kalerkantho


মতপার্থক্য যেন মনোমালিন্যে রূপ না নেয়

মাহফুয আহমদ

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে, তবে কখনো মনোমালিন্য না হওয়া চাই। আমরা জানি, সাহাবি, তাবেয়ি এবং পুণ্যবান পূর্বসূরিদের সময়ও এমন শাখাগত মাসায়েল নিয়ে ইখতিলাফ বা মতবিরোধ বিরাজমান ছিল। কিন্তু তাঁদের মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়নি।

নবীজি (সা.) আহজাব থেকে ফিরে সাহাবায়ে কেরামের একটি জামাতকে বনি কুরাইজায় এই বলে পাঠালেন যে তোমাদের কেউ যেন বনি কুরাইজায় না পৌঁছা পর্যন্ত আসরের নামাজ না পড়ে। কিন্তু ঘটনাক্রমে সেখানে পৌঁছতে দেরি হওয়ায় পথিমধ্যে আসরের নামাজের সময় ঘনিয়ে আসে। তখন একদল সাহাবি [রাসুল (সা.)-এর আদেশের প্রতি লক্ষ করে] বললেন, আমরা বনি কুরাইজায় পৌঁছার আগে আসরের নামাজ আদায় করব না। কিন্তু আরেক দল সাহাবি [রাসুল (সা.)-এর আদেশের উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ করে] বললেন, আমরা আসরের নামাজ রাস্তায় পড়ে নেব। কেননা রাসুল (সা.) আমাদের এই নির্দেশনা আক্ষরিক নয়। (বরং রাসুলের উদ্দেশ্য হলো, আমরা যেন অতিদ্রুত বনি কুরাইজায় যাই এবং আসরের নামাজ সেখানে গিয়ে পড়ি। কিন্তু আমাদের পৌঁছতে দেরি হয়ে যায়। তাই আসরের নামাজ কাজা করব না।) এ ঘটনা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানানো হলে তিনি কোনো দলকেই তিরস্কার করেননি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৮৩৫) এখানে আদেশ ও আদেশদাতা একই হওয়া সত্ত্বেও উপলব্ধি ভিন্ন হওয়ায় আদেশ পালনে মতভেদ দেখা দিয়েছে।

ইমাম মালেক (রহ.) (মৃত ১৭৯ হিজরি) থেকে একাধিক সূত্রে বর্ণিত, তিনি যখন ‘মুয়াত্তা’ সংকলন করেন, তখন খলিফা মানসুর (কোনো বর্ণনামতে অন্য খলিফা) আরজ করেন, আপনি অনুমতি দিলে আমি প্রতিটি দেশের গভর্নরের কাছে এ মর্মে লিখে পাঠাব যে সবাই যেন এই কিতাবের হাদিস অনুযায়ী আমল করেন এবং বিচারকার্য সম্পাদন করেন। ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) এই উম্মাহকে নিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন। জিহাদের জন্য তিনি বাহিনী পাঠাতেন, নিজেও বের হতেন। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় তেমন বেশি দেশ বিজিত হয়নি। তাঁর পরে হজরত আবু বকর (রা.) খলিফা নির্বাচিত হন; তখনো বিজিত অঞ্চলের সংখ্যা কম ছিল, তারপর হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খিলাফতকালে বহু দেশ বিজিত হয়। আর তখন ওই সব অঞ্চলের অধিবাসীদের দ্বিনি তালিমের জন্য সাহাবায়ে কেরামকে মুয়াল্লিম ও শিক্ষক হিসেবে পাঠানো ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। সুতরাং প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমানরা স্বীয় মুয়াল্লিম সাহাবি থেকে যা শুনেছেন, শিখেছেন তার ওপরই আমল করতে লাগলেন। এ নিয়মই পরবর্তী সময়ে অব্যাহত ছিল। অতএব, এখন যদি আপনি লোকদের নিজ অঞ্চলের আমল ছাড়া অজানা নতুন কোনো আমলের দিকে আহ্বান করেন, তাহলে তারা এটাকে কুফরি গণ্য করবে। তাই আপনি প্রতিটি অঞ্চলে প্রচলিত ইলম ও আমলের ওপরই লোকদের ছেড়ে দিন। আর এই ইলম (মুয়াত্তা) নিজের জন্য গ্রহণ করতে পারেন। তখন খলিফা বলেন, আপনি দূরদর্শী কথা বলেছেন।’ [(তাকদিমাতুল জারহি ওয়াত তা’দিল, ইবনে আবি হাতিম, পৃ. ২৯,) (আদাবুল ইখতিলাফ; শায়খ আওয়ামা, পৃ. ৪০-এর সূত্রে) (আততাবাকাতুল কুবরা; ইবনে সা’দ,) (আল জুযউল মুতাম্মিম পৃ. ৪৪০-৪৪১, মদিনা মুনাওয়ারাহ, ১৪০৩ হি.)]

