kalerkantho


মাহে রমজানের কেন এত মর্যাদা

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

২৫ মে, ২০১৮ ০০:০০



মাহে রমজানের কেন এত মর্যাদা

আরবি নবম মাস হলো রমজান। এ মাস অন্য মাসের তুলনায় অধিক মর্যাদাবান। এ মাস এত বেশি মর্যাদাবান হওয়ার কারণ তিনটি। ১. এ মাসে কোরআন মজিদ নাজিল করা হয়েছে, ২. এ মাসে রোজা ফরজ করা হয়েছে, ৩. এ মাসে রয়েছে পবিত্র রজনী লাইলাতুল কদর।

কোরআন নাজিল : কোরআন মজিদসহ সব আসমানি গ্রন্থ এ মাসে নাজিল করা হয়। কোরআন মজিদ ২৪ রমজান, তাওরাত ৬ রমজান, জাবুর ১৮ রমজান এবং ইরজিল ১৩ রমজান নাজিল হয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘রমজান এমন মাস, যে মাসে কোরআন নাজিল করা হয়েছে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৫)

মহানবী (সা.)-এর শ্রেষ্ঠ মোজেজা এ কোরআন মাজিদ। আল্লাহ তাআলা সব নবী-রাসুলকে কম-বেশি অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করেছেন। তবে অন্য নবী-রাসুলের মোজেজার সঙ্গে আমাদের রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মোজেজার পার্থক্য হলো, তাদের মোজেজা ছিল ‘আমলি’। আমলের স্বভাবগত নিয়ম হলো, আমলকারীর ইন্তিকালের সঙ্গে সঙ্গে সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। আর এ জন্য আগের নবী-রাসুলদের ইন্তিকালের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের সব মোজেজাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন আর হজরত নুহ (আ.)-এর নৌকা নেই, হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর মৃত পাখিকে জীবিত করার মোজেজা নেই, হজরত সোলায়মান (আ.)-এর উড়ন্ত আসন নেই। হজরত মুসা (আ.)-এর  লাঠির মোজেজা নেই, হজরত সালেহ (্আ.)-এর উট নেই। এভাবে বর্তমানে কোনো নবী-রাসুলের মোজেজাই অবশিষ্ট নেই। পক্ষান্তরে বিশ্বনবী (সা.)-এর শ্রেষ্ঠ মোজেজা কোরআন মজিদের প্রতিটি আয়াত, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষর, এমনকি এর প্রতিটি হরকত তথা জের, যবর, পেশ, তিলাওয়াতপদ্ধতি ইত্যাদি অবিকৃত অবস্থায় পৃথিবীতে বিদ্যমান রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। তাই মহানবী (সা.)-এর মোজেজা জীবন্ত ও চিরন্তন। তার ধ্বংস নেই, ক্ষয় নেই ও লয় নেই। শুধু কাগজে-কলমে নয়, লাখ লাখ হাফেজে কোরআনের সিনায় রক্ষিত আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত রক্ষিত থাকবে। এর কারণ হলো, আল্লাহ নিজেই তা সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমিই কোরআন নাজিল করেছি এবং আমিই তার সংরক্ষণকারী।’ (সুরা : হিজর আয়াত : ৯)

কোরআন মজিদ এমন কিতাব, যার কিয়দংশ পরিমাণ রচনা করা মানবশক্তির আওতাবহির্ভূত। আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন, ‘হে হাবিব! আপনি বলুন, যদি সমব মানব-দানব সম্মিলিতভাবে এ কোরআনের মতো একটি কিতাব রচনা করতে চেষ্টা করো, তবে এর মতো কিতাব রচনা করতে পারবে না। যদিও তারা পরস্পর একে অন্যের সহায়ক হয় (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৮৮) 

অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘হে রাসুল! কাফিররা কি বলে যে আপনি এ কিতাব নিজে রচনা করেছেন? আপনি তাদের বলে দিন, তাহলে তোমরাও তার মতো মাত্র ১০টি সুরা রচনা করো।’ ( সুরা : হুদ, আয়াত : ১৩)

কোরআন মজিদের শৈল্পিক সৌন্দর্য ভাষাবিদদের বিস্মিত করে। তার ভাষার লালিত্য, শব্দ চয়ন, ভাবের মিল, শব্দ যোজনা অতুলনীয়। মানুষ যখন কোনো কিছু রচনা করে, তা হয়তো গদ্য বা পদ্য হয়। কিন্তু কোরআন মজিদ গদ্যও নয়, পদ্যও নয়। গদ্যের মতোও পড়া যায়, আবার পদ্যের মতোও পড়া যায়। কোরআন মজিদের বিষয়বস্তু এমন, যা পৃথিবীর কোনো গ্রন্থে নেই। তাতে রয়েছে জান্নাত, জাহান্নাম, আসমান, জমিন, অন্তরীক্ষ, আরশ, কুরসি, সৃষ্টির কাহিনি, সূর্য, গ্রহ, সৌরজগতের তত্ত্ব, আদম সৃষ্টির রহস্য, ফেরেশতা ও জিনজাতির ইতিহাস, প্রাগৈতিহাসিক নবীদের জীবনচরিত এবং নমরুদ, ফেরাউন, হামান, শাদ্দাদ প্রমুখ কাফিরের ইতিবৃত্ত, আসহাবে কাহাফের অবস্থা, জুলকারনাইনের লৌহ প্রাচীর ইত্যাদির বর্ণনা। যিনি ছিলেন উম্মি, যার ছিল না আক্ষরিক কোনো জ্ঞান, তিনি কোরআন মজিদের সংস্পর্শে এসে হয়ে গেলেন বিশ্বের এক নম্বর জ্ঞানী। এতে রয়েছে রুহানি জগৎ, পার্থিব জগৎ ও পারলৌকিক জগতের বিস্তারিত বিবরণ। আরো রয়েছে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনের সব সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান।

