kalerkantho

১৬ নভেম্বর সহনশীলতা দিবস

সহনশীলতার একদিন

মেহেদী আল মাহমুদ

১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সহনশীলতার একদিন

লিটন সাহেব একটু রগচটা মানুষ। যেকোনো কিছুতেই চট করে রেগে যাওয়া তাঁর ছোটবেলার অভ্যাস।

রাগের কারণেই এলাকার ছেলে-বুড়ো কেউ তাঁকে ভালো চোখে দেখে না। সেই লিটন সাহেবই কিনা আজ রাগ না করে আরেকটু সহনশীল থাকার পরিকল্পনা করলেন। কারণ আর কিছু না। আজ নাকি বিশ্ব সহনশীলতা দিবস। তাঁর ইচ্ছা, দিবসটা যথোপযুক্তভাবে পালন করা।

লিটন সাহেব একটু আগে সকালের নাশতা সেরেছেন। নাশতার পর পান খাওয়া তাঁর কমন কাজগুলোর মধ্যে একটি। অভ্যাস মতো পান মুখে পুরে সবে আয়েশ করে চিবুনিটা দিয়েছেন, এমন সময় রান্নাঘর থেকে আওয়াজ এলো, ‘সারা দিন গরুর মতো বসে বসে জাবর কাটলে চলবে? বলি বাজার-সদাই করবে কে শুনি?’

দিনের শুরুতে এমন কমেন্টস পড়লে কার মেজাজ ভালো থাকে? লিটন সাহেবের মেজাজও ভালো থাকল না। মিসেস লিটনকে তাঁর কমেন্টসের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার জন্য যেই না মুখ খুলতে যাবেন, তখনই মনে পড়ল সহনশীল থাকার কথা।

অগত্যা হাসিমুখ নিয়ে স্ত্রীর কাছে গিয়ে বললেন, ‘আগে বলবে তো যে বাজার লাগবে। ব্যাগটা দাও, এখনই নিয়ে আসছি। ’

লিটন সাহেব বাজারের ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় নেমে এলেন। বাজার খুব বেশি দূরে নয়; কিন্তু আজ তাঁর হাঁটতে ইচ্ছা করছে না বলে রাস্তায় দাঁড়ানো রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই খালি, বাজারে যাবে?’

রিকশাওয়ালা বললেন, ‘যামু স্যার, তয় পুঞ্চাশ টেহা লাগব। ’

২০ টাকার ভাড়া ৫০ টাকা চাইলে মেজাজ ঠাণ্ডা রাখা কঠিন। লিটন সাহেব সেই কঠিন কাজটিই করলেন। কারণ সহনশীলতা দিবস। সহনশীল মেজাজেই তিনি বললেন, ‘ভাইয়া, এখান থেকে বাজারের ভাড়া তো ২০ টাকা। আপনি বড়জোর ২১ টাকা চাইতে পারেন। ৫০ টাকা দেওয়া তো কঠিন। ’

রিকশাওয়ালা মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, ‘কঠিন হইলে পয়দল যাতায়াত করেন। রিকশায় চড়তে চান কেন? কিপ্টা কুনহানকার!’

লিটন সাহেব অধিক শোকে পাথর হয়ে গেলেন। অগত্যা তর্ক না বাড়িয়ে রিকশাওয়ালার পরামর্শ অনুসারে হেঁটেই রওনা দিলেন। মনে মনে নিজের ওপরই রাগ ঝেড়ে বললেন, ‘কেন যে সহনশীল থাকার শপথ নিয়েছিলাম!’

বাজারে ঢুকে লিটন সাহেব চলে গেলেন মাছের দোকানে। অনেক দিন ধরেই তাঁর শখ রুই মাছের মাথা খাবেন। মাঝারি সাইজের একটা রুই দেখে মাছওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘দোকানদার, রুইটা কত?’

মাছওয়ালা একগাল হেসে বললেন, ‘এমনিতে দুই হাজার টাকা চাইতাম। আপনে নিলে বিশ টাকা কম। ’

মাছের দাম দুই হাজার শুনে লিটন সাহেব দমে গেলেন, ‘এত্তটুকু মাছ দুই হাজার টাকা চাও! এটা তো সাক্ষাৎ ডাকাতি। তা মাছ তাজা হবে তো?’

