kalerkantho


দেশেই তৈরি হচ্ছে বাজাজ মোটরসাইকেল

মার্চ থেকেই পাঁচটি মডেলের উৎপাদন শুরু ম দাম আরো কমবে

মাসুদ রুমী   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দেশেই তৈরি হচ্ছে বাজাজ মোটরসাইকেল

বাজেটে শুল্ক সুবিধা দেওয়ায় বিদেশি ব্র্যান্ডগুলো স্থানীয়ভাবে মোটরসাইকেল কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। দেশে চীন, তাইওয়ান, জাপান ও ইউরোপের কয়েকটি কম্পানির মোটরসাইকেল বিক্রি হলেও ভারতের ব্র্যান্ডগুলোর দখলে রয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ বাজার। এর মধ্যে শুধু বাজাজের দখলে রয়েছে ৫০ শতাংশের বেশি মার্কেট শেয়ার। দেশের বাজারে নেতৃত্বদানকারী এই ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল মার্চ মাস থেকে দেশে উৎপাদন করবে বাজাজ মোটরসাইকেলের একমাত্র পরিবেশক উত্তরা মোটরস লিমিটেড। সাভারের জিরানী বাজারে স্থাপিত কারখানায় প্রাথমিকভাবে পাঁচটি মডেলের মোটরসাইকেল উৎপাদন হবে বলে জানালেন উত্তরা মোটরসের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউর রহমান। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশের অটোমোবাইলশিল্পের সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন এই উদ্যোক্তা।

উত্তরা মোটরসের হাত ধরে বাংলাদেশে বাজাজ মোটরসাইকেলের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮০ সালে। প্রায় চার যুগ ধরে উত্তরা মোটরস বাজাজ মোটরসাইকেল আমদানি, সংযোজন ও নিজস্ব ১৫টি শাখা অফিস ও ২৫০টি থ্রি এস ডিলারের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে বিপণন করে আসছে। দেশের জনপ্রিয় এবং সর্বাধিক বিক্রীত এই মোটরসাইকেল উত্তরা মোটরস ১৫ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে জানিয়ে মতিউর রহমান বলেন, ‘বাজাজের এ দেশে জনপ্রিয়তা রাতারাতি তৈরি হয়নি। পণ্যের মান এবং ব্র্যান্ড ইমেজ বাজাজকে এত দূর নিয়ে এসেছে।’

দেশের বাজারে অবস্থান আরো সুদৃঢ় এবং গ্রাহকদের প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য দিতে দেশে বাজাজ মোটরসাইকেল উৎপাদন করা হচ্ছে জানিয়ে মতিউর রহমান বলেন, ‘আমাদের ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্টের নামকরণ হয়েছে ট্রান্সএশিয়া ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। সাভারের জিরানী বাজারে আমাদের প্লান্টে মেশিনারি স্থাপনের কাজ চলছে। আশা করছি মার্চের শেষে আমরা ট্রায়াল প্রডাকশনে যাব। এরপর আমরা বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাব। শুরুতে আমরা দেশে বাজাজের পাঁচটি মডেলের মোটরাইকেল উৎপাদন করব। এর মধ্যে রয়েছে প্লাটিনার দুটি মডেল, ডিসকভারের দুটি মডেল এবং পালসারের একটি মডেল। পরবর্তী ধাপে আমরা আরো তিনটি মডেলের মোটরাসাইকেল উৎপাদনে যাব।’

তিনি বলেন, ‘মোটরসাইকেল কারখানায় ৪৫০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাদের প্রায় সবাই দেশীয় কর্মী।’

চলতি বাজেটে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ক্ষেত্রে কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ এবং ফিনিশড প্রডাক্টের ওপর আছে ১০ শতাংশ শুল্ক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সিকেডির (বিযুক্ত অবস্থায়) ক্ষেত্রে ৮৯ শতাংশ। এ কারণে দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদন করাই ভায়াবল বলে মনে করেন উত্তরা গ্রুপের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান। তিনি জানান, এ কারণে প্রায় সব বিদেশি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল দেশে উৎপাদনের জন্য সব রকম প্রস্তুতি নিচ্ছে। হিরো, হোন্ডা, টিভিএস, ইয়াহামার মতো বড় কম্পানিগুলো বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের কাজ করছে। দুই বছরের মধ্যে তারা সবাই উৎপাদনে চলে আসবে।

