kalerkantho


তুরাগতীরের ডাক এসেছে

রায়হান রাশেদ

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নিস্তব্ধ রাত, দ্রুত এগিয়ে চলছে ভোরের দিকে। শীত রাতের কুয়াশা পড়ছে নিরন্তর। শিশিরে ভিজে আছে টঙ্গীর ঘরবাড়ি, বৃক্ষ ও জমিন। হালকা ভিজে আছে ইজতেমা চটের ধূসর শামিয়ানা। মাঠজুড়ে তারের ওপর ঝুলতে থাকা টেনিস বলের মতো বাতিগুলো সোনালি আলো ছড়াচ্ছে মন্থরগতিতে। তুরাগতীরের নিশাচর পাখিরা পাখা ঝাপটে উড়ে গেল দূর-বহুদূরে। রাত তখন ৪টা পার হয়ে গেছে। প্রতিবারের মতো ইজতেমার মাইকগুলো গেয়ে উঠল রাব্বি কারিমের তারিফ। সুর উঠল ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ধ্বনির। এ তারিফ রাতের নির্জনতায় ভর করে চলে গেল খোদার আরশে। আল্লাহপ্রেমীরা জেগে উঠেছে আপন মালিকের কুদরতি পায়ে চুমো খেতে। তাহাজ্জুদ নামাজের পর মুসলমানদের প্রধানতম সংস্কৃতি আজানের ধ্বনি সুর তুলল টঙ্গীর বিস্তীর্ণ চরের সবখানে। আজ জুমাবার। ফজর নামাজের পর আম বয়ানের মাধ্যমে শুরু হচ্ছে ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব।

ইজতেমা পৃথিবীর ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। আলোর আকাশে প্রদীপ্ত মশাল। এ মশালের উদ্ভাসিত পবিত্র আলোয় আলোকিত হয় পৃথিবী। পৃথিবীর মানুষ। ইজতেমার ফেরিওয়ালারা পৃথিবীর পাড়া-মহল্লায় দ্বিনের বাণী ফেরি করে বেড়ায় নিঃস্বার্থে। ইজতেমা দ্বিন প্রচারের মৌয়াল। রাসুলের আদর্শ সমুন্নত রাখার খুঁটি। রাসুল (সা.)-এর নির্দেশিত বাণীর হুকুম পালন করছেন ইজতেমার ব্যবস্থাপকরা। 

ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণে রাসুল (সা.)-এর ঘোষণা : ‘উপস্থিত সবাই আমার বাণী যেন অনুপস্থিত সবার কাছে পৌঁছে দেয়।’ এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাহাবায়ে কেরাম পৃথিবীর দিক-দিগন্তে ইসলামের বাণী নিয়ে ছড়িয়ে পড়েন। তাঁরা পেছনে ফিরে তাকাননি। ভাবেননি দেশের মাটি, মানুষ, পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের কথা। মা-বাবা, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ের ভালোবাসা বিসর্জন দিয়েছেন অবলীলায়। তাঁদের মেহনতের বদলায় মানুষ খুঁজে পেয়েছে মুক্তির পথ।

মানুষের মধ্যে দ্বিন পৌঁছানোর পরম্পরায় নবী ও সাহাবিদের আদর্শ বুকে লালন করে ভারতের সূর্যসন্তান মাওলানা ইলিয়াছ (রহ.) ১৯১৫ সালে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ শুরু করেন। প্রাথমিক অবস্থায় দিনমজুরদের সারা দিন ইসলামের হৃদয়নিংড়ানো বাণী শুনিয়ে বিনা পরিশ্রমে রোজগারের মাইনে দিয়ে দিতেন। তাদের দ্বিনের সঠিক পথ বোঝাতেন। রূপান্তরিত করতেন ইসলামের আদর্শ শিক্ষায়। তাঁর আত্মত্যাগ ও কঠোর তপস্যার বদৌলতে আজ ধরণির সব মহলে দ্বিনের ব্যাপক প্রচার-প্রসার চলছে। পথহারা মানুষ সুন্দর ও সঠিক পথ খুঁজে পাচ্ছে। নিষিদ্ধ অন্ধকার জগৎ থেকে আলোর দিকে ফিরে আসছে মানব-মানবী। বিপন্ন জীবনে দিশা পাচ্ছে আদর্শ আশ্রয়স্থলের। চিরায়ত সত্য ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে অমুসলিমরা।

