kalerkantho


চেয়ারম্যান আরাস্তু খান বললেন

এক বছরে বড় অগ্রগতি ইসলামী ব্যাংকের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এক বছরে বড় অগ্রগতি ইসলামী ব্যাংকের

সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্তু খানসহ অন্যরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বেসরকারি খাতের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরের মাথায় ব্যাংকটির বিভিন্ন সূচকে বড় ধরনের অগ্রগতির কথা জানালেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আরাস্তু খান। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি সাবেক সচিব আরাস্তু খানের নেতৃত্বে ইসলামী ব্যাংক পরিচালনায় যোগ দেন অভিজ্ঞ এক ঝাঁক মুখ। শীর্ষ ব্যবস্থাপনায়ও আসে রদবদল। এরপর গত এক বছরে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ১০.৭০ শতাংশ। বিনিয়োগ বেড়েছে ১৩.৭০ শতাংশ। খেলাপি ঋণ সহনীয় মাত্রায় রয়েছে। তা ছাড়া প্রশাসনিক ব্যয় কমে এসেছে উল্লেখযোগ্য হারে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকের বিভিন্ন সূচকের অগ্রগতি তুলে ধরেন আরাস্তু খান। তিনি বলেন, ‘২০১৭ সাল ব্যাংক খাত কিছুটা তারল্য সংকটের মধ্য দিয়ে পার করলেও ইসলামী ব্যাংকের আমানত বেড়েছে ৭ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা বা ১০.৭ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি আমানত বেড়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। মুদারাবা বা বড় অঙ্কের আমানত বেড়েছে ১০ শতাংশ।’

একই সময়ে ৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগসহ মোট সাধারণ বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ হাজার ৯৯ কোটি টাকা এবং গ্রাহকসংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ২৫ লাখে দাঁড়িয়েছে বলে জানান ব্যাংকটির চেয়ারম্যান। ২০১৭ সালে ব্যাংকটি আমদানি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আহরণ বাণিজ্য করেছে যথাক্রমে ৩৮ হাজার ৫০০ কোটি, ২৪ হাজার কোটি এবং ২৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

আরাস্তু খান বলেন, “‘ইসলামী ব্যাংক আগ্রাসী বিনিয়োগ করছে’ বা ‘টাকা বের করে নিয়ে যাচ্ছে’ এমন কিছু কথা অনেকেই বলতে চেষ্টা করছেন। এই ব্যাংকটির ২০১৬ সালে বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫.৯০ শতাংশ। আমরা সেটা কমিয়ে ১৩.৭০ শতাংশে নামিয়ে এনেছি। এটা মোটেই আগ্রাসী নয়। তা ছাড়া ব্যাংক খাতে এখন ঋণের গড় প্রবৃদ্ধি ১৯ শতাংশ। আমরা অনেক দেখেশুনে তারপর বিনিয়োগ করছি। এ কারণে আমাদের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির হার ব্যাংক খাতের গড় বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির তুলনায় কম।’’ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ও আমানত অনুপাত (আইডিআর) ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো এর মধ্য থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারে। প্রচলতি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এই অনুপাত ৮৫ শতাংশ। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ গত বছর তার আমানতের ৮৭.৮০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছে। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কিছু নেই জানিয়ে ব্যাংক চেয়ারম্যান বলেন, ‘মাঝখানে একটা সময় আমাদের আইডিআর ৯০.২০ শতাংশে উঠে গিয়েছিল তার কারণ হঠাৎ করেই বড় একটি গ্রহক তার আমানত তুলে নিয়েছিল। তবে বছর শেষে আমরা আইডিআর নির্ধারিত অনুপাতের থেকে ২.২০ শতাংশের মতো সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।’

আরাস্তু খান বলেন, ‘খেলাপি ঋণ এখন ব্যাংক খাতের জন্য খুবই উদ্বেগের একটি বিষয়। বর্তমানে সরকারি ব্যাংকগুলোতে যেখানে ১৯-২০ শতাংশ খেলাপি ঋণ, এমনি ভারতের ব্যাংকগুলোতেও খেলাপি ঋণ ১৯-২০ শতাংশে উঠে গেছে সেখানে আমাদের মতো একটি বড় ব্যাংকে খেলাপি ঋণ মাত্র ৩.৫৬ শতাংশ। ২০১৬ সাল শেষে এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৩.৬০ শতাংশ। উদ্বৃত্ত তারল্য আছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।’

