kalerkantho


বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে উল্লম্ফন

শেখ শাফায়াত হোসেন   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে উল্লম্ফন

বেসরকারি খাতে ২০১৭ সালের নভেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯.০৬ শতাংশ। পাঁচ বছর দুই মাস পর (৬২ মাস) বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে এমন উল্লম্ফন দেখা গেল। সর্বশেষ ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯.৮৮ শতাংশ। মূলত ওই সময় থেকেই বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়।

মূলত গত বছরের আগস্ট থেকে বেসরকারি খাতের ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির উল্লম্ফন দৃশ্যমান হতে থাকে। ওই মাসে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১৭.৮৪ শতাংশে। বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হারের দিক দিয়ে এটি ছিল ৫৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। এর আগে ২০১২ সালের অক্টোবরে বেসরকারি খাতের ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮.৩৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, গত নভেম্বরে বেসরকারি খাতে দেশে কার্যরত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল আট লাখ ২৬ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা। গত জুনে এ খাতে বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ছিল সাত লাখ ৭৬ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে পাঁচ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের স্থিতি বেড়েছে ৫০ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা।

অর্থবছরের হিসেবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.৫৬ শতাংশ। অথচ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৫১ শতাংশ।

বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির উল্লম্ফন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সম্প্রতি ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, বেসরকারি খাতে এভাবে ঋণ বাড়তে থাকলে সামনে ব্যাংকগুলোকে তারল্য সংকটে পড়তে হতে পারে। এ কারণে ঠিক কী কারণে ঋণ বাড়ছে, ঋণগুলো যথাযথ জায়গায় যাচ্ছে কি না, সেটা দেখার দরকার রয়েছে।

গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভার আলোচনায়ও গুরুত্ব পায় বিষয়টি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রচলিত ব্যাংকগুলো সংগৃহীত আমানতের সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ এবং ইসলামী ব্যাংকগুলো সংগৃহীত আমানতের সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করতে পারে। কোনো কোনো ব্যাংক এই হারের চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে বলে সভায় জানানো হয়। ফলে ঋণের প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি হচ্ছে বলে জানান সভায় উপস্থিত ব্যাংক নির্বাহীরা। সভায় এই আগ্রাসী ঋণ বিতরণ বন্ধের নির্দেশ দেন গভর্নর ফজলে কবির।

সভা শেষে ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, অর্থনৈতিক উন্নতির স্বার্থে ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি হতেই পারে। কিন্তু বর্তমানে ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এতে তারল্য সংকট হতে পারে। এ কারণে ঋণ-আমানতের অনুপাত (এডিআর) কমানোর চিন্তা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’ আগামী মুদ্রানীতি ঘোষণায় এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

প্রতি তিন মাস পর পর ওই ব্যাংকার্স সভা অনুষ্ঠিত হয়। গভর্নরের সভাপতিত্বে ব্যাংকার্স সভায় সব ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ, আমদানি-রপ্তানি, ডলারের বিনিময় মূল্য, রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ কমানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর তরল সম্পদের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৬১ হাজার ২৫ কোটি টাকা, যা গত জুন শেষে ছিল দুই লাখ ৬৭ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর তরল সম্পদ কমেছে ছয় হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর জন্য সংরক্ষিতব্য ন্যূনতম তরল সম্পদের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৬৮ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ৯২ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা।


মন্তব্য