kalerkantho

বুড়োর প্রেম

কে এম আখলাক উর রহমান

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বুড়োর প্রেম

আমার মায়ের দাদা হঠাৎ করে বেড়াতে এলো। মায়ের দাদা বলে কথা! বয়স মাত্র ৮০-এর কাছাকাছি। তবে এখনো যথেষ্ট জোর আছে শরীরে। মুখে দাঁতের নামগন্ধ নেই। নকল দাঁত ব্যবহার করে। জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলে। তবে চেহারা সুন্দর। তার একটা ভালো অভ্যাস আছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে জগিং করে। ভাবা যায়! ৮০ বছরের বুড়ো, কিন্তু জগিংয়ে এক্সপার্ট।

একদিন ভোরে জগিং করার জন্য আমাকে সঙ্গে নিল। বেশ কিছুক্ষণ জগিং হলো। হঠাৎ দেখলাম, এক বুড়ি লাঠি নিয়ে ঠকঠক করতে করতে এগিয়ে আসছে। বুড়ো তাকে দেখে পুরো চেঞ্জ হয়ে গেল। বাঁকা কোমরটা সোজা করে দাঁড়াল। পকেট থেকে ৫০ টাকা বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘হোটেল থেকে নাশতা করে আয়।’

আমার মনে সন্দেহ জাগল। নাশতা করতে না গিয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে বুড়োর কাণ্ড দেখার মতলব আঁটলাম। বুড়ি কাছে আসতেই বুড়ো রোমান্টিক স্টাইলে কবিতা আবৃত্তি করতে লাগল—

৮০ বছর করেছি অপেক্ষা আমি,

তুমি আসবে বলে ওগো সুন্দরী...

বলবে কি গো কিছু আমায়?

বাসব ভালো তোমায় আমি সারা জীবন ভরি।

কবিতা শুনে আমি অজ্ঞান হতে হতে সামলে নিলাম। শালার বুড়ো কয় কী? মরার মতো অবস্থা, এখনো নাকি সারা জীবন ভালো বাসবে! বুড়ো বয়সে প্রেম জেগেছে!

হঠাৎ ‘ঠাস’ করে একটা শব্দ হলো। বুড়ি চলে যাচ্ছে। আমি আড়াল থেকে এক লাফে কাছে আসতেই দেখলাম, বুড়ো তার নকল দাঁতের পাটিটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট। বুড়োর পরিণতি দেখে হাসি এলেও, ওই পরিবেশে হাসার সাহস পেলাম না। তবে বুড়ো হয়তো আমার পরিস্থিতি বুঝতে পারল। ধমক দিয়ে বলল, ‘হাসার কিছু নেই। যেখানে ফুল সেখানে কাঁটা, যেখানে চাঁদ সেখানে কলঙ্ক, যেখানে প্রেম সেখানে ছেঁকা। এরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চড় খাওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে মনে রাখিস, বেলের শক্ত খোলসের মধ্যেই কিন্তু থাকে সুমিষ্ট খাদ্যোপাদান।’

কথাটা শুনে আবার হাসি পেল, কিন্তু চেপে গেলাম। তবে একটা ব্যাপার স্বীকার করতেই হবে, বুড়ির হাতে জোর আছে বৈকি! নাহলে এক চড়ে দাঁত খসিয়ে দিতে পারত না। হোক নকল দাঁত, খসেছে তো।

বুড়ো এক হাতে দাঁত আর অন্য হাতে গাল ধরে বাড়ি ফিরল। দরজা দিয়ে ঢোকার সময় দারোয়ানকে দেখেই দাঁতগুলো মুখের ভেতরে চালান করে দিয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটার চেষ্টা করল।

রাতে আমি আর বুড়ো টিভি দেখছি। একটা হিন্দি সিনেমা চলছে। সিনেমায় একপর্যায়ে হিরোইন ভিলেনের গালে কষে চড় দিল। বুড়োর দিকে আমি একনজর তাকালাম। দেখলাম, সে-ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে চোখ পড়তেই বুড়ো চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী সব আজেবাজে মুভি দেখিস! চ্যানেল পাল্টা।’

আমি মাইন্ড করলাম না। বুঝলাম, সকালের জমানো কষ্ট এখন জেগে উঠেছে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই বুড়ো পুরো পরিবেশটা বদলে দিল। প্রতিবাদী কণ্ঠে বলে উঠল, ‘একবারে না পারিলে দেখো শতবার। আমি আবার ওই বিদুষীর কাছে প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে যাব।’

আমিও বুড়োকে সাপোর্ট দিলাম, ‘ঠিক বলেছ। কাল ভোরে আমরা আবার যাব। তবে এবার নকল দাঁতের পাটিটা বাসায় রেখে যেয়ো কিন্তু।’

বুড়ো মুখ গম্ভীর করে বলল, ‘ইয়ার্কি হচ্ছে? প্রেম-ভালোবাসা ইয়ার্কির জিনিস না। ভয়কে দূর কর। তোরা যদি প্রেমে ভয় পাস, তবে চলবে কিভাবে?’

পরের দিন ভোরে আমি আর বুড়ো আবার জগিংয়ে বের হলাম। সময়মতো আজকেও লাঠি নিয়ে ঠকঠক করতে করতে বুড়ি এগিয়ে এলো। আমি বুড়োকে সুযোগ দিতে আবার আড়ালে চলে গেলাম। বুড়িটা বুড়োকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল; কিন্তু বুড়ো তা হতে দিল না। খপ করে হাত ধরে ফেলল। অমনি বুড়ি চেঁচিয়ে উঠল, ‘কে কোথায় আছিস, বাঁচা রে। ইভ টিজিং করছে।’

বুড়ির চেঁচানো শুনে গ্রাম পুলিশের হাবিলদার ছুটে এলো, ‘কী হয়েছে, দাদি?’

বুড়ি বলল, ‘দেখ না, শালার বুড়ো প্রতিদিন আমাকে ইভ টিজিং করে।’

শুনে গ্রাম পুলিশের হাবিলদার হি হি হেসে দিল। আমিও আড়াল থেকে বেরিয়ে হাসিতে যোগ দিলাম।


মন্তব্য