kalerkantho


আমানত সুরক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতও বীমার আওতায় আসবে

শেখ শাফায়াত হোসেন   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতও বীমার আওতায় আসবে

মতামত গ্রহণের জন্য প্রস্তাবিত আইনের খসড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে

আমানতকারীদের গচ্ছিত অর্থের বীমা সুবিধা দিতে নতুন একটি আইন করতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান ‘ব্যাংক আমানত বীমা আইন-২০০০’ রহিত করে কিছু সংশোধনী এনে ‘আমানত সুরক্ষা আইন’ নামে আইনটি পুনঃপ্রণয়নের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রস্তাবিত আইনে ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের আমানতের ওপরও বীমা করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করার কথা বলা হয়েছে। আইন প্রণয়নের আগে ও পরে প্রতিষ্ঠিত সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই বীমার অন্তর্ভুক্ত হবে। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বীমা না করলে আমানত সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা জারি করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। তা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান আমানতের বিপরীতে বীমার প্রিমিয়াম জমা দিতে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে অবসায়ন বা বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

দেশে বর্তমানে ৫৭টি ব্যাংক ও ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে মোট ৯ লাখ ২৬ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা আমানত জমা রয়েছে। গত বছর জুন পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে জমাকৃত আমানতের পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত আমানত সুরাক্ষা আইনের খসড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে এটি চূড়ান্ত করা হবে। এরপর এটি আইন হিসেবে জারি করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সব প্রক্রিয়া শেষে জাতীয় সংসদে পাসের মধ্যে দিয়ে আইনটি কার্যকর হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক মো. আবদুল হামিদ জানান, বিদ্যমান আইনে শুধু ব্যাংকের আমানতের বীমা সুবিধার কথা বলা আছে, প্রস্তাবিত আইনে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) আমানতেরও বীমা সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আবদুল হামিদ আরো জানান, বিদ্যমান আইনে কিছু সংশোধন এনে প্রস্তাবিত আইনের পূর্ণাঙ্গ একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এটি মাত্র চার পৃষ্ঠার। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে মতামতের জন্য দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, বিদ্যমান আইনে বর্তমানে এক লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত হারে বীমার প্রিমিয়াম আদায় করে। প্রস্তাবিত আইনে বাংলাদেশ ব্যাংক আমানত সুরক্ষা ট্রাস্ট তহবিল নামে একটি তহবিল সংরক্ষণ করবে এবং এই তহবিলের অর্থ সংস্থাটি চাইলে বিনিয়োগ করতে পারবে। বর্তমানেও এ ধরনের একটি তহবিল রয়েছে এবং তহবিলের অর্থ ট্রেজারি বিল ও স্বল্পমেয়াদি রেপোতে বিনিয়োগ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, পর পর দুইবার কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়াম জমা দিতে ব্যর্থ হলে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ওই ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানেক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আমানত গ্রহণ বন্ধ করতে নির্দেশ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিদ্যমান আইনেও এই বিধান রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে আরো বলা হয়েছে, দুইবারের বেশিবার প্রিমিয়াম দিতে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে ট্রাস্টি বোর্ড সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে পরামর্শ দিতে পারবে। কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়াম জমা দিতে ব্যর্থ হলে প্রিমিয়ামের সমপরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের সংরক্ষিত হিসাব থেকে কেটে রাখা হবে। এ ক্ষেত্রে দেরিতে প্রিমিয়ার জমা দেওয়ায় ব্যাংক রেট অনুযায়ী দণ্ডসুদও আরোপ করা যাবে।

কোনো কারণে দেশে কার্যরত কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও (অবসায়ন) আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে এই আইনের আওতায়। আমানতকারীদের জমা করা আমানতের মধ্যে বীমার সমপরিমাণ অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। সরকারের অনুমোদন নিয়ে পর্যায়ক্রমে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক তহবিল থেকে দেবে। অবসায়নের ৯০ দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করা হবে। একাধিক হিসাব থাকলে একত্রিত করে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা তহবিল থেকে দেওয়া হবে। তবে তহবিলে আমানতকারীর পাওনার তুলনায় কম অর্থ থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ব্যাংক রেটে অর্থ কর্জ করে তা পরিশোধ করবে সরকার। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের কাছে ব্যাংকের কোনো পাওনা থাকলে তা-ও সমন্বয় করা হবে।

আমানতের সুরক্ষায় গত বছর জুন পর্যন্ত আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিলের আকার ছিল ছয় হাজার ১০ কোটি টাকা। ব্যাংকের আমানত বীমা প্রিমিয়াম গ্রহণ করা হয় ষান্মাষিক ভিত্তিতে। বাংকের ঝুঁকি বিবেচনায় প্রিমিয়ামের হার নির্ধারণ করা হয়। প্রবলেম ব্যাংকগুলোকে দশমিক ১০ শতাংশ, আরলি ওয়ার্নিংভুক্ত ব্যাংককে দশমিক ৯ শতাংশ এবং অন্যান্য ব্যাংককে দশমিক ৮ শতাংশ প্রিমিয়াম দিতে হয়। তহবিলের টাকা পাঁচ ও ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বিলে এবং স্বল্পমেয়াদে রেপো খাতে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।


মন্তব্য