kalerkantho


রোহিঙ্গাদের রক্ষায় বিশ্ব ব্যর্থ

ওয়াশিংটন পোস্টে বিশেষ নিবন্ধে জাতিসংঘ মহাসচিব

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গাদের রক্ষায় বিশ্ব ব্যর্থ

আন্তোনিও গুতেরেস

রোহিঙ্গাদের নিয়ে মর্মস্পর্শী ভাষায় একটি নিবন্ধ লিখেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ‘জাতিগত নির্মূলের শিকার রোহিঙ্গারা। বিশ্ব তাদের ব্যর্থ করে দিয়েছে’ শীর্ষক নিবন্ধটি গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকারি বাহিনীর নির্যাতনের বর্ণনাকে ‘শরীর হিম করা’ কাহিনি বলে অভিহিত করেছেন তিনি। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরের সূত্র ধরে গুতেরেস এ নিবন্ধটি লেখেন। কালের কণ্ঠ’র পাঠকদের জন্য তাঁর মর্মস্পর্শী নিবন্ধটি হুবহু তুলে ধরা হলো :ছোট ছোট বাচ্চাকে হত্যা করা হয়

তাদের মা-বাবার সামনে। শিশু ও নারীদের যখন ধর্ষণ করা হয়, তখন পরিবারের সদস্যদের নির্যাতন করা হয়, হত্যা করা হয়। গ্রামগুলো পুড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গত সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরের গিয়ে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে ব্যাপক হত্যা ও সহিংসতার মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে শরীর হিম করা যে বর্ণনা শুনেছি, তা শোনার জন্য কিছুই আমাকে প্রস্তুত করতে পারত না।

জাতিগতভাবে বেশির ভাগই মুসলিম এই জনগোষ্ঠীর এক লোক তাঁর বড় ছেলেটিকে তাঁর সামনে কিভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ওই ব্যক্তির মাকে পাশবিকভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর বাড়িটি পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তিনি একটি মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেনারা তাঁকে পেয়ে যায়, তাঁর ওপর নির্যাতন চালায় এবং কোরআন পুড়িয়ে দেয়।

এই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা, যারা জাতিগত নিধনের শিকার হয়েছে বলে সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত; তারা এক নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু একজন দর্শনার্থীর (ভিজিটর) মর্মপীড়া ও ক্ষোভকে উসকে দিতে পারে। তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা অনুধাবন করার মতো নয়। কিন্তু ১০ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুর জন্য এগুলোই হচ্ছে বাস্তবতা।

রোহিঙ্গারা একটি নিপীড়ন কাঠামোর শিকার হয়েছে—নিজেদের দেশ মিয়ানমারের নাগরিকত্বের অধিকার থেকে শুরু করে বেশির ভাগ মৌলিক মানবাধিকার থেকেই বঞ্চিত থেকেছে।

মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এক বছর ধরে পদ্ধতিগতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। এর মাধ্যমে তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভেতরে পরিকল্পিত ত্রাস ঢুকিয়ে দেয়। এর লক্ষ্য ছিল তাদেরকে একটি আতঙ্কজনক বাছাইয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া। আর সেটি হলো হয় তোমরা এই মৃত্যুর আতঙ্কের মধ্যে থাকো, নয়তো সব কিছু ছেড়ে শুধু বাঁচার জন্য পালিয়ে যাও।

নিরাপত্তার সন্ধানে এক দুর্বিষহ যাত্রা শেষে, এই উদ্বাস্তুরা এখন চেষ্টা করছে বাংলাদেশের কক্সবাজারে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে খাপ খাইয়ে নিতে। এর অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হচ্ছে, তা বিশ্বের দ্রুততম শরণার্থী সংকট হিসেবে গড়ে ওঠা।

একেবারেই সীমিত সম্পদ নিয়ে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। যেখানে এখনো বিশ্বজুড়ে বৃহত্তর ও অধিক সম্পদশালী দেশগুলো বাইরের মানুষের জন্য দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ তাদের সীমান্ত খুলে দিয়েছে এবং আপন করে নিয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষের সহানুভূতি ও উদারতা মানবতার সর্বোচ্চ রূপ তুলে ধরেছে এবং হাজার হাজার প্রাণ রক্ষা করেছে।

