kalerkantho


যুক্তরাষ্ট্রের আদলে ওটিসি মার্কেটের উন্নয়ন

রফিকুল ইসলাম   

২১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



যুক্তরাষ্ট্রের আদলে ওটিসি মার্কেটের উন্নয়ন

উন্নত দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওভার দ্য কাউন্টারের (ওটিসি) আদলেই পুঁজিবাজারে ওটিসি মার্কেটের উন্নয়ন করতে চায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। অবহেলিত এই বাজারকে গতিশীল করতে যুক্তরাষ্ট্রের আদলে পৃথক বোর্ড গঠন ও নীতিমালার খসড়া করে প্রস্তাব পাঠিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে। এক বছরেও তা চূড়ান্ত হয়নি।

একটি সূত্র জানায়, কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বাজার পরিদর্শন করেছে। সেখানে কিভাবে ওটিসি পরিচালিত হয় সে বিষয়ে জেনেছেন। অন্যান্য দেশের ওটিসি বাজার ও আইন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন।

পুঁজিবাজার গতিশীল করতে পিছিয়ে পড়া ও লোকসানি কম্পানির ওটিসি মার্কেট উন্নয়নে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে উদ্যোগ নেয় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ। নামমাত্র ও অস্তিত্বহীন কম্পানি বাদ দিয়ে নতুন আঙ্গিকে সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ডিএসই সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওটিসি মার্কেটের ধারণা থেকে পৃথক বোর্ড গঠন ও খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। যার চূড়ান্ত অনুমোদনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। সেটি এখনো অনুমোদন পায়নি।

কমিশন সূত্র বলছে, ডিএসইর ওটিসি মার্কেট উন্নয়নে গত সেপ্টেম্বরে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন কমিশন গ্রহণ করেছে। ওটিসি মার্কেট বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নে একটি কমিটিও গঠন করেছে কমিশন। গতকাল মঙ্গলবার কমিশনে নিয়মিত সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান এই তথ্য জানিয়েছেন। পাঁচ সদস্যের ওই কমিটিকে আগামী ৮ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ওটিসি হচ্ছে মূল মার্কেটের বাইরে তালিকাভুক্ত কম্পানির শেয়ার লেনদেনের বিকল্প ব্যবস্থা। ক্রমাগত লোকসান, বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে ব্যর্থ, লভ্যাংশ না দেওয়া, তালিকাভুক্তি অ-নবায়ন ও কাগুজে শেয়ারকে ইলেকট্রনিক শেয়ারে রূপান্তরিত বা ডিম্যাট করতে না পারা কম্পানিকে মূল বাজার থেকে চ্যুত করে ওটিসিতে পাঠানো হয়। ২০০৯ সালের ১ অক্টোবর ওটিসি মার্কেট চালু হয়।

সূত্র জানায়, ওটিসিতে কম্পানির শেয়ারের জোগান থাকলেও চাহিদা কম হওয়ায় প্রায় ‘অচল’ এ বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা। অচল ওটিসিকে সচল বা ভাইব্রান্ট করতে নতুন উদ্যোগ নেয় ডিএসই। এতে ‘ডিএসই বুলেটিন বোর্ড’ ও নতুন রেগুলেশন বা নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওটিসি ধারণাকে মুখ্য করে বোর্ড গঠন ও নীতিমালার খসড়া করা হয়েছে। নীতিমালার খসড়া অনুমোদন পেলেই বোর্ড গঠনে অগ্রসর হবে কর্তৃপক্ষ।

যুক্তরাষ্ট্র সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে ফিন্যানশিয়াল ইন্ডাস্ট্রি রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ (ফিনরা) ওটিসি মার্কেট পরিচালনা করে। ফিনরায় তালিকাভুক্ত ডিলাররা ওটিসিতে নিজেদের মধ্যে শেয়ার কেনাবেচা করে দরপ্রস্তাবও নিষ্পত্তি করে। ‘ওটিসি বুলেটিন বোর্ড’ নামে পৃথক ব্যবস্থায় এই লেনদেন হয়। যেখানে আন্ত ডিলার বা ডিলারদের মধ্যে ওটিসি তালিকাভুক্ত কম্পানির শেয়ারের দাম প্রস্তাব, সর্বশেষ দাম ও শেয়ার লেনদেনের তথ্য ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়ায় জানতে পারে। ওটিসিভুক্ত কম্পানি জাতীয় কোনো স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত নয়।

