kalerkantho


সেশনভিত্তিক ইউএসএসডি চার্জের প্রস্তাব বিটিআরসির

মোবাইল ব্যাংকিং খরচ বাড়তে পারে

গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ করে মূল্য নির্ধারণের আহ্বান খাতসংশ্লিষ্টদের

শেখ শাফায়াত হোসেন   

২২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



মোবাইল ব্যাংকিং খরচ বাড়তে পারে

মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও ফোন অপারেটরদের রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের পরিবর্তে আন-স্ট্রাকচারড সাপ্লিমেন্টারি সার্ভিস ডাটার (ইউএসএসডি) সেশনভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে বিটিআরসি। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ৯০ সেকেন্ডের প্রতি সেশন ৮৫ পয়সা করে মোবাইল ফোন অপারেটরদের দিতে হবে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

সম্প্রতি বিটিআরসির পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। প্রস্তাবিত এ মূল্য এমএফএসের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তাবিত মূল্যের (২০ পয়সা) চার গুণেরও বেশি। এ প্রস্তাব অনুমোদিত হলে এমএফএস সেবার মূল্য কয়েকগুণ বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছে এমএফএস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে এ সেবার গ্রাহকদের ওপর। এতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে সেবা প্রদানের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনার চলমান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গ্রাহক যখন মোবাইল ব্যাংকিং সেবার কোনো একটি সেবা গ্রহণ করে তখন ইউএসএসডির মাধ্যমে মোবাইল ফোন গ্রাহক ও অপারেটরের মধ্যে সংক্ষিপ্ত যোগাযোগের (কিলোবাইট সাইজের) সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমান সময়ের থ্রিজি বা ফোরজি নেটওয়ার্কে মেগাবাইট সাইজের টেক্সট, অডিও, ভিডিও ফাইল পাঠানোসহ অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রে বস্তুত কোনো প্রভাব ফেলে না।

মূলত এ কারণেই বর্তমানে অনেক সেবা বিনা মূল্যে দিচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব সেবার মধ্যে রয়েছে ক্যাশ ইন, কেনাকাটার পেমেন্ট, মোবাইল এয়ারটাইম রিচার্জ, রেমিট্যান্স গ্রহণ, ব্যালান্স চেক করা প্রভৃতি।

এ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে সেবার ধরন অনুযায়ী আলাদা আলাদা সার্ভিস চার্জ নির্ধারিত রয়েছে। ইউএসএসডির ট্যারিফ বা মূল্য সেশনভিত্তিক হলে এই বহুল ব্যবহৃত সেবাগুলো আর বিনা মূল্যে পাওয়া যাবে না। ছোট বড় সব সেবার জন্যই একই সার্ভিস চার্জ দিতে হবে। এতে গ্রাহকদের জন্য এত দিন দিয়ে আসা সুবিধা কমিয়ে দিতে হবে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষ করে কেনিয়া এবং ভারতের মতো দেশগুলোতে মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বেগবান করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউএসএসডি-মূল্য কমাতে মোবাইল অপারেটরদের বাধ্য করছে সেখানে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন অপারেটররা এ খাত থেকে আরো বেশি আয় করতে কৌশল নিয়েছে। অথচ মোবাইল অপারেটররা কলচার্জ, ইন্টারনেট ব্যবহারের ডাটা চার্জ ক্রমেই কমাচ্ছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিটিআরসি এবং আমরা যৌথভাবেই ইউএসএসডি চার্জ নির্ধারণের বিষয়ে কাজ করছি। বিটিআরসি আমাদের কাছে মতামত চেয়েছিল। আমরা বলেছিলাম, রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের মধ্যে থাকতে পারলেই ভালো। যদি সেটা সম্ভব না হয় তাহলে সেশনভিত্তিক চার্জ যত কম রাখা যায় ততই ভালো। তবে বিটিআরসি যে প্রস্তাব করেছে সে বিষয়ে আমরা এখনো কিছু জানি না। ’

মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশনস শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, ‘আমরা আশা করব ইউএসএসডি মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্বল্প আয়ের মানুষের স্বার্থকেও গুরুত্ব দেবে। যাতে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে এবং সরকারের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। ’

জানা গেছে, বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আয়ের ৭ শতাংশ মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে ভাগাভাগি (রেভিনিউ শেয়ারিং) করে তাদের ইউএসএসডি চ্যানেল ব্যবহার করে মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানের জন্য। এ ছাড়া আয়ের ৭৬ থেকে ৮০ শতাংশই পায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী এজেন্ট ও পরিবেশকরা। মূলত এরাই এই সেবাটিকে গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানটি পায় মাত্র ১৩ থেকে ১৬ শতাংশ।

মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, প্রতিবছরই রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের মাধ্যমেই ইউএসএসডি ব্যবহার বাবদ বিশাল অঙ্কের টাকা মোবাইল অপারেটরদের দিতে হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এর পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এমএফএস প্রতিষ্ঠান বিকাশ ২০১৬ সালে ইউএসএসডি চার্জ বাবদ মোবাইল অপারেটরদের ৯৪ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। ২০১৫, ২০১৪ ও ২০১৩ সালে এর পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৬৭ কোটি, ৪৬ কোটি এবং ২৬ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী গত আগস্ট পর্যন্ত দেশে ১৭টি মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত গ্রাহকসংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৭০ লাখ। এর মধ্যে সক্রিয় হিসাবসংখ্যা ছিল ৩ কোটি ৭ লাখ। প্রতিদিন গড় লেনদেন ছিল ১ হাজার ৩৮ কোটি টাকা।

বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম নির্ভর ই-কমার্সসহ নানা ধরনের ব্যবসা বেড়েছে। অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পন্ন করছে। অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান তাদের সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ থেকে শুরু করে কর্মীদের বেতন-ভাতাও দিচ্ছে।


মন্তব্য