kalerkantho


লঞ্চ যাত্রা

সদরঘাটে অপেক্ষা যেন শেষ হয় না

জহিরুল ইসলাম   

১৪ জুন, ২০১৮ ০০:০০



সদরঘাটে অপেক্ষা যেন শেষ হয় না

ঈদ যাত্রা : নারীর টানে ঘরে ফিরতে শুরু করেছে রাজধানীবাসী। গতকালও লঞ্চে ছিল উপচে পড়া ভিড়। ছবি : কালের কণ্ঠ

পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে সড়ক, রেল ও নদীপথে ছুটছে মানুষ। ঈদ যাত্রায় আগের বছরগুলোর চেয়ে দুর্ভোগ এখন পর্যন্ত কিছুটা কম। তবে আজ সবচেয়ে বেশি যাত্রীর চাপ ভোগান্তির মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে

 

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে পৌঁছানো পর্যন্ত যানজট ভোগাচ্ছে যাত্রীদের। যানজট পেরিয়ে লঞ্চে উঠলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হচ্ছে তাদের। নিয়ম অনুযায়ী যাত্রী পূর্ণ হলেই লঞ্চগুলোর রওনা হওয়ার কথা। কিন্তু সেই নিয়ম কেউ মানছে না। এমন পরিস্থিতিতে পড়ে ঈদ যাত্রায় ভোগান্তি তীব্র হচ্ছে ঘরমুখো হাজারো মানুষের।

গতকাল বুধবার দুপুর ১টার দিকে সুরমা আক্তার কাঁধে আর হাতে ব্যাগ নিয়ে এক আঙুলে কোনো মতে একমাত্র সন্তানকে আগলে রেখে এগোচ্ছিলেন সদরঘাটের উদ্দেশে। যাবেন গ্রামের বাড়ি ভোলায় পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার জন্য। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে লাগা যানজটের কারণে বাহন ছেড়ে দিয়ে হেঁটেই পথ ধরেন সদরঘাট টার্মিনালের। একই অবস্থা হয় লঞ্চ ধরার হাজারো যাত্রীর।

দুপুর ১টার দিকে দেখা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের প্রবেশমুখ পর্যন্ত রিকশা, সিএনজিসহ নানা বাহনের জট লেগে আছে। ফুটপাতেও হাঁটার জো নেই। একদিকে যানজট, মানবজট অন্যদিকে ফুটপাতে অবৈধ অস্থায়ী দোকান দুইয়ে মিলে ঘাট পর্যন্ত যাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। জাহাঙ্গীর হোসেন নামের এক ব্যক্তি মাথায়, গলায় ও হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে প্রবেশ করেন দুপুর দেড়টায়। প্রশ্নের জবাবে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘চিটাগাং রোড থেকে বরিশালের উজিরপুর রওনা দিয়েছি। আমার সাথে বউ আর বাচ্চা আছে। চিটাগাং রোড থেকে বাস আর রিকশায় করে বাহাদুরশাহ পার্ক পর্যন্ত ভালোভাবেই আসতে পেরেছিলাম। কিন্তু এখানে এসে অনেক সময় রিকশায় বসে থেকে আর সহ্য না হওয়ায় এভাবে পথ ধরলাম।’

টার্মিনালে পৌঁছে যাত্রীরা পড়ে অপেক্ষার পালায়। লঞ্চে উঠে বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিআইডাব্লিউটিএর পক্ষ থেকে যাত্রী ভর্তি হলেই লঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশনা থাকলেও মানছিল না বেশির ভাগ লঞ্চ। নির্ধারিত সময়ে ছাড়ার দোহাই দিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী তোলার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে।

দুপুর ২টায় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-বেতুয়া-চরফ্যাশনগামী এমভি ফারুক-৬ দাঁড়ানো। লঞ্চটির ছাদ ও প্রতিটি তলাই যাত্রীতে পরিপূর্ণ। জানা যায়, ৭০০ জনের ধারণক্ষমতার এই লঞ্চ মঙ্গলবার রাতে এসে ভেড়ে সদরঘাট। রাত থেকেই যাত্রীরা উঠতে থাকে লঞ্চে। রাত পেরিয়ে সকাল হতে না হতেই লঞ্চটি যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু তার পরও এটি ছাড়া হচ্ছিল না। লঞ্চটি না ছাড়ায় দুপুর ২টার দিকে কিছু যাত্রী লঞ্চের ভেতরে ভাঙচুর শুরু করে। এ সময় নৌ পুলিশ এসে লঞ্চটি ছাড়তে বাধ্য করে। লঞ্চটির যাত্রী ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘ভাই, জায়গা পাওয়ার জন্য গতকাল রাত ৮টায় এসে উঠছি। রাতে সমস্যা না হলেও সকাল হতে না হতেই মানুষ বেশি হয়ে যাওয়ায় গরমে আর টিকা যাচ্ছিল না। কয়েকজন মিলে প্রতিবাদ করায় নৌ পুলিশের চাপে পড়ে লঞ্চটি এখন ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।’ 

একই সময় ঢাকা-আয়শাবাদগামী এমভি কর্ণফুলী-১২ লঞ্চটিও ৭ নম্বর পন্টুনে দাঁড়িয়ে ছিল। এই লঞ্চটিও যাত্রীবোঝাই হওয়া সত্ত্বেও ছাড়া হচ্ছিল না। যাত্রীরা বারবার বলছিল, ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ উঠে বসে আছে, তাও কেন ছাড়ছে না? ১১ নম্বর পন্টুনে ভোলাগামী গ্লোরী অব শ্রীনগর-৭, ১০ নম্বর পন্টুনে ঢাকা-পাতারহাটগামী এমভি ইয়াদ-৩, ৮ নম্বর পন্টুনে বন্ধন-৫ যাত্রী পরিপূর্ণ করে দাঁড়িয়ে আছে। যাত্রীরা লঞ্চগুলোকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিষয়টি মাথায় নিচ্ছিল না। বিষয়টি নিয়ে কথা বললে নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মো. আলমগীর কবীর বলেন, লঞ্চে যাত্রী হয়ে গেলে ছেড়ে যাওয়ার জন্য মালিকদের বলা আছে। তার পরও না গেলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এলে ছাড়তে বাধ্য করা হবে।

সকাল থেকে কয়টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে, সামনের দিনগুলোর জন্য প্রস্তুতি কেমন নেওয়া হয়েছে—কালের কণ্ঠ’র এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিভিন্ন রুটে আমাদের ৫০টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে। রাত পর্যন্ত আরো প্রায় ৭০টি লঞ্চ ছাড়া হবে। যাত্রীর চাপ থাকলে আরো ব্যবস্থা করা হবে। বৃহস্পতিবারের জন্য আমাদের ১৫০টি লঞ্চ প্রস্তুত রাখা আছে। দরকার হলে আরো বাড়ানো হবে। সেই সঙ্গে সরকারি দুটি স্টিমার প্রতিদিন ছাড়া হচ্ছে।


মন্তব্য