kalerkantho


মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে আকিজ গ্রুপ

আবুল কাশেম   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে আকিজ গ্রুপ

বাংলাদেশ থেকে দুই কোটি ডলার মালয়েশিয়ায় নিয়ে বিনিয়োগ করার সুযোগ পেতে যাচ্ছে আকিজ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আকিজ জুট মিলস লিমিটেড। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৬০ কোটি টাকা।

১৩টি শর্ত জুড়ে দিয়ে আকিজ গ্রুপকে এই পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে নিয়ে মালয়েশিয়ায় আকিজ রিসোর্সেস নামের একটি সাবসিডিয়ারি কম্পানি গঠন করার অনুমোদন দিতে যাচ্ছে সরকার। আকিজ গ্রুপের এই কম্পানিটি মালয়েশিয়ার রবিন রিসোর্সেস ও রবিনা ফ্লোরিং নামের দুটি কম্পানি অধিগ্রহণ করে ব্যবসা পরিচালনা করবে।

আকিজ গ্রুপের বিস্তারিত ব্যবসায়িক পরিচালনা যাচাই-বাছাই করে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগও তাতে সম্মতি জানিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উত্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ১৩টি শর্তে আকিজ জুট মিলকে মালয়েশিয়ায় দুই কোটি ডলার বিনিয়োগে সম্মতি দেওয়ার পক্ষে মত দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, বিষয়টি অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উত্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেখানেই আকিজ গ্রুপের বিনিয়োগের অনুমোদন দেওয়া নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

আকিজ গ্রুপের পাশাপাশি হা-মীম গ্রুপ হাইতিতে একটি গার্মেন্ট কারখানা স্থাপনের জন্য এক কোটি চার লাখ ডলার এবং নিটোল-নিলয় গ্রুপ আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়াতে গাম্বিয়া কমার্স অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল ব্যাংক নামের একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য ৭০ লাখ ডলার বিনিয়োগের অনুমতির জন্য আবেদন করে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আবেদনগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্তের জন্য এর আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে গঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠায়।

ওই কমিটি তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিস্তারিত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা জানতে চায়। আকিজ গ্রুপ পরিকল্পনা জমা দেওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ১৩টি শর্তে তা অনুমোদনের পক্ষে মত দিয়েছে। এখন তা আবারও অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উত্থাপন করা হবে। সেখানেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

আকিজ গ্রুপের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, মালয়েশিয়ায় অর্থ নিয়ে যে সাবসিডিয়ারি কম্পানি গঠন করা হবে, তার ওপর আকিজ গ্রুপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ওই সাবসিডিয়ারির কার্যক্রম বাংলাদেশের রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করবে না। আকিজ গ্রুপ যে কম্পানিটি কিনতে যাচ্ছে, তা বর্তমানে লাভজনক অবস্থায় চালু রয়েছে। আকিজ গ্রুপ আগামী বছরগুলোতে যে পরিমাণ কর-পরবর্তী মুনাফা অর্জনের প্রাক্কলন করেছে, লাভের পুরোটা বাংলাদেশে প্রত্যাবাসন করা হলে দুই কোটি ডলার আগামী তিন বছরেই দেশে ফেরত আসবে।

তবে কম্পানিটি বর্তমানে লাভজনক হলেও অধিগ্রহণের পর ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের ফলে আকিজ গ্রুপ বিদেশের পরিবেশে সফলভাবে কম্পানিটি পরিচালনা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আকিজ গ্রুপের বিনিয়োগ প্রস্তাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আকিজ জুট মিলস রবিন রিসোর্সেস অধিগ্রহণ করে মালয়েশিয়াতে ফাইবার বোর্ড ও কাঠের পণ্য উৎপাদন করে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করবে। যেহেতু এ পণ্যটি বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয় না, তাই এতে বাংলাদেশের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

প্রস্তাবিত বিনিয়োগ হতে আগামী ১০ বছরে আট কোটি ৩০ লাখ ডলার মুনাফা অর্জন সম্ভব হবে বলে আকিজ গ্রুপ জানিয়েছে। এর মধ্য থেকে ১০ বছরে দুই কোটি ৯৯ লাখ ডলার দেশে ফেরত আনা হবে বলে আকিজ গ্রুপ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ার কম্পানিটিতে ৪৭২ জন মালয়েশিয়ার কর্মী রয়েছে। আকিজ গ্রুপ জানিয়েছে, কম্পানিটি তারা অধিগ্রহণ করার পর মালয়েশিয়ায় থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়োগের পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, রাতারাতি বিদ্যমান মানবসম্পদ পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না। তাই আপাতত কম্পানিটিতে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা কম।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তাব পর্যালোচনা করে বলেছে, আকিজ জুট মিলস তার এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটা হিসাব থেকে অর্থ প্রেরণ করবে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে না। কারণ, গ্রাহকের বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবের স্থিতি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অন্তর্ভুক্ত থাকে না। তা ছাড়া যে কম্পানিটিতে বিনিয়োগ করা হবে, তার মুনাফার বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বা উন্নতি হলে এবং মুনাফা নিয়মিতভাবে লভ্যাংশ আকারে দেশে প্রত্যাবাসন করা হলে ভবিষ্যতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

যে ১৩ শর্তে আকিজ গ্রুপকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে যে অর্থ বাংলাদেশ থেকে নেওয়া হবে তা প্রস্তাবিত কম্পানির ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবসা শুরু করা সম্ভব না হলে ওই অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনতে হবে। কম্পানিটি যে পরিমাণ মুনাফা করবে, তার শতভাগ লভ্যাংশ হিসেবে বাংলাদেশে ফেরত আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি ব্যতীত ব্যাংকটির শেয়ার, আয় বা লভ্যাংশ হস্তান্তর করা বা সম্পদ বিক্রি করা যাবে না। কম্পানিটিতে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। মানি লন্ডারিংয়ের ক্ষেত্রে কম্পানি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করবে।


মন্তব্য