kalerkantho


মুদ্রানীতির কৌশল প্রণয়নে মতামত নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

মূল্যস্ফীতিই বড় চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



মূল্যস্ফীতিই বড় চ্যালেঞ্জ

মূল্যস্ফীতির চাপ উপশম প্রাধান্য দিয়ে গত অর্থবছরের মুদ্রানীতি প্রণয়ন করলেও শেষ পর্যন্ত বাগে রাখা যায়নি। বিদায়ী অর্থবছরের ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫.৭৮ শতাংশ। এটাকে ৫.৫ শতাংশে ধরে রাখার লক্ষ্য ছিল সরকারের। আগের অর্থবছরে (২০১৬-১৭) গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৪৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৫.৬ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মূল্যস্ফীতির ওপর জোর দেওয়া এবারও মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্যই থাকছে। তবে এবার যেহেতু বাজেটে সঞ্চয়পত্রের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে সরকারি খাতের ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে, সেহেতু বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধির লাগাম টানতেই হবে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তবে নির্বাচনের বছরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার যেখানে ঋণের সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমিয়ে আনাটা সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে বলেও মনে করছেন তাঁরা।

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে আসবে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি।

বিদায়ী অর্থবছরে মূল বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল ২৮ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। কিন্তু ওই অর্থবছরে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে (মূলত সঞ্চয়পত্র থেকে) বেশি ঋণ আসায় ব্যাংকব্যবস্থা থেকে লক্ষ্য অনুযায়ী ঋণ নিতে হয়নি সরকারকে। যেকারণে সংশোধিত বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের লক্ষ্য কমিয়ে হয় ১৯ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা।

অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য কমিয়ে ২৯ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা করা হয়েছে। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্রসহ জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলো থেকে ২৬ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

গত অর্থবছরের মুদ্রানীতি ভঙ্গির দিকে তাকালে দেখা যায়, সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সীমিত রাখতে বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণের জোগান প্রবৃদ্ধি ১৫.৮ শতাংশে রাখার নীতি ভঙ্গি ও পরিকল্পনা গ্রহণের কথা জানিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির।

তবে গত অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণের তেমন চাহিদা না থাকায় বেসরকারি খাতের ঋণের জোগান প্রবৃদ্ধি ১৬ .৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৬.৮ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য নিয়ে বিদায়ী অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

বিদায়ী অর্থবছরের মে মাসে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭.৬০ শতাংশ। তা ছাড়া অর্থবছরের ১১ মাস সরকারের ব্যাংকঋণ ঋণাত্মক ধারায় থাকলেও গত জুন শেষে এ খাতের নিট ঋণ ৯২৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

তবে অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি প্রণয়নের সময় বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮.১ শতাংশ। ওই সময় মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ১৬.৮ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কিছুটা করে কমিয়ে আনে। সনাতনী ব্যাংকগুলোর এডিআর ৮৫ থেকে কমিয়ে ৮৩.৫ শতাংশে এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর আইডিআর ৯০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮৯ শতাংশ করা হয়। ঋণের প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে ওই নির্দেশনা দেওয়া হলেও ব্যাংকগুলো সেটা বাস্তবায়ন করতে আমানত বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামে। ফলে মুদ্রানীতি ঘোষণার পরের মাস ফেব্রুয়ারি থেকেই আমানতের সুদহার ৫-৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১-১২ শতাংশে পৌঁছে যায়। এ নিয়ে শুরু হয় নতুন সংকট। ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহারও বেড়ে ১৮-১৯ শতাংশে পৌঁছে যায় অল্প সময়ের মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত মার্চে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ব্যাংকঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিট বা এক অংকে নামিয়ে আনার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। সব শেষে গত ১ জুলাই থেকে বেশির ভাগ ব্যাংকই এক অংকের সুদে ঋণ বিতরণের ঘোষণা দেয়। এই পরিস্থিতিতে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতির কৌশল নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক ও এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন ও কৌশল নির্ধারণ নিয়ে বৈঠক করেন গভর্নর ফজলে কবির। গতকাল বুধবার সাবেক গভর্নরদের সঙ্গে বনানীর একটি হোটেলে মুদ্রানীতির কৌশল নির্ধারণ নিয়ে আলোচনায় বসেন গভর্নর।



মন্তব্য