kalerkantho


২০৫০ সালের এক পেঁয়াজকাহিনি

রফিকুল ইসলাম কামাল

১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



২০৫০ সালের এক পেঁয়াজকাহিনি

২০৫০ সাল। মনির সাহেব বাসার বারান্দায় পায়চারি করছেন।

এটা তাঁর উদ্বিগ্ন থাকার বহিঃপ্রকাশ। উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণটা বাসার সবার জানা। তাই কেউ তাঁর ছায়া মাড়াচ্ছে না। অবশ্য বাসার সবাই-ই কমবেশি উদ্বেগের মধ্যে আছেন। এক-দুই কেজি থাকলে তা-ও একটু নিশ্চিন্ত থাকা যেত। কিন্তু দঅঅশশশ কেজি! নাহ, নিশ্চিন্তে থাকার জো নেই!

মনির সাহেব বাসায় জরুরি সভা আহ্বান করেছেন। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের সে সভায় উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একজন, দুজন করে সভায় আসতে শুরু করেছেন তাঁরা। অন্য দিন হলে হাসি-ঠাট্টায় বাসা মাতিয়ে তুলতেন সবাই মিলে।

কিন্তু আজ কারো মুখে হাসি নেই। ব্যাপক ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে একে একে সবাই এসে ড্রয়িংরুমে নিশ্চুপ বসে আছেন। না থেকেই বা উপায় কী! কম বড় কথা! দশ কেজির ব্যাপার!

সভায় যাঁদের ডাকা হয়েছে, তাঁরা সবাই উপস্থিত। ড্রয়িংরুমে পিনপতন নীরবতা। বাসার গেটে ‘অ্যাডভান্স সিকিউরিটির’ দায়িত্বে আছেন মনির সাহেবের মেজো ছেলে। দোতলা বাসার বেলকনিতে এক্সট্রা সিকিউরিটির দায়িত্ব পালন করছেন ছোট ছেলে। বাসার সদর দরজায় তালা দেওয়া।

মনির সাহেব একটু খুকখুক করলেন। সবার কান খাড়া হয়ে গেল। তিনি বললেন, ‘আপনাদের কী জন্য ডেকেছি, তা সবাই জানেন। পরিস্থিতি খুবই গুরুতর। বর্তমান সময়ে ১০ কেজি কারো কাছে থাকা মানে অ-নে-ক বড় ব্যাপার! এখন যার কাছে পাঁচ কেজি আছে, সে-ই আতঙ্কিত! আর আমার কাছে তো ১০ কেজি! গুরুতর বিষয়। ’

মনির সাহেবের বড় ভাই, কবির সাহেব প্রায় জোর করেই কথা বলতে শুরু করলেন, ‘আমি ভেবে পাচ্ছি না, কোন আক্কেলে তুই এই সময়ে ১০ কেজি কিনে আনলি! এত দাম, অথচ সে ১০ কেজি কিনে এনেছে। ’

কবির সাহেবকে কথা শেষ করতে না দিয়ে মনির সাহেব বললেন, ‘ভাইজান, আপনি জানেন, আমি একসঙ্গে সব কিনে ফেলি। এবারও তা-ই হয়েছিল। আমি তো বুঝিনি হুট করে এভাবে মূল্য ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে! জানলে কিনতাম না। ’

‘হুম!’ গম্ভীর হয়ে গেলেন কবির সাহেব।

মনির সাহেব আবার মুখ খুললেন, ‘ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, আমার মিসেস কথায় কথায় পাশের বাসার ভাবিকে ১০ কেজির বিষয়টি বলেছিলেন। ওই ভাবির মুখ থেকে এখন তা পুরো পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছে! কালকে বাসা থেকে বেরিয়েছিলাম। সবাই কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। তা ছাড়া বাসায় ফেরার পথে দেখি, দুই অচেনা যুবক আমাকে ফলো করছে! আজকে সে জন্য ভয়ে আর বাসা ছেড়ে বেরোইনি। কিন্তু সকাল থেকে বাসার আশপাশে অচেনা লোকদের আনাগোনা দেখে খুবই আতঙ্কে আছি। কিছু একটা করেন। ’

এর মধ্যে আজমল সাহেব একটা পরামর্শ দিলেন।

‘এতে কাজ হবে?’ করিম সাহেব তবু সন্দিহান।

‘হবে। নিশ্চিত থাকুন। সামান্য কিছু টাকা খরচ হবে। কিন্তু নিজেদের নিরাপদ রেখে এই অকালের দিনে ওই ১০ কেজিও নিরাপদ রাখতে পারবেন। ’

পরদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মনির সাহেবের নিজের পাড়া, এমনকি আশপাশের দু-তিন পাড়ায় মাইকিং করলেন—‘ভাইসব! ভাইসব! একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি। মনির সাহেবের ঘরে একটি ব্যাগের মধ্যে ১০ কেজি পেঁয়াজ ছিল। গতকাল বিকেল থেকে সেই পেঁয়াজের ব্যাগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি ওই ব্যাগভর্তি পেঁয়াজের সন্ধান পেলে অমুক ঠিকানায় যোগাযোগ করার অনুরোধ রইল। ভাইসব!...’

এর পর থেকে মনির সাহেবের বাসার আশপাশে কাউকে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়নি। কেউ তাকে ফলো করেনি, অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায়নি। অতঃপর তাঁরা ১০ কেজি পেঁয়াজ নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগলেন!


মন্তব্য