দেশের মোটরসাইকেলের চাহিদা সম্পর্কে উত্তরা মোটরসের চেয়ারম্যান বলেন, ‘চলতি বাজেটে শুল্ক কমানোয় এ বছর প্রায় ৭০ হাজারের মতো মোটরসাইকেল বিক্রি বেশি হয়েছে। ২০১৬ সালে সব মিলিয়ে দেশে তিন লাখ এক হাজার ৮২৩টি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। এর আগের বছর তা ছিল দুই লাখ ৪০ হাজার। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই বিক্রি হয়ে গেছে এক লাখ ৬৪ হাজার গাড়ি। অর্থবছর শেষে বিক্রির পরিমাণ সাড়ে তিন লাখে দাঁড়াবে। জুন পর্যন্ত আমরা দুই লাখ মোটরসাইকেল বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি। উৎপাদনে গেলে দুই লাখ ৪০ হাজারের মতো বিক্রি করতে হবে।’

বাজেটে আমদানি শুল্ক কমায় বাজাজ মোটরসাইকেলের দাম ১৬-১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মতিউর রহমান বলেন, ‘আমাদের পালসার বাইকের দাম ছিল দুই লাখ পাঁচ হাজার, সেটা এখন কমিয়ে করা হয়েছে এক লাখ ৭২ হাজার। সেই হিসাবে ৩৩ হাজার টাকা দাম কমেছে। আমরা উৎপাদনে গেলে দাম আরো কমবে। দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদন করে বিক্রির ভলিউম বাড়াতে না পারলে টিকে থাকা কঠিন হবে।’

অতিরিক্ত শুল্কের কারণে মোটরসাইকেলের বাজার সেভাবে বাড়েনি বলে জানালেন উত্তরা মোটরসের চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, চলতি বাজেটে মোটরসাইকেল আমদানি শুল্ক ৪৫ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে রাজস্বের পরিমাণ বেড়েছে। কারণ পুরো ভলিউমের ওপর অন্যান্য ডিউটি আরোপ আছে। আমরা পুরো ভলিউমের ওপর ৮৯ শতাংশ কর দিচ্ছি। এটি আগে ছিল ১৩০ শতাংশ।’ মোটরসাইকেলশিল্পের শুল্ক কাঠামো অন্যান্য সিকেডি সংযোজন থেকে এখনো বেশি বলে জানালেন উত্তরা গ্রুপের কর্ণধান। তিনি বলেন, ‘ট্রাক, বাসে ডিউটি মাত্র ১০ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, চেসিসে কোনো ট্যাক্স নেই। কিন্তু মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ৮৯ শতাংশ, যা এখনো অনেক বেশি। মোটরসাইকেলশিল্পের জন্য এ রকম নীতির বৈষম্য আছে, যেগুলো সহজ এবং আরো উদার করতে হবে। তাহলে এই শিল্প আরো বড় হবে।’

একটি মোটরসাইকেল তৈরি করতে ইঞ্জিন থেকে শুরু করে চেসিস এবং আনুষঙ্গিক বিভিন্ন ধরনের পার্টস টায়ার-টিউব, ব্যাটারি ইত্যাদির মতো ছোট-বড় কয়েক হাজার উপাদানের প্রয়োজন পড়ে। এগুলো তৈরি করতে ভেন্ডর বা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। এককভাবে মোটরসাইকেল তৈরি করতে হলে ভেন্ডর বা সহযোগী শিল্পকে আগে উন্নত করতে হবে জানিয়ে মতিউর রহমান বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে ভিয়েতনাম ও ভারতের দুটি কারখানা পরিদর্শন করেছি। শিল্প মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্যদের আমরা বোঝানোর চেষ্টা করেছি, মোটরসাইকেলশিল্পের প্রাণ হলো ভেন্ডর। এই সহায়ক শিল্প গড়ে না উঠলে মোটরসাইকেলশিল্পের সুষম বিকাশ হবে না। এ জন্য ভেন্ডরদের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাটমুক্ত আকর্ষণীয় শুল্ক কাঠামো প্রণয়ন করা হবে বলে আমরা আশা করি। তাদের কাছ থেকে প্রতিযোগিতামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে মোটরসাইকেলের সরঞ্জাম কিনতে পারলে আমরাও কম দামে গ্রাহককে মোটরসাইকেল তুলে দিতে পারব। ইতিমধ্যে ভারত, থাইল্যান্ড থেকে বেশ কয়েকটি ভেন্ডর কম্পানি বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। আমি আশা করি, বছরখানেকের মধ্যে বেশ কিছু ভেন্ডর বাংলাদেশে এসে যাবে।’

