kalerkantho


জিডিপি প্রবৃদ্ধি রেকর্ড ৭.২৮ শতাংশ

মাথাপিছু জাতীয় আয় ১৬১০ ডলার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



জিডিপি প্রবৃদ্ধি রেকর্ড ৭.২৮ শতাংশ

মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে প্রথমবারের মতো সরকারের দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত হিসাব বলছে, গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৭.২৮ শতাংশ।

যা দেশের ইতিহাসে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন। সরকার ওই অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ৭.২ শতাংশ। সে হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ০.৮ শতাংশ বেশি অর্জিত হয়েছে। এর আগে বিএনপি সরকারের আমলে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ৭.০৬ শতাংশ। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলানগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে সাংবাদিকদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্য জানান পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, দেশের মানুষের মাথাপিছু জাতীয় আয় এখন এক হাজার ৬১০ ডলার।

বিবিএসের তথ্য তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘গত অর্থবছর প্রথম ১০ মাসের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আমরা বলেছিলাম জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৭.২৪ শতাংশ। ওটা ছিল সাময়িক হিসাব। কিন্তু পুরো বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ০.০৪ শতাংশ বেশি অর্জিত হয়েছে।

চূড়ান্ত হিসাবে দেখা গেছে, প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭.২৮ শতাংশ। ’

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, গত অর্থবছর চূড়ান্ত হিসাবে বাংলাদেশের মোট জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৯৮৬ কোটি ডলার বা ২০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। জিডিপির আকার ১০০ বিলিয়ন ডলার (১০ হাজার কোটি ডলার) ছুঁতে বাংলাদেশের ৩৪ বছর লেগেছে। বাকিটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের অবদান। বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে ইথিওপিয়া ও কম্বোডিয়া ৭ শতাংশের বেশি জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান পরিকল্পনামন্ত্রী।

তবে সরকারের এই তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কিভাবে এলো? কোন প্রক্রিয়ায়? ওই বছর দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ভালো ছিল না। আমদানি প্রবৃদ্ধিও ছিল নিম্নগামী। কাঁচামাল আমদানি হয়নি আশানুরূপ। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ছিল নিম্নগামী। ব্যক্তি খাতের ঋণপ্রবাহ ছিল হতাশাজনক। এত নেতিবাচক অবস্থার মধ্যে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হলো কিভাবে? তথ্যের যেসব অসংগতি দেখা যাচ্ছে তাতে এর সন্তোষজনক কোনো জবাব পাওয়া যাচ্ছে না। ’

এদিকে জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে বেড়েছে মাথাপিছু জাতীয় আয়ও। বাংলাদেশে চলতি মূল্যে মাথাপিছু জাতীয় আয় এক হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে মাথাপিছু জাতীয় আয়ের পরিমাণ ছিল এক হাজার ৬০২ ডলার। প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে চূড়ান্ত হিসাবে মাথাপিছু আয় বেড়েছে আট ডলার। আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল এক হাজার ৪৬৫ ডলার। এ হিসাবে বছরের ব্যবধানে জাতীয় আয় বেড়েছে মাথাপিছু ১৪৫ ডলার। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার টাকা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে একনেক বৈঠকে পরিকল্পনামন্ত্রী জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু জাতীয় আয়ের প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। সব পর্যায়ের মানুষের কর্মতত্পরতার কারণে এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ’

বিবিএসের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় এক দশক ধরে দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বৃত্তে আটকে ছিল। প্রথমবারের মতো ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রবদ্ধি ৬ শতাংশের বৃত্ত ভেঙে ৭ শতাংশ অর্জিত হয়। ওই বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় ৭.১১ শতাংশ। আর গত অর্থবছর তা বেড়ে অর্জিত হলো ৭.২৮ শতাংশ।

এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, কৃষি খাতে ২.৯০ শতাংশ, শিল্প খাতে ১০.২২ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৬.৬৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য থাকলেও এখন যে গতিতে রয়েছে তাতে ২০১৯ সালের মধ্যে লক্ষ্যে পৌঁছনো যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিনিয়োগের বড় একটি অংশ আসছে সরকারি তহবিল থেকে। সরকারি বিনিয়োগে সড়ক, রেলসহ পরিবহন অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন হচ্ছে। বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতেও বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এসব বিনিয়োগের সুফল আসলে প্রবৃদ্ধি আরো বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগের পরিমাণ কমে এলেও জিডিপির হিসাবে গত অর্থবছরে তা সামান্য বেড়েছে। গত বছর প্রথমবারের মতো জিডিপির অনুুপাতে বিনিয়োগ ৩০ শতাংশের ঘর ছাড়িয়েছে। জিডিপির ৩০.২৭ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে বলে প্রাথমিক হিসাবে জানিয়েছিল বিবিএস। চূড়ান্ত হিসাব বলছে, এর হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০.৫১ শতাংশ।

বিবিএস বলছে, গত অর্থবছরে কৃষি ও শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির সাময়িক যে হিসাব করা হয়েছিল, চূড়ান্ত হিসাবে তা কিছুটা কমেছে। কৃষি খাতে ৩.৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছিল প্রাথমিক হিসাবে। আগাম বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে বোরো ধানের ক্ষতি হওয়ায় চূড়ান্ত হিসাবে কৃষির প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ২.৯৭ শতাংশে। শিল্প খাতে ১০.৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধারণা দেওয়া হয়েছিল। চূড়ান্ত হিসাবে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ১০.২২ শতাংশে। অন্যদিকে সেবা খাতে প্রাথমিক হিসাবে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধারণা দেওয়া হলেও চূড়ান্ত হিসাবে তা ৬.৬৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কৃষি ও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি কমলেও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে।

মাথাপিছু জাতীয় আয় ১৬১০ ডলার : গত অর্থবছরে মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়ে এক হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ এক লাখ ২৮ হাজার ১৬০ টাকা। অর্থাৎ একজন মানুষ বছরে এই টাকা আয় করে। সে হিসাবে মাসে মাথাপিছু আয় হয় প্রায় ১১ হাজার টাকার মতো। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে  মাথাপিছু আয় ছিল এক হাজার ৩১৬ ডলার।


মন্তব্য