kalerkantho


এলডিসি থেকে উত্তরণে প্রস্তুতি শুরু

১০ সদস্যের জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন

আবুল কাশেম   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এলডিসি থেকে উত্তরণে প্রস্তুতি শুরু

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে ঝুঁকি মোকাবেলার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে সরকার। জাতিসংঘ আগামী মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণে প্রথম সুপারিশ করবে। এতে বিশ্ববাণিজ্য ও নমনীয় হারে পাওয়া ঋণ সহায়তা কমে গিয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতা বেড়ে যাবে বাংলাদেশের। ওই পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি) আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের ‘জাতীয় টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া, এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সমস্যা ও সম্ভাবনার বিস্তারিত তথ্য চেয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়েছেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব কাজী শফিকুল আযম।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, কোনো স্বল্পোন্নত দেশকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে হলে জাতীয় মাথাপিছু আয় ১২৩০ ডলার বা তার চেয়ে বেশি হতে হবে। জাতিসংঘের হিসাবে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশের জাতীয় মাথাপিছু আয় ১২৭২ ডলার। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ১২৭১ ডলার। জাতিসংঘের শর্তানুযায়ী, মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে অবস্থান ৬৬ বা তার বেশি হতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান জাতিসংঘের তথ্য মতে ৭২.৮ এবং বিবিএসের হিসাবে ৭২.৯। আর অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে জাতিসংঘের শর্তানুযায়ী অবস্থান ৩২ বা তার কম থাকার কথা। বাংলাদেশের অবস্থান জাতিসংঘের বিবেচনায় ২৫ এবং বিবিএসের হিসাবে ২৪.৮। বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি মেনে নিয়ে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রথম সুপারিশ করতে যাচ্ছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ইউএনসিডিপি)। সংস্থাটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল গত বছরের ৯ থেকে ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ সফর করে সদর দপ্তরে যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তাতে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার তিনটি শর্তই বাংলাদেশ পূরণ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে আগামী মার্চে অনুষ্ঠেয় ইউএনসিডিপির ত্রিবার্ষিক সভায় উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রথম সুপারিশ লাভ করবে বাংলাদেশ।

গত ৩ জানুয়ারি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের শ্রেণি থেকে উত্তরণের রোডম্যাপ বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া কার্যক্রম পরিবীক্ষণের জন্য সরকার ১০ সদস্যের একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করেছে। টাস্কফোর্সের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য, ইআরডি সচিব, পররাষ্ট্রসচিব, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব, বাণিজ্যসচিব, অর্থসচিব, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী সদস্য, বিবিএসের মহাপরিচালক। ইআরডির অতিরিক্ত সচিবকে (ডিই উইং) টাস্কফোর্সের সদস্যসচিব করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব ও বর্তমান মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি) আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ইউএনসিডিপির প্রতিনিধিদল ফিরে গিয়ে যে প্রতিবেদন দাখিল করেছে, তাতে বলা হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের তিনটি সূচকের সবই বাংলাদেশ পূরণ করেছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ পাওয়ার পর যেসব সমস্যা ও সম্ভাবনা উদ্ভব হবে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।

টাস্কফোর্সের সদস্য ও ইআরডি সচিব কাজী শফিকুল আযম সম্প্রতি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের চিঠি দিয়ে এলডিসি থেকে উত্তরণ পরবর্তী সমস্যা ও সম্ভাবনার তথ্য আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে ইআরডিতে পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর পাঠানো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে, তা আগামী মার্চে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির কাছে পাঠানো হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করেছেন তিনি।

চিঠিতে শফিকুল আযম বলেছেন, ‘২০২১ সালের মধ্যে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের স্ট্যাটাস থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত নির্ণায়ক যথা—মাথাপিছু জিএনআই, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক সংকট সূচকের মান ইতিমধ্যে অর্জিত হওয়ায় এসংক্রান্ত প্রত্যাশা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তরণ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে ২০১৮ সালের মার্চ মাসে জাতিসংঘ কর্তৃক আয়োজিত ত্রিবার্ষিক সভায় বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপিত হবে। ওই সভায় বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণে প্রথম পর্যায়ের সুপারিশ লাভ করবে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।’

তিনি আরো লিখেছেন, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ উন্নত দেশগুলো থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধাসহ নমনীয় হারে উন্নয়ন সহায়তা পেয়ে আসছে। কিন্তু এর থেকে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের অনুকূলে এসব বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহায়তা পর্যায়ক্রমে কমে আসবে। বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হবে। এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর সম্ভাব্য প্রতিকূলতা ও উত্তরণের ক্রান্তিকাল যাতে মসৃণ হয়, উন্নয়ন পরিকল্পনা, উন্নয়ন কর্মসূচি এবং প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে যেন কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি না হয়, সে জন্য এখন থেকে কার্যক্ষেত্রে নিবিড় সম্পৃক্ততা বজায় রাখা জরুরি।

চিঠিতে মন্ত্রণালয়গুলোর সচিবদের তিনি লিখেছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী বিশেষ সুবিধাদি অবসানের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেসব সুবিধা পায়, তার অবসানের প্রভাব ও করণীয় নির্ধারণ করা জরুরি। এ বিবেচনা থেকে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠনসহ সরকার এরই মধ্যে প্রস্তুতিমূলক প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এসব সিদ্ধান্তের আলোকে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী প্রভাব মূল্যায়ন করে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় টাস্কফোর্সের অনুমোদন সাপেক্ষে বাংলাদেশের এলডিসি শ্রেণি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী প্রভাব বিষয়ে যে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে, তা জাতিসংঘে পাঠানো হবে। গত ৭ জানুয়ারি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) সাবেক মহাপরিচালক প্যাসকেল লেমির সঙ্গে বৈঠকের পর বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছেন, আগামী মার্চেই জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুপারিশ করবে। উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য জাতিসংঘের যে তিনটি শর্ত রয়েছে, তার সবই বাংলাদেশ পূরণ করেছে। ফলে জাতিসংঘ ২০২১ সালে চূড়ান্ত সুপারিশের পর ২০২৪ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবে। বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ইইউতে বাংলাদেশ অস্ত্র ছাড়া সব পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে।


মন্তব্য