দাওয়াত ও তাবলিগের মেহনত চলছে আকাশ, মর্ত, সাগর-মহাসাগর তথা পৃথিবীর নানা প্রান্তে। তাবলিগ চলছে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল নিয়ম-নীতির অধীনে। নিজ শ্রম বিকাশ আর আপন জান-মালের খরচে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে মুক্তির সুমহান ইসলামের সন্ধান দিচ্ছেন তাবলিগের লোকজন। মানুষের হেদায়েতের আকাঙ্ক্ষায় গভীর রাতে অশ্রু ঝরান জায়নামাজে। নিজ জীবনের একমাত্র সহায়-সম্বল, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য স্থির করেন শুধু মানুষকে সৎ আলোকবর্তিকার পথ দেখানোর জন্য। তাদের শান্তির মিছিলে অংশীদার করার প্রয়োজনে।

মানুষের মধ্যে দ্বিন ইসলামকে বদ্ধমূল করার লক্ষ্যে তাঁরা প্রতিবছর আয়োজন করেন বিশ্ব মুসলিম মিলনমেলার বিশ্ব ইজতেমা। এটি যেন বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার সংসদ। এ মেলায় ধনী-গরিবের মধ্যে কোনো তফাত নেই। ভেদাভেদ নেই ছোট-বড়র। এ মেলায় সবাইকে এক পথে চলতে হবে। এক কাতারে হাঁটতে হবে, দাঁড়াতে হবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। খোলা আকাশের নিচে, শিশিরভেজা রাতে, ছাদহীন জমিনে মাটির ওপর ঘুমাতে হবে। মুখে আল্লাহর জিকির, অন্তরে ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও মানবমুক্তির ফিকির নিয়ে সময় পার করতে হবে। এ মেলার গগনে অনুরণন ওঠে আল্লাহর ধ্বনির। পঠিত হয় আদর্শ মানব হওয়ার জাদুমন্ত্র। সব মুসলমান ভাই ভাই হওয়ার চিরায়ত শিক্ষা।

এ বছরের ইজতেমা শুরু হচ্ছে আজ—জুমাবার (প্রথম ধাপ ১২ থেকে ১৪, দ্বিতীয় ধাপ চলবে ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারি)।

বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় আমাদের মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশে। টঙ্গীর তুরাগপারে। এটা আমাদের জন্য বড় আনন্দের বিষয়। বাংলাদেশের গৌরবময় অধ্যায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধনী, গরিব, শিক্ষিত, মূর্খ—সর্বস্তরের জনসাধারণ সাকল্যে সবাই মানুষ গড়ার এ ইজতেমায় আসে। ভিড় জমায় তুরাগপারের বিস্তীর্ণ মাঠে। মুসলমান ভাই ভাই স্লোগানে প্রকম্পিত করে তোলে খোদার আকাশ-জমিন। পৃথিবীর দিক-দিগন্তে বসবাস করা মুসলমানরা ইজতেমায় একসঙ্গে হয়ে আনন্দ আর প্রমোদে গেয়ে ওঠে প্রশংসিত মহাশক্তিধর রবের গান। কত দিন পর ভাই ভাইয়ের দেখা। এ যে এক স্বর্গের সুখ। মহা আমোদের তিথি। সবার মনে পড়ে যায় এক সুতার বন্ধন থেকে ছিঁড়ে আসা রুহ জগতের কথা।

বাংলাদেশের সব বয়সের মুসলমান তুরাগপারের ইজতেমায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেয়। শত কষ্ট সত্ত্বেও ইসলামের ভালোবাসায় নিজ জীবন গড়ার প্রয়োজনে কাঁথা, বালিশ, থালা-বাসন নিয়ে লোকজন হাজির হয় তুরাগপারের ইজতেমায়। দিনাতিপাত করে মাওলার ভালোবাসার আশায়। তার প্রেমের আকাঙ্ক্ষায় বুক বাঁধে। সহজ-সরলতার প্রণয়ে ভরে যায় তাদের দেহ-মন। অন্যায় ও জুলুম ভুলে পৃথিবীর খাঁটি মানুষ হয়ে যায়। কত মানুষের পা কত শতজনের শরীরে, বিছানায় বেখেয়ালে লেগে যায়; কিন্তু কেউ কিছু বলে না। উল্টো আবার মমতামাখা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, ‘ভাই ব্যথা পেয়েছেন? কোথাও লাগেনি তো।’ এমন সহনশীলতা, সহমর্মিতার পরিবেশ আর কোথাও দেখা যায় না। আমাদের চারপাশের সন্ত্রাসী ও অপরাধীরাও বিশ্ব ইজতেমার ছোঁয়ায় শান্তিপ্রিয় মানুষ হয়ে যায়।

তাবলিগ অপরাধমুক্ত ও শান্তিপ্রিয় পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়।

 

লেখক : ইসলামী গবেষক


মন্তব্য