kalerkantho


কোটা সংস্কার আন্দোলন

তিন নেতাকে তুলে নেওয়ায় উত্তেজনা

► চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
► জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই মুক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি   

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



তিন নেতাকে তুলে নেওয়ায় উত্তেজনা

ছবি: কালের কণ্ঠ

চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করা বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের তিন যুগ্ম আহ্বায়ককে গতকাল সোমবার দুপুরে আটক করেছিল ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তবে এক ঘণ্টা পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ছাড়া পেয়ে ওই তিন নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, দুপুরের খাবার খাওয়ার উদ্দেশ্যে চানখাঁরপুল যাওয়ার সময় পথে রিকশা থেকে তাঁদের নামিয়ে জোর করে একটি সাদা গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। গাড়িতে তুলেই গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে ফেলা হয় তাঁদের। তবে কোনো জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই শুধু ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে তাঁদের ছেড়ে দিয়েছে ডিবি।

যাঁদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁরা হলেন নুরুল হক, মোহাম্মদ রাশেদ খান ও ফারুক হাসান। আন্দোলনকারীদের ধরে নেওয়ার বিষয়ে ডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁদের আটক করা হয়নি, আলোচনার জন্য ডাকা হয়েছিল। তাঁরা চলে গেছেন। এর আগে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নামে শাহবাগ থানায় করা মামলা দুই দিনের মধ্যে তুলে নেওয়ার দাবি জানানো হয়। গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ওই মামলা তুলে না নিলে আবারও আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

স্থানীয় দোকানদারসহ একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলে ওই তিন নেতাকে তুলে নেওয়ার সত্যতা পাওয়া যায়। এসংক্রান্ত খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সরব হয়ে ওঠে আন্দোলনকারীরা। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে তাদের মধ্যে। তাত্ক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন এবং ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে তারা। পরে তিন নেতাকে ছেড়ে দেওয়া হলে সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা তুলে নেওয়ার ঘটনার বিবরণ দেন।

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক বলেন, দুপুর দেড়টার দিকে তাঁরা তিনজন রিকশায় করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে যাওয়ামাত্র সাদা পোশাকের কয়েকজন পুলিশ সদস্য অস্ত্র দেখিয়ে তাঁদের মাইক্রোবাসে ওঠান। এরপর একজনের চোখ-মুখ বেঁধে ফেলেন। এরপর তাঁদের গুলিস্তানে নিয়ে গিয়ে ডিবি সদস্যরা কয়েকটি গামছা কেনেন। ওই গামছা দিয়ে তাঁদের বাকি দুজনের চোখ-মুখ বেঁধে ফেলা হয়। নুরুল হক বলেন, ‘তারা (ডিবি) জানায়, কিছু তথ্য নেবে আর ভিডিও দেখানো হবে; কিন্তু নিয়ে গিয়ে কিছুই বলেনি। কোনো কিছু জানতেও চায়নি। ভিডিও দেখানো হয়নি। ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।’

দুপুর আড়াইটার দিকে তাঁদের ছেড়ে দেয় ডিবি পুলিশ। এরপর তাঁরা ক্যাম্পাসে চলে যান। তিন নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে উপস্থিত হলে আন্দোলনকারীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে তাঁদের স্বাগত জানায়।

সংবাদ সম্মেলনে নুরুল হক বলেন, ‘গাড়িতে তোলার পর তারা আমাদের গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে ফেলে। তুলে নেওয়ার বিষয়ে তারা জানিয়েছে আমাদের ওপর নাকি হামলার আশঙ্কা ছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘তথ্য নেওয়ার প্রয়োজন থাকলে স্বেচ্ছায় ডাকতে পারত। চোখ বেঁধে তুলে নেওয়ার কারণ কী? তুলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভেবেছি আর হয়তো জীবিত ফিরতে পারব না।’ কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সারা দেশের নেতাকর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে উল্লেখ করে তিনি সবার নিরাপত্তার দাবি জানান।

যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ রাশেদ খান অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার বাবাকেও থানায় আটক করা হয়েছে। অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হচ্ছে। তাঁকে দিয়ে জোর করে বলানো হচ্ছে আমি শিবির করি, আমার বাবা জামায়াতের লোক। সাধারণ ছাত্র হিসেবে আমি কোনো ন্যায্য দাবি করলে কেন এভাবে হয়রানিতে পড়তে হবে? আমি কি আমার অধিকার চাইতে পারি না? আমি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত না। আমরা হুমকির মুখে, আমাদের নিরাপত্তা দিতে হবে।’

জরুরি বিভাগের সামনের এক রেস্টুরেন্টকর্মী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথমে রিকশা থামানো হয়। তিনটি মোটরসাইকেল রাস্তা অবরোধ করে জোর করে তাদের গাড়িতে তোলে। পরে গাড়িটি চানখাঁরপুল মোড়ের দিকে চলে যায়।’

ডিবির যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘তাঁদের কিছু তথ্য সহযোগিতার জন্য আনা হয়েছিল। তাঁরা চলে গেছেন। তাঁদের কিছু ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয়েছে। সেগুলোর বিষয়ে তাঁদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে। তাঁদের আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি।’ সবার কাছ থেকেই তথ্য নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

মামলা প্রত্যাহার না করা হলে আবারও আন্দোলন : সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় দায়ের করা মামলা দুই দিনের মধ্যে তুলে না নেওয়ায় আবারও আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ছাড়া একটি পত্রিকায় তাদের নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের জন্য ক্ষমা চাওয়ার সময় বেঁধে দেওয়া হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ‘আগামী দুই দিনের মধ্যে মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। আর না করলে প্রয়োজনে আবার আন্দোলনে যাব।’

লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নুরুল হক। তিনি বলেন, ‘আমাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ নির্মমভাবে হামলা চালায়। সেই হামলায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা আহত হয়েছে। আবার সেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামেই মামলা করা হয়েছে। আন্দোলন থেকে সরে আসার কয়েকটি দাবির মধ্যে একটি দাবি ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে করা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে; কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। যদি আগামী দুই দিনের মধ্যে মামলা প্রত্যাহার করা না হয়, তাহলে প্রয়োজনে আমরা আবার আন্দোলনে যাব।’ তিনি আরো বলেন, ‘উপাচার্যের বাড়িতে যারা হামলা করেছে তারা আমাদের আন্দোলনকারী ছাত্র নয়। যারা ন্যক্কারজনকভাবে হামলা করেছে, তাদের খুঁজে বের করে বিচারের দাবি জানাচ্ছি।’


মন্তব্য