kalerkantho


কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি কমছে প্রযুক্তির ব্যবহারে

এম সায়েম টিপু   

১৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি কমছে প্রযুক্তির ব্যবহারে

দেশের শিল্প-কারখানাগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি কমছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে এক গবেষণা প্রতিবেদনে। এতে দেখা যায়, দেশের শিল্প খাতে উৎপাদন এবং রপ্তানি বাড়লেও কর্মসংস্থান সেই হারে বাড়েনি। এমনকি দুই বছর ধরে পোশাক খাতে কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে পড়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) ‘পলিসি ইনসাইট’ ত্রৈমাসিক প্রকাশনীতে এ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।

অটোমেশন, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন শীর্ষক নিবন্ধে বলা হয়, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে নতুন করে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বাড়ছে না। নতুন নতুন মেশিন সংযোজনের ফলে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়লেও কাজের সুযোগ কমছে শ্রমিকদের। গত দুই বছরে এ খাতে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি ছিল শূন্য শতাংশ। আর গত ২৬ বছরে এ খাতে প্রতি মিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের বিপরীতে শ্রমিকের কর্মসংস্থান কমেছে ৭৪ শতাংশ।

তবে এই প্রতিবেদনের তথ্য সঠিক নয় উল্লেখ করে তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, রপ্তানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকের সংখ্যা রপ্তানি আয়ের সঙ্গে তুলনামূলক না বাড়লেও বড় একটি সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। একসময় যেখানে ২০ থেকে ২৫ লাখ শ্রমিক কাজ করত বর্তমানে এ খাতে ৪৪ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। তবে প্রযুক্তির প্রভাবে সোয়েটার এবং নিটিং খাতে কর্মী আগের চেয়ে কিছুটা কম লাগছে।

কর্মসংস্থানে আশঙ্কার কথা জানিয়ে পলিসি ইনসাইটের এডিটর ইন চিফ ড. এম এ রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতেই কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। একই অবস্থা দেখা গেছে সর্ববৃহৎ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতেও। ২০১০ সালে এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৬ সালে হয়েছে ২৮ বিলিয়ন ডলার। ছয় বছরে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, কিন্তু এ খাতের কর্মসংস্থান সে হারে বাড়েনি। ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল নাগাদ এ খাতের কর্মসংস্থান চার লাখের মতো বাড়লেও শেষ দুই বছরে একেবারেই বাড়েনি। গবেষণায় বলা হয়, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কর্মসংস্থানের সম্প্রসারণ ক্ষমতা ছিল একেবারে শূন্যর কোঠায়।

তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অটোমেশনের প্রভাব সাময়িকভাবে কর্মসংস্থানে পড়লেও এর ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না। রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং এর প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর মাধ্যমেই কর্মসংস্থানের নিম্নমুখিতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। চলতি বছরের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হবে বলে নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন। তবে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য এটা মোটেও সন্তোষজনক নয়। তাই সুনির্দিষ্ট রপ্তানি নীতিমালার মাধ্যমে এর প্রবৃদ্ধিকে আরো বাড়াতে হবে।

কর্মসংস্থানে আশঙ্কার কথা জানিয়ে ড. এম এ রাজ্জাক আরো বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্প ছাড়াও দেশীয় অন্য শিল্প-কারখানাতেও অটোমেশন হচ্ছে। এর ফলে ওই সব শিল্পেও কর্মসংস্থানের হার কমছে। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের অটোমেশনের প্রভাব এতটাই বেশি যে গত পাঁচ বছরে স্থানীয় শিল্পে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি হওয়ার পরও স্থানীয় শিল্পগুলোতে কর্মসংস্থান স্থবির হয়ে আছে।

গবেষণায় আরো বলা হয়, অটোমেশনের কারণে গত ২৬ বছরে প্রতি মিলিয়ন ডলার রপ্তানির বিপরীতে ৭৪ শতাংশ বা ৪০৩ জন শ্রমিকের চাকরির সুযোগ কমেছে। অর্থাৎ ১৯৯০ সালে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রতি মিলিয়ন ডলার আয়ে ৫৪৫ জন শ্রমিক কাজ করত; কিন্তু ২০১৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে মাত্র ১৪২ শ্রমিকের হাত ধরেই একই পরিমাণ রপ্তানি আয় আসছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সহসভাপতি মাহমুদ হাসান বাবু বলেন, কর্মসংস্থান কিছুটা স্থবির হলেও এটা শুধু প্রযুক্তির কারণে নয়। একই সঙ্গে শ্রমিকের দক্ষতা এবং পোশাকের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া ২৬ বছর আগে এক মিলিয়ন ডলার দিয়ে যে পরিমাণ পোশাক পাওয়া যেত বর্তমানে একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে সেই পরিমাণ পোশাক পাওয়া যাবে না। তবে গত ছয় বছরে প্রযুক্তির প্রভাব কিছুটা পড়েছে। আর এসব হয়েছে সোয়েটার খাতে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, ‘প্রযুক্তির ব্যবহারে কর্মসংস্থানে চ্যালেঞ্জ থাকলেও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে এর ব্যবহার বাড়াতে হবে। তবে এ জন্য আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়াতে হবে।’ এ ছাড়া তিনি দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে বলেন, সরকারের নানা সীমাবদ্ধতার পরও অনেক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ঘাটতিও আছে। সরকার এসব থেকে শিক্ষা নিয়ে সংশোধনের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে ভূমিকা রাখবে।


মন্তব্য