kalerkantho


পোল্যান্ডে মুসলমানদের কর্মতৎপরতা

মাহফুয আহমদ

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



পোল্যান্ড ইউরোপ মহাদেশের মধ্যস্থলের একটি রাষ্ট্র। রাজধানীর নাম ওয়ারশ।

এর পশ্চিমে জার্মানি, দক্ষিণে চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া, পূর্বে ইউক্রেন ও বেলারুশ এবং উত্তরে বাল্টিক সাগর, লিথুয়ানিয়া ও রাশিয়া অবস্থিত।

পোল্যান্ডে মুসলমানদের অবস্থা ও অবস্থান

তিন লাখ ১২ হাজার ৬৭৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট পোল্যান্ড ইউরোপের নবম বৃহত্তম দেশ। চার কোটি জন-অধ্যুষিত এ দেশে মুসলমানদের সংখ্যা ৩০ হাজার। তার মধ্যে পাঁচ হাজার তাতারিয়ান, বাকি ২৫ হাজার অভিবাসী। তাতার জনগোষ্ঠী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অনুসারী। মিসর, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, আলজেরিয়া, ইরাক, তিউনিসিয়া, বসনিয়া, হার্জেগোভিনা, সোমালিয়া, চেচনিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে মুসলমানরা রাজনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে দেশত্যাগ, উচ্চতর শিক্ষা, উন্নত জীবনের প্রত্যাশা, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি কারণে পোল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে আসতে থাকে। এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী রোমান ক্যাথলিক ও ইসলাম সম্পর্কে তাদের ধারণা অস্পষ্ট।

৭০ বছর বয়সী একজন পোলিশ মুসলমান হালিমা সাচিডেভিচ মুসলিম সংগঠনের প্রধান। হালিমা জানান, ‘বলা যায় আমরা এখানে ক্যাথলিকদের এক সাগরে বাস করছি।

তবু আমরা ভালো আছি এখানে। অন্যান্য ধর্মের জন্য পোল্যান্ড খোলামেলা এক দেশ। তা না হলে সম্ভবত আমাদের এই দেশে এত দীর্ঘদিনের ইতিহাস থাকত না। ’

প্রখ্যাত গবেষক ও ইতিহাসবিদ ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসাইন হাফিজাহুল্লাহু তাঁর এক নিবন্ধে বলেন, ৭০০ বছর ধরে মুসলমানরা পোল্যান্ডের জনগণ ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃৃপক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সঙ্গে ইসলামের অনুসারীদের বাহ্যত কোনো বিবাদ নেই। চতুর্দশ শতাব্দীতে গ্র্যান্ড ডিউক উইহোল্ডের শাসনামলে তাতাররা পোল্যান্ডে থাকার অনুমতি পায় ও সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ডের অখণ্ডতা রক্ষায় মুসলমানরা জার্মানি ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়। জোসেফ বেন (ইউসুফ পাশা) নামের এক জেনারেল পোলিশ সেনাবাহিনীর অধীনে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।

বুহুনিকি এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য রাজা তৃতীয় সোবেস্কি মুসলমানদের একখণ্ড জমি দান করেন। শিক্ষা গ্রহণ, ভূমি ক্রয়, মসজিদ নির্মাণ, বাসস্থান তৈরি, ব্যবসা পরিচালনা ও স্থানীয় মেয়েদের বিবাহ করার ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য সুযোগ অবারিত হয়। বুহুনিকি ও কুরুসজিনিয়ানিতে অবস্থিত মসজিদ দুটি তুলনামূলকভাবে অতি প্রাচীন। বিয়ালিস্টকে রয়েছে একটি ইসলামী কেন্দ্র, যেখানে মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ১৮০০। পোল্যান্ডে জন্ম নেওয়া বহু মুসলমান ধীরে ধীরে শিক্ষা, প্রশাসনসহ বিভিন্ন বিভাগে ঢুকে যাচ্ছে। ড. আলী মিসকভজিস বিয়ালিস্টক বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ড. সলিম চাসভিজেউক্স ওয়ারামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। রাজধানী ওয়ারশে মুসলমানদের রয়েছে নিজস্ব মসজিদ, কোরআন শিক্ষাকেন্দ্র, হালাল খাদ্যের স্টল ও কবরস্থান। রাজধানীতে অবস্থানকারী পাঁচ হাজার মুসলমানের মধ্যে বেশির ভাগই উচ্চ শিক্ষিত। পোলিশ ভাষায় এরই মধ্যে পবিত্র কোরআনের একটি অনুবাদ, ‘ইমাম নাওয়ায়ির ৪০টি হাদিস’ নামক একটি হাদিসগ্রন্থের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা বেরিয়েছে। পোজনান এলাকায় কোনো মসজিদ না থাকলেও মুসলমানরা স্থানীয় ছাত্রাবাসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে।

