kalerkantho


পরিসংখ্যান নেই : পর্যটনের উন্নয়ন আন্দাজে

মাসুদ রুমী   

১২ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



পরিসংখ্যান নেই : পর্যটনের উন্নয়ন আন্দাজে

নীলগিরি, বান্দরবান

দেশের পর্যটন খাতের সঠিক পরিসংখ্যান নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। প্রতিবছর কোন দেশ থেকে কতজন বিদেশি পর্যটক আসছে, তারা কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে, কোন কোন গন্তব্যে যাচ্ছে—এমন কোনো তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সামগ্রিকভাবে পর্যটন খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা। তাঁরা বলেছেন, দেশের পর্যটন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে অনুমাননির্ভর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। পর্যটনের প্রসারে সেবার মান উন্নয়ন, গন্তব্যগুলোতে সুবিধা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যটন তথ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে টিএসএ প্রণয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন।

পর্যটন খাতের আন্তর্জাতিক মান, ধারণা ও সংজ্ঞা অনুযায়ী পণ্য ও সেবার মূল্যায়ন করা প্রয়োজন, যা ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট বা টিএসএর মাধ্যমে করা হয়। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (ইউএনডাব্লিউটিও) নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন দেশ টিএসএ তৈরি করলেও বাংলাদেশে গত চার দশকেও এর জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০১২ সালের দেশি-বিদেশি পর্যটকের সঠিক সংখ্যা নির্ণয়ের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি)। ওই সময় টিএসএর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এরপর কেটে গেছে ছয় বছর। ফলে অনুমাননির্ভর তথ্যের ভিত্তিতে চলছে খাতটির বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) থেকে ইউএনডাব্লিউটিওকে পাঠানো এক হিসাবে দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১৪—এই চার বছরে বাংলাদেশে পর্যটক এসেছে যথাক্রমে এক লাখ ৫৪ হাজার ৬১৭, এক লাখ ২৪ হাজার ৯৪৩, এক লাখ ৪৮ হাজার ৩৪৯ ও এক লাখ ২৫ হাজার ৩৪ জন। ২০১৬ সালকে পর্যটনবর্ষ ঘোষণা করার সময় পুলিশের বিশেষ শাখার উদ্ধৃতি দিয়ে বিটিবি কর্তৃপক্ষ বলেছিল, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক আসে প্রায় ছয় লাখ ৪২ হাজার। এ ছাড়া সরকারের তিন বছর মেয়াদি ‘ভিজিট বাংলাদেশ’ কর্মসূচির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, তাতে উল্লেখ করা হয়, ২০১২ সালে পাঁচ লাখ ৮৩ হাজার বিদেশি পর্যটক আসে। বিটিবির লক্ষ্য বলা হয়েছে, প্রতিবছর পর্যটকসংখ্যা ১৫ শতাংশ হারে বাড়ানো হবে।

ইউএনডাব্লিউটিও তাদের সদস্য দেশগুলোর পর্যটন পরিসংখ্যান নিয়ে প্রকাশনা বের করে থাকে। ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের তথ্য বাংলাদেশ ইউএনডাব্লিউটিওকে দিলেও ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান দিতে পারেনি। এ জন্য ইউএনডাব্লিউটিও বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডকে পাঠানো ই-মেইল বার্তায় তথ্য দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু ট্যুরিজম বোর্ড ২০১৫, ২০১৬ সালের কোনো তথ্যই দিতে পারেনি ইউএনডাব্লিউটিওকে। ২০১৭ সালের হিসাবও পাওয়া যায়নি।

বিটিবির গভর্নিং বডির সদস্য জামিউল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যটনের তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে জাতীয় পর্যটন তথ্য ভাণ্ডার এবং টিএসএ প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের কোনো কিছুই নেই। এর গুরুত্ব অনুধাবনেই অনেক বছর চলে গেছে। ইউএনডাব্লিউটিওর কাছে বিটিবি সহায়তা চাইলে তারা একজন পরামর্শক পাঠিয়েছিল। কিন্তু তা আর এগোয়নি। আমলাতন্ত্রের পাশাপাশি আমাদের বেসরকারি খাতও দুর্বল। ফলে পর্যটন খাত কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। সভা-সেমিনার আলোচনা অনেক হচ্ছে, কিন্তু পর্যটনের তেমন কোনো উপকার হচ্ছে না। কেননা আমাদের পর্যটন কাঠামো নেই, পরিকল্পনা নেই, ব্যবস্থাপনা, অর্থায়ন নেই, অবকাঠামো উন্নয়ন নেই, সেবার মান নিয়ন্ত্রণ নেই, পণ্য চিহ্নিতকরণ ও উন্নয়ন নেই, সঠিক পরিসংখ্যান নেই, গবেষণা কাজ নেই, আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন নেই। আর এতে করে যা হওয়ার তাই হচ্ছে।’ এই পর্যটন বিশ্লেষক বলেন, ‘ট্যুরিজম ইজ এভরিবডিস বিজনেস’—এটা যত দিন আমরা অনুধাবন করতে পারব না তত দিন পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন হবে না।