কিন্তু এই সংকটের প্রতি সাড়া অবশ্যই একটি বৈশ্বিক ব্যাপারও বটে।

জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিয়ে শরণার্থীবিষয়ক একটি বৈশ্বিক চুক্তি চূড়ান্ত হচ্ছে। পালিয়ে বেড়ানো মানবতার জন্য বাংলাদেশের মতো (শরণার্থী সমস্যায় জর্জরিত) সামনের সারির দেশগুলোকে যাতে একা মোকাবেলা করতে না হয়, সে জন্য এই চুক্তি হচ্ছে। এখন অবশ্য জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলো শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা দেশকে নিয়ে পরিস্থিতি উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু দুর্যোগ এড়াতে জরুরি ভিত্তিতে আরো সম্পদ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শরণার্থী সংকটে বৈশ্বিকভাবে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার যে নীতি, এর প্রতি অধিকতর সাড়াও দিতে হবে।’

‘প্রায় ১০০ কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা তহবিলের আবেদনের বিপরীতে মাত্র ২৬ শতাংশ জোগাড় হয়েছে। এই ঘাটতির অর্থ শরণার্থী শিবিরে অপুষ্টি বিদ্যমান। এর অর্থ হলো পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা একটি আদর্শ অবস্থা থেকে অনেক দূরে। এর মাধ্যমে এটা বোঝা যাচ্ছে যে আমরা শরণার্থী শিশুদের মৌলিক শিক্ষা দিতে পারছি না। শুধু তাই নয়, এর অর্থ এটাও যে, বর্ষাকালের ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত।

আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের তাড়াহুড়ো করে তৈরি বস্তিগুলো এখন কাদায় ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিকল্প জায়গা খুঁজে আরো শক্তিশালী আশ্রয়স্থল নির্মাণ নিতান্ত জরুরি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অনেক কিছুই করা হয়েছে। তবু মারাত্মক ঝুঁকি রয়ে গেছে, সংকটের বহুমাত্রিকতার কারণে।

আমি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের সঙ্গে বাংলাদেশ সফর করেছি। রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয়দাতাদের সহায়তায় ব্যাংক থেকে ৪৮০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। তার পরও আন্তর্জাতিক মহল থেকে অনেক অনেক সহায়তা দরকার। শুধু সংহতি জানালেই হবে না, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন বাস্তব সহায়তা।

মিয়ানমারে এত নির্যাতন সহ্য করার পরও কক্সবাজারে আমার দেখা রোহিঙ্গারা আশা ছেড়ে দেয়নি। ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া নিজ শিশুকে বুকে নিয়ে থাকা এক মাকে দেখিয়ে বিপর্যস্ত কিন্তু দৃঢ়চেতা এক নারী বললেন, ‘আমরা চাই মিয়ানমারে আমাদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব দেওয়া হোক। আমাদের বোন, কন্যা ও মায়েদের যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তার বিচার চাই।’

রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান হবে না। একইভাবে এই পরিস্থিতি অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে দেওয়াও যায় না।

মিয়ানমারকে অবশ্যই পূর্ণ অধিকার এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রতিশ্রুতিসহ শরণার্থীদের ফিরে যাওয়ার জন্য উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। এর জন্য দরকার ব্যাপক বিনিয়োগ—এটা শুধু মিয়ানমারের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলের সব জনগোষ্ঠীর জন্য পুনর্নির্মাণ ও উন্নয়নের ক্ষেত্রেই নয়, পুনর্মিলন ও মানবাধিকারের জন্য শ্রদ্ধাবোধ ফিরিয়ে আনার জন্যও।

রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার শেকড় খুঁজে বের করে সামগ্রিক সমাধান না করা হলে তা দুর্দশা ও ঘৃণা-সংঘাতে উসকানি দেবেই। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বিস্মৃত ভুক্তভোগীতে পরিণত হতে পারে না। সহায়তার জন্য তাদের জোরালো আবেদনে আমাদের অবশ্যই সাড়া দিয়ে কাজে নামতে হবে।

 



মন্তব্য