পোল্যান্ডে মুসলমানদের ধর্মীয় কার্যক্রম

মুসলিম তাতাররা তাদের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে পোল্যান্ডের জীবনধারার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম হয়। তারা তাদের মাতৃভাষা ত্যাগ করে স্লোভাকিয়ান বাকরীতি গ্রহণ করে। এ দেশে দাওয়াতি তৎপরতা চালাতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। আধ্যাত্মিক শান্তির অন্বেষায় পোল যুবক, শিল্পী ও ছাত্ররা ইসলামের দিকে ক্রমেই ঝুঁকে পড়ছে।

পোল্যান্ডে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের মধ্যে ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পোলিশ মুসলিম ইউনিয়ন ও ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম স্টুডেন্টস সোসাইটির কর্মতৎপরতা বেশ চোখে পড়ার মতো। পোলিশ মুসলিম ইউনিয়নের তত্ত্বাবধানে কোরআন, হাদিস, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশের লক্ষ্যে পোলিশ ও ইংরেজি ভাষায় বিভিন্ন ম্যাগাজিন বের হয় নিয়মিত। তার মধ্যে ‘মুসলিম ওয়ার্ল্ড রিভিউ’, মাসিক ‘ইসলামিক ম্যাগাজিন’, ‘আলিফ ম্যাগাজিন’ অন্যতম। পোলিশ ও ইংরেজি ভাষায় রয়েছে তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট : http://www.planetaislam.com, http://www.islam.pl.com

মুসলিম স্টুডেন্টস সোসাইটি মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বেশ কিছু প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র চালু করে। সোসাইটির ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর বিভিন্ন উপলক্ষে মাহফিল, সেমিনার, সংলাপ ও আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনটি এরই মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ২২টি গ্রন্থ, ‘আল-হাদারা’ নামক একটি আরবি ত্রৈমাসিক এবং ‘হিকমা’ নামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। মুসলিম ছাত্রদের মাদরাসা ও স্কুলে পড়ালেখায় উদ্বুদ্ধকরণ ও ভর্তির ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া সোসাইটির অন্যতম কর্মসূচি। স্কলারদের মাধ্যমে পোলিশ ভাষায় পবিত্র কোরআনের অনুবাদসহ একটি নির্ভরযোগ্য তাফসির প্রকাশ, রাজধানী ওয়ারশে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন, ইসলামী গ্রন্থে সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের নেতারা সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। পোল্যান্ডের এই ইতিবাচক পরিস্থিতি পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত মুসলমানদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করে।

পোল্যান্ডে বাংলাদেশি প্রবাসী

পোল্যান্ড মধ্য ইউরোপের এমন এক দেশ, যেখানে বাংলাদেশিদের পরিচয় উদ্যোক্তা ও চাকরিদাতা হিসেবে। এখানে সহজেই এবং অল্প পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করার সুবিধা থাকায় বাংলাদেশিদের জন্য একটি আদর্শ দেশ হয়ে উঠছে পোল্যান্ড। যদিও এখানের বেশির ভাগ বাংলাদেশিরই পোলিশ স্ত্রী আছে, কিন্তু ধীরে ধীরে বাংলাদেশি পরিবারের সংখ্যাও বাড়ছে।

গত ২৩ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে প্রকাশিত দৈনিক যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মী নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে পোল্যান্ড। এ লক্ষ্যে একটি যৌথ স্টাডি গ্রুপ গঠন করতে একমত হয়েছে দুই দেশ। পোল্যান্ড সফরকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহিরয়ার  আলমের সঙ্গে দেশটির পরিবার, শ্রম ও সামাজিক কল্যাণমন্ত্রী আলজাবিতা রাফালাস্কার মধ্যে এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়।

লেখক : আলোচক, ইকরা টিভি, লন্ডন


মন্তব্য