মোটরসাইকেলশিল্পের নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। ভেন্ডর উন্নয়নের বিষয়গুলো মোটরসাইকেলশিল্প নীতিমালায় থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন মতিউর রহমান। তিনি বলেন, দেশে মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য ফি অনেক বেশি। বাজার সম্প্রসারণে এটা আরো কমাতে হবে।

বাংলাদেশে মোটরসাইকেলশিল্পের ভবিষ্যৎ অনেক ভালো বলে মনে করেন এই শিল্প উদ্যোক্তা। তাঁর মতে, ‘দেশে শিল্পায়নের বড় ক্ষেত্র হবে মোটরসাইকেল। একে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার ছোট-বড় উপকরণ নির্মার্তা শিল্পের আবির্ভাব ঘটবে বলে আমার বিশ্বাস। আগামী পাঁচ বছরে শিল্প খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।’

মোটরসাইকেলের পাশাপাশি দেশে গাড়ি উৎপাদন করতে চায় উত্তরা মোটরস; কিন্তু এখানে শুল্কের ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। ফলে দেশে উদ্যোক্তারা সাহস করে এই শিল্পে আসতে পারছে না বলে জানালেন মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘দেশে এখন বছরে ৩৫ হাজার গাড়ি আমদানি হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগই হলো রিকন্ডিশন্ড। স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে কোনো নীতি সুবিধা নেই। অটোমোবাইলশিল্পের বিকাশ ঘটাতে হলে এখানে নীতির ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। ট্রাক-বাস অ্যাসেম্বলিংয়ের ক্ষেত্রে যে শুল্ক কাঠামো আছে সেটা দেওয়া হলে আমি সবার আগে গাড়ি উৎপাদন শুরু করব মারুতি সুজুকি দিয়ে।’

‘ঢাকার বাইরে এখন মানুষের যাতায়াতের প্রধান বাহন হয়ে উঠছে মোটরসাইকেল। গ্রামেগঞ্জে সবার ঘরে ঘরে আমরা যদি একটি করে মোটরসাইকেল দিতে পারি তাহলে আগামী পাঁচ বছরে এর ভলিউমটা অনেক বড় হবে। আমরা যদি সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা পায় তাহলে মোটরসাইকেলশিল্প বাংলাদেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।’—যোগ করলেন উত্তরা গ্রুপের শীর্ষ কর্তা।

উদ্যোক্তা হিসেবে সাফল্যের মূলমন্ত্র কী—জানতে চাইলে মতিউর রহমান বলেন, ‘সততা, স্বচ্ছতা এবং পরিশ্রম। এই তিনটি যদি কেউ ঠিকমতো করে, তাকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। আমার জীবনে তার ফল পেয়েছি। এখনো ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করি। এমনকি ছুটির দিনেও কাজ করি। এটাই এখন রুটিন হয়ে গেছে।’

আফসোস করে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘আরো সফল হতে পারতাম, দেশে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের পরিবেশ যদি আরো ভালো হতো। গার্মেন্ট ছাড়া স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের নীতি খুব সহায়ক অবস্থায় নেই। তার মধ্যে আমরা সংকট মোকাবেলা করে এগিয়ে যাচ্ছি।’


মন্তব্য