চেয়ারম্যান জানান, ২০১৬ সালে ব্যাংকটির মোট আয়ের প্রবৃদ্ধি ৯.২০ শতাংশ। ২০১৬ সালে এটা ছিল ৮.২০ শতাংশ। বিনিয়োগ আয় বেড়েছে ৭.৫০ শতাংশ। এ ছাড়া কোনো ধরনের বিনিয়োগ ছাড়াও কমিশন, এলসি মার্জিনসহ বেশ কিছু আয় হয় ব্যাংকের। এ ধরনের অবিনিয়োগ আয় বেড়েছে ১৮ শতাংশ।

আরাস্তু খান বলেন, ‘গত বছরে ব্যাংকের প্রশাসনিক ব্যয় আমরা কমিয়ে এনেছি। ২০১৬ সালে প্রশাসনিক ব্যয় বেড়েছিল ৩৩ শতাংশ। গত বছর এই ব্যয় বেড়েছে মাত্র ৫.০৪ শতাংশ। এখানে আমাদের বেশ কিছু টাকা বেঁচে যাওয়ায় মুনাফা বাড়াতে সাহায্য করেছে। এটা একটি ভালো দিক। কেননা একটা পয়সা বাঁচানো গেলে আরো পয়সা আয় করা যায়।’

ইসলামী ব্যাংক চেয়ারম্যান বলেন, ‘বৈদেশিক বাণিজ্য কমে গেছে মূলত রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির স্লথ গতির কারণে। একই কারণে কিন্তু দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় অর্থনীতির প্রতিফলন আমাদের ব্যাংকের বৈদেশিক বাণিজ্যেও পড়েছে।’ ইসলামী ব্যাংক রেমিট্যান্সে সব সময় মার্কেট লিডার ছিল জানিয়ে আরাস্তু খান বলেন, ‘আমরা রেমিট্যান্স আহরণ থেকে কোনো মুনাফা করব না বলে চিন্তা করেছি। প্রয়োজনে অন্য জায়গা থেকে মুনাফা করে রেমিট্যান্স আহরণ কার্যক্রম চালাব। এরই মধ্যে আমরা বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার কিছুটা সমন্বয় করায় রেমিট্যান্স বেশ বেড়েছে। গত ১৪ দিনে আমরা প্রতিদিন ১ কোটি ডলার করে রেমিট্যান্স পাচ্ছি। গত বছরের জানুয়ারির এই সময়ে এটা ছিল অর্ধেকেরও কম।’ ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ভালো। ব্যাংকগুলো আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে। বড় বড় ব্যাংক থাকবে না, প্রযুক্তিনির্ভর হবে। ফিনটেক বা ফিন্যানশিয়াল টেকনোলজির দিকে যাচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এগুলোর ওপর জোর দিচ্ছে সবাই। আমরাও এর জন্য প্রস্তুত। আমাদের ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৬ শতাংশ। শরিয়াহ পরিপালনের দিক থেকেও আমরা দিন দিন উন্নতির দিকে যাচ্ছি।

আরাস্তু খান বলেন, ‘আমাদের ৩১৮টি শাখা ছিল ২০১৬ সালে। ২০১৭ তে শাখা বেড়ে হয়েছে ৩৩২টি। এজেন্ট ব্যাংকিং শুরু করেছি আমরা। এখানে ব্যয় কম হয়। গ্রামের গ্রাহকের কাছে সহজে পৌঁছানো যায়। এর মধ্যেই ৫০টি এজেন্ট পয়েন্ট চালু করা হয়েছে। আশা করছি এবার ১৫০-২০০ এজেন্ট পয়েন্ট চালু করা সম্ভব হবে।’

চলতি বছরের ব্যবসায়ী পরিকল্পনা নিয়ে ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরাস্তু খান বলেন, ‘বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। আসন্ন মুদ্রানীতিতে এ খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা লাগাম টানা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে আমাদেরও হয়তো বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমিয়ে আনতে হতে পারে।’

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মো. আবদুল হামিদ মিঞা বলেন, ‘আমরা বড় অঙ্কের ঋণ থেকে এসএমই ঋণের দিকে যেতে চেষ্টা করছি। কেননা এসএমই খাত আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ধরনের অবদান রাখছে।’

সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মতিন, অডিট কমিটির চেয়ারম্যান ড. মো. জিল্লুর রহমান, পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম, এফসিএ, এফসিএমএ, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুব-উল-আলম ও ঊর্ধ্বতন নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন।


মন্তব্য