সিয়াম : এ মাসে সিয়াম ফরজ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পায়, সে যেন রোজা রাখে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৫)

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের আগের লোকদের ওপর, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৩)

এ মাসের সিয়াম পালন জান্নাত লাভের মাধ্যম। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান রাখে, সালাত কায়েম করে, জাকাত আদায় করে এবং রমজান মাসে সিয়াম পালন করে। আল্লাহর ওপর ওই বান্দার  অধিকার হলো, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো।’ (বুখারি, হাদিস : ২৭৯০)

মহানবী (সা.) আরো বলেন, ‘যখন রমজান আসে, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, আর দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০৭৯০)

রমজান মাসে দোয়া কবুল করা হয়। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘রমজান মাসে প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহর সমীপে যে দোয়া করে থাকে, তা কবুল করা হয়।’ (মুসনাদ আহমাদ : ২/২৫৪)

এ মাসে মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মাহে রমজানে প্রতি রাত ও দিনের বেলায় বহু মানুষকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন এবং প্রতিটি রাত ও দিনে প্রত্যেক মুসলিমের দোয়া কবুল করা হয়।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২/২৫৪)

শবেকদর : মাহে রমজানের সাতাইশে রজনীকে অনেক মনীষী লাইলাতুল কদর বা মহিমান্বিত রজনী বলে আখ্যায়িত করেছেন। মুসলিম শরিফে হজরত উবাই ইবনে কাব বর্ণনা করেছেন, শবেকদর হচ্ছে রমজানের ২৭ তারিখের রাত। ইবনে সামেত বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘লাইলাতুল কদর রমজান মাসের শেষ দশ রাতের বিজোড় রাত—২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাত।’

ইমাম জুহুরি (রহ.) বলেন, এ রাতকে কদরের রজনী বলার কারণ হলো, এ রাত অতীব মূল্যবান, অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন। শেখ আবু বকর ওয়াররাক (রহ.) বলেন, এ পবিত্র রাতে ইবাদতের মাধ্যমে এমন অনেক লোক মান-সম্মান অর্জন করে, যাদের এর আগে কোনো মান-সম্মান ছিল না। ফলে এ রাতকে লাইলাতুল কদর বলা হয়। এ রাতকে লাইলাতুল কদর বলার আরো একটি কারণ হলো, এ রাতে তকদির নির্ধারিত হয়। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হজরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.) বলেন, শবেকদর দুটি। একটিতে বিশ্ব প্রশাসনের বিধি-ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়। এ শবেকদর অনির্দিষ্ট। এক বছর এক রাতে, অন্য বছর অন্য রাতে, এভাবে একেক বছর একেক রাতে হয়ে থাকে। অন্যটি হলো কল্যাণ, বরকত, সওয়াব বা নেক বৃদ্ধি ও ফেরেশতাদের অবতরণ ইত্যাদির জন্য। তা রয়েছে রমজানের শেষ ১০ দিনের বিজোড় রাতগুলোতে। (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা)

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি একে (কোরআনকে) এক পবিত্র রাতে নাজিল করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থির হয়।’ (সুরা : দুখান, আয়াত : ৩-৫)

আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন, ‘আপনি কি জানেন, মহিমান্বিত রজনী কী? মহিমান্বিত রজনী হলো হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এ রাতে ফেরেশতারা ও রুহ তথা জিবরাইল (আ.) অবতীর্ণ হন। প্রত্যেক কাজে তাঁদের রবের অনুমতিক্রমে সালাম সালাম বলে ঘোষণা করেন। আর তা রজনীর ঊষা পর্যন্ত।’ (সুরা : কদর)

লাইলাতুল কদরের ফজিলত তিনটি : যথা—এক. এ রাতে কোরআন নাজিল হয়। দুই. এ রাত হাজার মাস তথা ৮৩ বছর চার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং তিন. এ রাতে হজরত জিবরাইল (আ.) পৃথিবীতে অবতরণ করেন। এ রাতের লক্ষণ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কদরের রজনীর আগের দিবসে সূর্য এমনভাবে উদিত হবে যে এর রশ্মিতে প্রখরতা ও তেজ থাকবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ৭৬২, বুখারি : ২০২১)

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল জামিয়াতুল ফালাহিয়া, ফেনী।


মন্তব্য