kalerkantho


প্রযুক্তির যুগে সন্তানের প্রতিপালন

জসিম বিন শফিক

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



প্রযুক্তির যুগে সন্তানের প্রতিপালন

প্রযুক্তির ঢেউ অপ্রতিরোধ্য গতিতে আছড়ে পড়ছে সবার দোরগোড়ায়। একে কাটিয়ে সামনে এগোনো প্রায় অসম্ভব।

তাইতো আজকাল ছোট ছোট বাচ্চার হাতে শোভা পায় স্মার্টফোন। বাসায় টিভি থাকা মামুলি ব্যাপার। প্রযুক্তির অন্যান্য আইটেমের সঙ্গেও আমাদের সন্তানদের দারুণ সখ্য।

প্রযুক্তি গলায় লাগানোর ফল কিন্তু ভালো আসেনি। শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের সন্তানরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, আট থেকে ১৪ বছর বয়সের শিশুদের চোখের সমস্যা বাড়ছে। অতিরিক্ত গেম খেলা ও টিভি দেখার কারণে শিশুদের চোখের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর এক জরিপ অনুযায়ী, ঢাকায় স্কুলগামী শিশুদের ৭৭ শতাংশ পর্নোগ্রাফি দেখে! মাঠে খেলাধুলার পরিবর্তে শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকে স্মার্টফোনের ভিডিও গেমসে, যে গেমগুলোর বেশির ভাগজুড়েই থাকে হিংস্রতা, মারামারি, যুদ্ধ, দখল ইত্যাদি। এমন ভিডিও গেমস শিশুদের ওপর মানসিক প্রভাব ফেলে।

তারা সহিংসতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। পরিবার ও সমাজের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। তারা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। ইন্টারনেটের কল্যাণে অশ্লীলতার দুনিয়া থাকে হাতের মুঠোয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাই কেউ কেউ কচি বয়সেই অনৈতিক সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়ছে। বাড়ছে অপরাধ। দেখা দিচ্ছে মূল্যবোধের সংকট।

প্রিয় অভিভাবক! আপনার শিশুর প্রতিপালন প্রশ্নে আপনার দায়িত্ব ও জবাবদিহি আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিজনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো। ’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)

প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর সবাই তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে। ইমাম একজন দায়িত্বশীল। তিনি তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। পুরুষ দায়িত্বশীল তার পরিবারের। সে জিজ্ঞাসিত হবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে। নারী দায়িত্বশীল তঁর স্বামীর গৃহের (তার সম্পদ ও সন্তানের)। সে জিজ্ঞাসিত হবে তার দায়িত্ব সম্পর্কে। ভৃত্যও একজন দায়িত্বশীল, সে জিজ্ঞাসিত হবে তার মুনিবের সম্পদ সম্পর্কে। এককথায় তোমরা সবাই দায়িত্বশীল, আর সবাই জিজ্ঞাসিত হবে সে দায়িত্ব সম্পর্কে। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১৩৮; তিরমিজি, হাদিস : ১৭০৫)

তাহলে ভাবুন! আল্লাহ ও শেষ নবীকে স্বীকারকারী আপনার নিষ্পাপ শিশু—যাকে ইসলামের বিধিবিধান জানানো উচিত, যাকে ইসলামের নীতি-আদর্শের ওপর আমল করার শিক্ষা দেওয়া উচিত, তাকে আপনি কী শেখাচ্ছেন? কিভাবে তাকে গড়ে তুলছেন?

তাকে কখনো কাছে ডেকে বুঝিয়েছেন যে চাকচিক্যময় এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। সুতরাং কিছুদিনের নিশ্চিন্ত জীবনযাপনের জন্য আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা যাবে না। ওই মাহবুবের অন্তরে আঘাত করা যাবে না, যিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের কথাই ভাবতেন।

প্রযুক্তিতে ভর করে সন্তান যেন পাপের পথে পা বাড়াতে না পারে, সে জন্য আপনি এই পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন—

এক. তার অনলাইন গতিবিধি নজরে রাখুন। বাসায় কম্পিউটার, ইন্টারনেট কানেকশন খোলামেলা জায়গায় রাখুন। যেন আপনার অগোচরে অনলাইনে উত্তেজক বা বেআইনি বিষয়বস্তু খোঁজার সুযোগ না পায়।

দুই. সে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে কি না খেয়াল রাখুন। দরজা বন্ধ একটা রুম স্থায়িভাবে বরাদ্দ দেবেন না। বলে রাখুন, কোনো প্রয়োজনে বা বাসায় মেহমান এলে তাকে রুম ছেড়ে দিতে হবে।

তিন.  বাসার বাইরে সে কাদের সঙ্গে মেশে, তা খেয়াল করুন।

চার. তাকে পর্যাপ্ত সময় দিন। তাকে নিয়ে বেড়াতে যান। বন্ধুর মতো আচরণ করুন।

পাঁচ. পড়ালেখার তদারকি করুন। পড়ালেখার প্রতি মনোযোগী হলে অন্য অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের প্রতি মনোযোগ কমতে বাধ্য।

ছয়. আখলাক-চরিত্র গঠনে সহায়ক ও জ্ঞান-বিজ্ঞান সংবলিত বই পড়তে উৎসাহিত করুন।

তবে শুধু এসবই যথেষ্ট নয়, সন্তানকে সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সবার আগে তার অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা জাগ্রত করুন। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশনা বোঝান। তাকে কোরআন শেখান। অজু করা ও নামাজ আদায় করা শেখান। কালিমা শেখান। আল্লাহর কাছে দোয়া করতে শেখান। নরম স্বরে কথা বলা শেখান। মা-বাবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা শেখান। কথায় ও কাজে সত্যবাদী হওয়া শেখান। অন্যথায় প্রযুক্তির দুনিয়ায় আপনার সন্তান পথ হারাতে পারে। এই পথবিচ্যুতি তার ইহকাল ও পরকালে অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। হুঁশিয়ার!

লেখক : ইসলামী সংগীতশিল্পী ও গবেষক


মন্তব্য