদল, শরিফ ও শাহ আলম নামের সাতজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ছয়জন টঙ্গী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা মেডিক্যালের আবাসিক চিকিৎসক মো. আলাউদ্দিন জানান, এখানে দুজন চিকিৎসাধীন থাকলেও তারা আশঙ্কামুক্ত।

দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণা, ট্রেনটি পয়েন্ট অতিক্রমের আগেই সিগন্যাল পরিবর্তন করায় এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে। টঙ্গীর স্টেশন মাস্টার হালিমুজ্জামান জানান, সকালে সহকারী স্টেশন মাস্টার আবদুর রাজ্জাক দায়িত্ব পালন করছিলেন। ১১টা ২০ মিনেটে ট্রেনটি টঙ্গী স্টেশনে এসে থামে। কয়েকটি আন্ত নগর ট্রেনের ক্রসিংয়ের কারণে ট্রেনটি দীর্ঘক্ষণ এখানে যাত্রাবিরতি করে। ১২টা ১৫ মিনিটে ট্রেনটি বিমানবন্দর স্টেশনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। একই সময় বিমানবন্দর স্টেশন থেকে জয়দেবপুরগামী একটি ডেমু ট্রেন টঙ্গীর দিকে আসছিল। নতুন বাজার এলাকায় রেললাইনের ৩৮ নম্বর পয়েন্টে গিয়ে ট্রেনটি আপ ও ডাউন লাইনে ভাগ হয়ে ঢুকে পড়ায় ওই দুর্ঘটনা ঘটে।

দুপুর সোয়া ২টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, সিগন্যালম্যান সংকেত দিতে বিলম্ব করায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঘটনা তদন্তে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামানকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (পূর্ব) মিজানুর রহমান এবং প্রধান সিগন্যাল ও টেলিকম ইঞ্জিনিয়ার চন্দন কুমার দাস। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। মন্ত্রী জানান, সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. মিয়া জাহান জানান, দুর্ঘটনার কারণে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ও ঢাকা অভিমুখী সব ট্রেন বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ে। দুপুর ২টার দিকে একটি উদ্ধারকারী ট্রেন ঢাকা থেকে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করে। বগিগুলো সরিয়ে নেওয়া এবং লাইন মেরামতের পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে ট্রেন চলাচল শুরু হয়।

কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি মো. ইয়াসিন জানান, নিহতদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া জানান, কুষ্টিয়ার পোড়াদহ ইউনিয়নের চিথলিয়া গ্রামের অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় দুই স্কুল ছাত্র নিহত হয়েছে। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে পোড়াদহ স্টেশনের পাশে চিথলিয়া রেলগেটে শাটল ট্রেনের ইঞ্জিন ঘোরানোর সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলো—কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আইলচারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আয়াতুল্লাহ (১৪) ও নবম শ্রেণির ছাত্র মবিন (১৫)। তাদের বাড়ি পাশের আইলচারা গ্রামে।

পোড়াদহ জিআরপি জানায়, গোয়ালন্দ ঘাট থেকে ছেড়ে আসা পোড়াদহগামী শাটল ট্রেনটির ইঞ্জিন পরিবর্তনের সময় পোড়াদহ জংশনের পূর্ব পাশে চিথলিয়া নামক স্থানে মোটরসাইকেল আরোহী দুজন লেভেলক্রসিং পার হওয়ার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে।

 

 

 


মন্তব্য