ভ্রমণবিষয়ক পাক্ষিক দ্য বাংলাদেশ মনিটর সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যটন খাতের উন্নয়নের জন্য পরিসংখ্যান জরুরি। পরিসংখ্যানের অভাবে আমরা এ খাতের সামগ্রিক চিত্র পাচ্ছি না। অনুমাননির্ভর নানা তথ্য দেওয়া হয়। কিন্তু টিএসএ কার্যকর থাকলে আমরা পুরো খাতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের হিসাব পেতাম এবং সেই অনুযায়ী পরবর্তী পরিকল্পনা সরকারি-বেসরকারি সব খাতই গ্রহণ করতে পারত। আমরা টিএসএ যত তাড়াতাড়ি করতে পারব, পর্যটন খাত তত অপরিকল্পিত উন্নয়ন থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।’

পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, টিএসএ প্রণয়ন করা হলে আমাদের জিডিপিতে পর্যটন খাত ও প্রত্যেকটি উপখাতের অবদান সম্পর্কে জানা যাবে। পর্যটন নিয়ে ব্যাবসায়িক পরিকল্পনা করা আরো সহজ হবে। একই সঙ্গে পর্যটনে আমাদের কোন খাতটি দুর্বল, কোনটি সবল তাও চিহ্নিত হবে। শুধু বিদেশি পর্যটক নয়, বাংলাদেশের নাগরিকরা প্রতিবছর অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাতে কত ব্যয় করে এবং প্রতিবছর কতজন দেশের ভেতরে ভ্রমণ করে তা বের করা যাবে।

তবে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) দাবি, পর্যটকদের সঠিক পরিসংখ্যান নির্ণয়ে ২০১২ সালে একবার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ ব্যাংক, ইমিগ্রেশন পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহায়তা না পাওয়ায় তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নিখিল রঞ্জন রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ডিপেন্ডেন্সি ফ্যাক্টরে আটকে আছি। এসবির কাছ থেকে পর্যটকের তথ্য পাচ্ছি না। আমরা টিএসএর কাজ শেষ করতে পারিনি, তবে ডাটা বেইসের কাজ শুরু করেছি। এ জন্য সফটওয়্যার ডেভেলপ করা হবে। আমি যদি বোর্ডের দায়িত্বে থাকি চলতি অর্থবছরেই এটা করব। এ ছাড়া আমরা বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কিছু গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেছি। পর্যটনকে এগিয়ে নিতে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে একযোগে কাজ করতে হবে।’

গবেষণা কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিটিবির উপপরিচালক এ কে এম রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করেছি। কমিউনিটি, রিভারাইন, হেরিটেজ, অ্যাডভেঞ্চার, ট্যুরিস্ট স্যাটিসফেকশন—এই পাঁচটি বিষয়ের ওপর ছোট পরিসরেও গবেষণা হলে আমরা একটা ধারণা পাব। আমাদের মাস্টারপ্ল্যান তৈরির আগে এসব তথ্য কাজে দেবে।’

তবে তথ্যের আগে পর্যটন পণ্য ও সেবার মান উন্নয়ন বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. নাজনিন আহমেদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যটনে আমাদের অনেক সম্ভাবনা আছে। তা কাজে লাগাতে অবশ্যই পর্যটন গন্তব্যগুলোকে প্রডাক্ট তৈরি করতে হবে। আমি কয়েক দিন আগে বান্দরবানের নীলগিরি ঘুরে এলাম। সেখানে টয়লেট সুবিধা নেই বললেই চলে। আমরা যদি পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যথাযথ উন্নয়ন করতে পারি তাহলে অভ্যন্তরীণ বিদেশি সব পর্যটকই আকৃষ্ট হবে।’

তিনি বলেন, ‘বিপণনের আগে আমাদের পর্যটন পণ্যগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। পরিসংখ্যান ব্যবস্থাপনাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটন খাতের বিনিয়োগ অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি হতে হবে। এই ব্যবসায় বিনিয়োগের পরপরই লাভ করার সুযোগ কম।’



মন্তব্য