শায়খুল ইসলাম হাফিজ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) (মৃ. ৭২৮ হি.) লিখেছেন, ‘ইজতিহাদি বিষয় নিয়ে বিবাদ-বিসংবাদে লিপ্ত হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। যে অঞ্চলে যে সুন্নত চালু আছে, সেখানে সেভাবেই চলতে দেওয়া উচিত। ভিন্ন কোনো সুন্নত চালু করা ফিতনা সৃষ্টি করার শামিল। এ জন্যই খলিফা হারুনুর রশিদ যখন ইমাম মালেক (রহ.)-এর কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন যে আমি সবাইকে আপনার ‘মুয়াত্তা’-এর হাদিস অনুযায়ী আমল করতে হুকুম জারি করে দিই? ইমাম মালেক (রহ.) তাঁকে বারণ করে বলেন, এটা ঠিক হবে না; কারণ সাহাবায়ে কেরাম দুনিয়ার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছিলেন এবং প্রতিটি জনপদের কাছে এরই মধ্যে কিছু হাদিস পৌঁছে গেছে।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া; ইবনে তাইমিয়া, ৩০/৭৯)

আমাদের কোনো কোনো বন্ধু হজ ও ওমরাহ থেকে ফিরে জিজ্ঞেস করেন যে আমাদের নামাজ এবং আরবদের নামাজের মধ্যে এই পার্থক্য কেন? যেন ওই সব বন্ধু সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন যে কোনটা তারা অনুসরণ করবেন! এ প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে আমাদের উপর্যুক্ত বনি কুরাইজায় আসর আদায়সংক্রান্ত সহিহ মুসলিমের হাদিস, খলিফা মানসুরকে দেওয়া ইমাম মালেকের জবাব এবং ইবনে তাইমিয়ার উক্তি ভালো করে স্মরণ রাখতে হবে। তা ছাড়া নিম্নোক্ত বিষয়গুলোও অনুধাবন করতে হবে—

এক. বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে মহানবী (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘হে লোক সকল! তোমাদের প্রতিপালক এক। তোমাদের আদিপিতা আদম এক। কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আর না আছে কোনো আরবের ওপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব। কোনো কালোর ওপর কোনো সাদার শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আর না আছে কোনো সাদার ওপর কোনো কালোর শ্রেষ্ঠত্ব, তবে তাকওয়া ছাড়া।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২২৯৭৮)

দুই. মুসলিম উম্মাহর কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হাদিসের প্রসিদ্ধ কিতাবগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে প্রায় বেশির ভাগই আরবের বাইরে অনারব মুহাদ্দিস কর্তৃক সংকলিত। ইমাম বুখারি (রহ.) উজবেকিস্তানের, ইমাম মুসলিম (রহ.) ইরানের নিশাপুরের, ইমাম নাসায়ি (রহ.) তুর্কমেনিস্তানের, ইমাম আবু দাউদ (রহ.) ইরানের সিজিস্তানের (খোরাসান), ইমাম তিরমিজি (রহ.) উজবেকিস্তানের, ইমাম ইবনে মাজাহ (রহ.) ইরানের কাজওয়িনের।

তিন. মক্কা ও মদিনায় কিন্তু সবাই একই নিয়মে নামাজ পড়ে না। কেউ নামাজে হাত বাঁধে, কেউ বাঁধে না, কেউ নামাজের প্রতিটি ওঠা-নামায় হাত তোলে, কেউ নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে তোলে আবার কেউ তাকবিরে তাহরিমা ছাড়া হাত তোলে না ইত্যাকার নানা পদ্ধতি। এসব বৈচিত্র্য বা সুন্নাহর বিভিন্নতা মূলত এই উম্মাহর সূচনালগ্ন থেকে আজ অবধি স্বীকৃত ও অনুসৃত হয়ে আসছে। একজন এক সুন্নাহর ওপর আমল করে থাকলে অন্যজন সেই সুন্নাহর ওপর আপত্তি উঠাবেন না। বরং প্রমাণিত যেকোনো সুন্নাহর ওপর আপত্তি করা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বৈ কিছু নয়।

চার. এই আলোচনার উদ্দেশ্য কাউকে তাচ্ছিল্য করা নয়। বরং এই বক্তব্যের প্রতিপাদ্য হলো, আমরা যেন সুন্নাহ অনুসরণের স্বীকৃত এই বৈচিত্র্য ও বিভিন্নতা বুঝে পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে নিবৃত্ত হই এবং উম্মাহর এই ক্রান্তিকালে ঐক্যের রজ্জু আঁকড়ে ধরে রাখতে পারি।

সময় এখন মৌলিক বিষয় নিয়ে চিন্তা করার, গবেষণা ও প্রচার করার। শাখাগত মাসায়েল নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় এটি নয়। এসব বিষয় তো সালাফের দ্বারা পর্যালোচিত, সংকলিত ও মীমাংসিত হয়ে গেছে। সময় এখন ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব দুনিয়াবাসীর সামনে তুলে ধরার। সময় এখন সর্বযুগে ইসলামের যথার্থতা লোকদের বুঝিয়ে দেওয়ার। সময় এখন ইসলাম ছাড়া শান্তি ও নিরাপত্তার বিকল্প কোনো যে পথ নেই—তা বিশ্লেষণ করার। সময় এখন আল্লাহ তাআলা, আল কোরআন, ইসলাম, ইসলামের নবী (সা.), আল হাদিস ও ইসলামী শরিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত প্রপাগান্ডাগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক, যুক্তিনির্ভর, তথ্য ও উপাত্তসংবলিত খণ্ডন পেশ করার।

আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেন, ‘আর যারা কাফির, তারা পারস্পরিক সহযোগী, বন্ধু। তোমরা যদি এমন ব্যবস্থা না করো, তাহলে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বিস্তার লাভ করবে এবং দেশময় বড়ই অকল্যাণ হবে।’ (সুরা : আল আনফাল, আয়াত : ৭৩)

লেখক : আলোচক, ইকরা টিভি, লন্ডন


মন্তব্য