ডিএসইর প্রস্তাব অনুযায়ী, ওটিসি মার্কেট পরিচালনায় পৃথক বোর্ড গঠন করা হবে। মূল মার্কেটের মতোই সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী শেয়ার লেনদেন করতে পারবে। বর্তমানে এই বাজারে শেয়ারের জোগান থাকলেও চাহিদা কম হওয়ায় গতিশীল নয়। শেয়ারে নিলামের সুযোগ না থাকা, স্বয়ংক্রিয় লেনদেনে অসুবিধা ও লেনদেনে পৃথক মান নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বাজার উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে ডিএসই। এই মার্কেটের উন্নয়নে ওটিসির জন্য পৃথক বুলেটিন বোর্ড ও নীতি প্রণয়ন করা হয়।

সূত্র জানায়, ওটিসি উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা কাজে লাগিয়ে ‘ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ওভার দ্য কাউন্টার বুলেটিন বোর্ড) রেগুলেশন, ২০১৭’ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। যার চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এই অনুমোদন পেলেই ‘ডিএসই বুলেটিন বোর্ড’ গঠন করবে প্রতিষ্ঠানটি। কাগুজে শেয়ার থেকে যেসব কম্পানি ইলেকট্রনিক বা ডিম্যাট সম্পন্ন করেছে তাদের নিয়ে বিদ্যমান ওটিসি সংস্কার করে চালু করবে। এই বাজারের ৬৬টি কম্পানির মধ্যে ৩০ কম্পানি তালিকাভুক্তিকরণে নীতিমালা মেনে চলে। কাজেই এই ৩০ কম্পানিকে ওটিসি প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত করবে ডিএসই। বাকি কম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তি থেকে বাদ দেবে।

সূত্র জানায়, ওটিসিতে বিনিয়োগকারীদের টাকা আটকে আছে। কম্পানির শেয়ার থাকলেও লেনদেন হয় না। মূল মার্কেটের বাইরে ওটিসির লেনদেন-প্রক্রিয়া সময়ব্যাপী। মূল মার্কেটে শেয়ার ক্রয়ের তিন কার্যদিবস পরে বিক্রি করতে পারে; কিন্তু ওটিসিতে শেয়ার বিক্রিতে কয়েক দিন সময় লাগে। প্রথমত, বিক্রেতা স্টক ডিলার/স্টক ব্রোকার সিকিউরিটিজের নাম, সংখ্যা, মূল্য, সর্বশেষ লেনদেন মূল্য ও বৈধতার সময় উল্লেখ করে একটি বিক্রয়াদেশ ঘোষণা করবে। এই বিক্রয়াদেশ সব ক্রেতার জন্যই উন্মুক্ত থাকবে। শেয়ার কিনতে আগ্রহীরা বিক্রয়াদেশের নিবন্ধন পরীক্ষা করে পছন্দানুযায়ী সিকিউরিটিজ নির্বাচন করে ক্রয়াদেশ দেবে। এই বিক্রয়াদেশ ও ক্রয়াদেশের পর ওটিসির শেয়ার হস্তান্তর হয়। প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হওয়ায় আগ্রহ হারিয়েছে বিনিয়োগকারীরা।

ডিএসই সূত্রে জানা যায়, ওটিসি মার্কেটে তালিকাভুক্ত ৬৬ কম্পানির শেয়ার রয়েছে ৪১ কোটি ১১ লাখ। বাজার মূলধন ৭৮১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। বাজারে তালিকাভুক্ত ১১ কম্পানির শেয়ার আছে তবে কম্পানির কোনো হদিস নেই। বছরে এক দিনও লেনদেন হয়নি এমন কম্পানির সংখ্যা ১২টি। এসব কম্পানির অস্তিত্ব রয়েছে; কিন্তু বাজারে কোনো কার্যক্রম নেই।

ডিএসইর ওয়েবসাইট সূত্রে জানা যায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্তানুযায়ী ১৪ কম্পানি ডিম্যাট সম্পন্ন করেছে। ৬৬ কম্পানির মধ্যে ২১ কম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ও পি/ই ধনাত্মক। অন্য কম্পানিগুলোর ইপিএস ও পিই ঋণাত্মক বা ক্ষতিতে রয়েছে।

ডিএসই এমডি কে এ এম মাজেদুর রহমান সম্প্রতি ওটিসি মার্কেট নিয়ে বলেছিলেন, দীর্ঘদিন থেকেই অলস পড়ে থাকা ওটিসি মার্কেটের উন্নয়নে কমিশনে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাব গৃহীত হলে মূল মার্কেটের মতোই এখানে পৃথক লেনদেন হবে। সাধারণ বিনিয়োগকারী ইচ্ছামতো (মন চাইলে কিনে) শেয়ার লেনদেন করলেও তখন নিয়মিতভাবেই লেনদেন হবে। নতুন উদ্যোমে ওটিসি মার্কেট ঘুরে দাঁড়াবে।’

 


মন্তব্য