দোকানদার বললেন, ‘এমুন কথা বইলেন না, স্যার। মাছেও শরম পাইব। তাজা রাখার জন্য মাছের শরীরে ১০০ টাকার অরিজিনাল ফরমালিন মাখাইছি। আসল ফরমালিন কিনতে গিয়াই তো দামটা বাইড়া গেল। ’

ফরমালিনের কথা শুনে লিটন সাহেব যেন আকাশ থেকে পড়লেন। নিষিদ্ধ কেমিক্যাল দিয়ে মাছ তাজা রাখে, প্রকাশ্যে তার বর্ণনা দিতে দেখে তাঁর মেজাজ আবার খারাপ হয়ে গেল। তিনি হুংকার করে কী যেন বলতে গেলেন, ঠিক তখনই মনে পড়ে গেল সহনশীল থাকার কথা। অগত্যা চুপ করে মাছটা কিনে বাড়ির পথ ধরলেন।

বাড়ির প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছেন, এমন সময় তাঁর চোখ পড়ল রাস্তার দিকে। সেখানে এক সুন্দরী ললনা রাস্তা পার হচ্ছিলেন। কেন যেন তিনি সুন্দরীর ওপর থেকে চোখ সরাতে পারছিলেন না। সেদিকে তাকিয়ে পথ চলতে গিয়ে হঠাৎই ফুড়ুৎ করে ম্যানহোলে পড়ে গেলেন।

পাশের দোকানে চা খাচ্ছিলেন সদর আলী। লিটন সাহেবকে ম্যানহোলে পড়তে দেখে ‘পড়ছে রে পড়ছে’ বলে সেদিকে দৌড়ে গেলেন। তারপর কোনো রকমে তাকে সেখান থেকে টেনে তুললেন। যত্ন সহকারে শরীরে লেগে যাওয়া আবর্জনা মুছে দিলেন।

লিটন সাহেব অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছেন; কিন্তু উদ্ধার পাওয়ার পর ম্যানহোলের ঢাকনার প্রতি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উদাসীনতা নিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। কারণ সহনশীল থাকতে গেলে কারো বিরুদ্ধে বদনাম করা চলে না।

তিনি হাঁটুতে ব্যথা পেয়েছেন। হেঁটে যাওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব বলে একটা রিকশা ডেকে উঠে বসলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি পৌঁছে গেলেন বাসার সামনে। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া দেওয়ার জন্য পকেটে হাত দিয়ে তিনি চমকে উঠলেন। পকেটে একটা টাকাও নেই। বাজার করার পরও তার কাছে ভালো পরিমাণ টাকা ছিল। টাকাগুলো ম্যানহোলে পড়েছে মনে করে তিনি আবার রিকশায় চেপে সেখানে পৌঁছলেন। তারপর উঁকি দিয়ে খুঁজতে লাগলেন। লিটন সাহেবের উঁকিঝুঁকি দেওয়া দেখে পাশের চা দোকানের মালিক এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার কিছু খুঁজতাছেন?’

লিটন সাহেব বললেন, ‘পকেটে কিছু টাকা ছিল। সেটা পড়েছে কি না দেখছি। ’

দোকানদার বললেন, ‘খুঁইজা লাভ নাই, স্যার। যে লোক আপনাকে উদ্ধার করেছে, টাকাটা সে-ই নিয়া গেছে। ’

লিটন সাহেব অবাক, ‘বলেন কী?’

দোকানদার বললেন, ‘জি, স্যার। ওনার পেশাই এটা। সারা দিন ম্যানহোলের চারপাশে ঘুরঘুর করেন। দিনে দু-একজন গর্তে পড়েই। গর্তে পড়া লোকদের উদ্ধার করার সময় তিনি তাদের পকেট মেরে দেন। আপনার বেলায়ও সেটাই ঘটেছে স্যার। ’

লিটন সাহেব কী বলবেন বুঝে পেলেন না। মনে মনে ভাবলেন, ‘লোকটারে একবার হাতের কাছে পাইলে...আচ্ছা থাক। আজ কিছু বলব না। আজ আমি অনেক বেশি সহনশীল। ’


মন্তব্য