kalerkantho


মাসজুড়ে থাকবে দেশি ফলের দাপট

রমজানে খেজুরের সরবরাহ থাকবে চাহিদার চেয়ে বেশি

শওকত আলী   

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



রমজানে খেজুরের সরবরাহ থাকবে চাহিদার চেয়ে বেশি

মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উপাসনার মাস রমজানে রোজাদারের ইফতারের অন্যতম প্রধান খাদ্য উপদান খেজুর। ধনী-গরিব সবাই সারা দিনের রোজার শেষে এ ফল দিয়ে ইফতার করতে পছন্দ করে। প্রতিবছর এ মাসে দেশজুড়ে এ ফলের চাহিদা থাকে শীর্ষে—এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দামও নিয়ে থাকে। তবে এ বছর ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে আমদানিকারকরা। মাসজুড়ে ৩০-৩৫ হাজার মেট্রিক টনের চাহিদার বিপরীতে বাজারে ৪০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি খেজুর থাকবে। একই সময়ে বাজারে দেশি ফলের উপস্থিতির কারণে বিদেশি ফলের চাহিদা থাকবে কম।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, রমজান শুরু হওয়ার ঠিক আগে আগেই দেশি ফলে বাজার ভরে উঠবে। কারণ এ সময়ে আম, লিচু, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, জামসহ বিভিন্ন দেশি ফল পাওয়া যাবে। এর পাশাপাশি কলা তো বারো মাসই পাওয়া যায়। আর দেশি ফলের এই সময়ে মানুষের আমদানি ফলে আগ্রহ থাকবে কম। ফলে রমজানজুড়ে বাজারে থাকবে দেশি ফলের দাপট।

জানা গেছে, আমদানিকারকদের কাছ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ১০০ মেট্রিক টন খেজুর ক্রয় করেছে, যা মাসজুড়ে খোলা বাজারে বিক্রি করবে সংস্থাটি। তবে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এর পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সাধারণত সৌদি আরব, দুবাই, তিউনিসিয়া, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, মিসর ও পাকিস্তান থেকে খেজুর আমদানি হয়ে থাকে। আফ্রিকার কয়েকটি দেশেও খেজুর বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফুড ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, খেজুরের বাজার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। সারা বছর প্রক্রিয়াজাত করা এ ফলটির খুব একটা চাহিদা থাকে না। রোজার মাসেই মূলত খেজুরের কেনাবেচা জমজমাট হয়ে ওঠে। এ বছর রোজা শুরু হতে এখনো মাসখানেক বাকি। এরই মধ্যে খেজুরের পাইকারি ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা পর্যাপ্ত পরিমাণ খেজুর আমদানি হচ্ছে বলে জানিয়েছে।

জানা গেছে, রমজানে প্রায় ৩০-৩৫ হাজার মেট্রিক টনের মতো খেজুরের প্রয়োজন হয়। যেখানে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, অন্তত ৪০ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি পরিমাণ খেজুর এরই মধ্যে আমদানিপ্রক্রিয়ায় রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ চলে এলেও অনেকের খেজুর এখনো জাহাজে রয়েছে।

এরই মধ্যে ঢাকার বাইরে থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীদের খেজুর কিনতে দেখা গেছে। বুধবার বাদামতলীতে কথা হয় ফেনী মহিপাল থেকে খেজুর কিনতে আসা পাইকারি বিক্রেতা মো. ইউসুফ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছর খেজুরের কিছুটা সংকট ছিল; কিন্তু এ বছর পর্যাপ্ত খেজুর রয়েছে। আমরা যেটুকু চাচ্ছি, তা পাচ্ছি। দামও তুলনামূলকভাবে বেশ কম।’

বাদামতলীর ফলের আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে সবচেয়ে বেশি খেজুর আমদানি হয় ইরাক থেকে। জাহিদি নামের খেজুরটি সাধারণ মানুষ বেশি খায়। এই খেজুর পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। এটা এবার আরো এক হাত বদল হয়ে তবেই খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছবে। এতে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে যেতে যেতে ১২০-১৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হবে।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, বাজারে খালাস, মুসকানি, ওয়াসলি, বেরহি, ডেইরি, সাফাওয়ি, শালাবি, ওয়ান্নহ, সুক্কারি, মাবরুম, খুরমা, মরিয়ম, আমিরাত গোল্ডসহ বিভিন্ন নামের ও জাতের খেজুর পাওয়া যাচ্ছে। মোট বাজারের ৯৫ শতাংশ দখল করা এই খেজুরগুলো পাইকারিতে ৭০-১২০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে, যা খুুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১২০-২০০ টাকার মধ্যেই বিক্রি হওয়ার কথা।

এ ছাড়া একটু বেশি দামের খেজুরের মধ্যে মরিয়মের বিভিন্ন মানের খেজুর বাজারজাত হয়। যেগুলো সাধারণত পাইকারি ব্যবসায়ীরা দেশের সুপারশপগুলোর অর্ডারের ভিত্তিতে আমদানি করে থাকে। যার বিভিন্ন খেজুরের মধ্যে ৫ শতাংশ বাজার রয়েছে। বেশি সচ্ছল লোকজন এই খেজুরগুলোর ক্রেতা। এগুলো পাইকারি বাজারে ৬০০ থেকে এক হাজার বা এক হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে আর খুচরা বাজারে এক হাজার থেকে এক হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হয় বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফুড ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবার আমাদের খেজুরের আমদানি যথেষ্ট, যা গত বছর ছিল না। এ কারণে দাম বৃদ্ধির কোনো কারণ আছে বলে মনে করছি না। তার পরও যেসব খুচরা ব্যবসায়ীরা অযথা বাড়তি দামে খেজুর বিক্রির চেষ্টা করবে সেখানে ক্রেতাদের একটু বাজার ঘুরে খেজুর কেনা উচিত।’

রমজান শুরু হওয়ার ঠিক আগে আগেই দেশি ফলে বাজার ভরে উঠবে। কারণ এ সময়ে আম, লিচু, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, জামসহ বিভিন্ন দেশি ফল পাওয়া যাবে। এর পাশাপাশি কলা তো বারো মাসই পাওয়া যায়। আর দেশি ফলের এই সময়ে মানুষ আমদানি করা ফল একটু কমই কেনে। অর্থাৎ রোজার মাসে বরাবরই দেশি ফলের একটি আধিক্য তৈরি হয়। এবারও তেমনটাই থাকবে বলে মনে করছে ব্যবসায়ীরা।

তার পরও দেশি ফলের বাইরে চায়না ও সাউথ আফ্রিকা থেকে আমদানি করা নাশপাতি, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল ও চিলি থেকে আনা আপেল, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা আঙুর এবং মাল্টার একটা একটা বড় বাজার রয়েছে। বর্তমানে বাজারে ভারতীয় আঙুর বিক্রি হলেও ১০-১৫ দিনের মধ্যে বাজারে আরো ভালোমানের অস্ট্রেলিয়ান আঙুর বাজারে বিক্রি শুরু হবে বলে জানা গেছে।

মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সামনে আছে মধুমাস। অর্থাৎ সবচেয়ে সুস্বাদু দেশি ফলগুলো এ সময় পাওয়া যাবে। যেগুলোতে মানুষের আগ্রহ ও চাহিদা বেশি। এখন পর্যন্ত আম আর লিচুর ফলন খুব ভালো ফলন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি নিয়মিত আমদানি করা ফলগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে থাকবে। সুতরাং কোনো ফলেই আসলে অতিরিক্ত দাম বৃদ্ধির কথা নয়।’



মন্তব্য