kalerkantho

উল্কি আঁকার ক্ষতি

মুহাম্মাদ মিনহাজ উদ্দিন   

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



শরীরে উল্কি বা ট্যাটু আঁকা পশ্চিমা বিশ্বে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ইদানীং আমাদের দেশে এটি অনাহৃত ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন চিত্রশিল্পী, গায়ক ও খেলোয়াড়দের থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নানা রঙের ও নানা ধরনের উল্কি-ট্যাটু ইত্যাদি দেখা যায়। বিশেষত, কিছু অসচেতন তরুণকে এই অহেতুক কাজ পেয়ে বসেছে। এটি মূলত পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসন। জার্মানির একটি জরিপে দেখা গেছে, ৩৫ বছরের কম বয়সী প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের গায়ে ট্যাটু আঁকা আছে। আর হাল জামানায় এসে দেখা যাচ্ছে, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরবি ভাষায় বিভিন্ন প্রকারের উল্কি-ট্যাটু আঁকার প্রবণতা। কিছু লোক আবার কালিমাসহ কোরআন-হাদিসের বিভিন্ন বাণী ট্যাটু আকারে এঁকে এটাকে জায়েজ বানানোর চেষ্টা করছে!

উল্কি কী—তা সংক্ষেপে বলতে গেলে : ‘শরীরের চামড়ায় সুঁই বা এজাতীয় কোনো কিছু দিয়ে ক্ষত করে তাতে বাহারি রং দিয়ে নকশা করা। এ রকম ট্যাটু বা উল্কি সাধারণত পার্মানেন্ট বা স্থায়ী হয়ে থাকে এবং সহজে ওঠানো যায় না।’

স্বাভাবিকভাবে এই উল্কি-ট্যাটু আঁকা হয় বিদ্যুত্চালিত একটি যন্ত্রের সাহায্যে। যেটা দেখতে অনেকটা ডেনটিস্টের ড্রিল মেশিনের মতো। মেশিনের মাথায় রয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম সুঁই। সুঁইয়ের মাথায় রং লাগানো থাকে। প্রতিবার সুঁইকে যখন চামড়ার ভেতরে প্রবেশ করানো হয়, সেই সঙ্গে রংও ভেতরে প্রবেশ করে। রঙের পরিমাণ এক মিলিলিটারেরও কম হয়। চামড়ার যে স্তরে রংটি লাগানো হয় তার নাম ডের্মিস। এই স্তরে যেকোনো রং প্রবেশ করলে তা সারা জীবন থেকে যায়।

উল্কি বা ট্যাটু আঁকার ব্যাপারে ইসলামের বিধান : শরীরে ট্যাটু বা উল্কি আঁকা বেশির ভাগ ফকিহর দৃষ্টিতে হারাম। (হাশিয়াতু ইবনে আবিদিন, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-২৩৯)

কেননা মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক সৌন্দর্য নষ্ট করে কৃত্রিমভাবে সৌন্দর্য সৃষ্টি করা ইসলামে নিষিদ্ধ ও গর্হিত। পাশাপাশি আলাদা চুল লাগানো, ভ্রু কেটে ফেলা ইত্যাদি কঠোরভাবে ইসলামে নিষিদ্ধ। কেননা এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্ট অঙ্গে পরিবর্তন আনা হয়, যা তিনি অপছন্দ করেন। কিয়ামতের দিন তিনি এসব লোককে তাঁর সামনে তাঁর সৃষ্টিতে পরিবর্তন করতে বলবেন।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম কাঠামো দিয়ে।’ (সুরা ত্বিন, আয়াত : ০৪)। অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তারা আল্লাহর সৃষ্টির বিকৃতি করবেই।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১১৯)

হাদিসে শরিফে এসেছে, ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, ‘যেসব নারী নকল চুল ব্যবহার করে, যারা অন্য নারীকে নকল চুল এনে দেয় এবং যেসব নারী উল্কি অঙ্কন করে ও যাদের জন্য করে, রাসুল (সা.) তাদের অভিশাপ দিয়েছেন।’ (বুখারি, হাদিস নম্বর : ৫৫৯৮, মুসলিম, হাদিস নম্বর : ৫৬৯৩)

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যেসব নারী সৌন্দর্যের জন্য উল্কি অঙ্কন করে এবং যাদের জন্য করে এবং যেসব নারী ভ্রু উৎপাটন করে এবং দাঁত ফাঁকা করে, আল্লাহ তাআলা তাদের অভিসম্পাত করেছেন।’ (বুখারি, হাদিস নম্বর : ৫৬০৪)

উল্কি আঁকা অমুসলিমদের সংস্কৃতি। মুসলমানদের জন্য শরীরে উল্কি আঁকার সুযোগ নেই। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।’ (আবু দাউদ, হাদিস নম্বর : ৪০৩১)

মোদ্দাকথা, শখের বসেই হোক কিংবা ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হিসেবে হোক, আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন করার দরুন উল্কি ইত্যাদি আঁকা হারাম। তবে যদি চিকিৎসার জন্য ট্যাটু আঁকার বাস্তবিক প্রয়োজন পড়ে, তখন বৈধ হবে।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, উল্কি আঁকার দরুন বেশ কিছু শারীরিক ক্ষতির সৃষ্টি হয়। শরীরে উল্কি আঁকার কারণে হেপাটাইটিস, টিউবারকিউলোসিস, টিটেনাসের মতো ইত্যাদি রোগের সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, উল্কির রংও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কেননা উল্কির রঙে রাসায়নিক পদার্থ থাকে। তা চামড়ার ভেতরের স্তরে প্রবেশ করে। এর ফলে বিভিন্ন ধরনের অসুখ, এমনকি ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি আছে। (দৈনিক আমাদের সময়, ১১ অক্টোবর ২০১৬)

লেখক : রিসার্চ ফেলো, সেন্টার ফর ইসলামিক থট, বাংলাদেশ।



মন্তব্য