kalerkantho


ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে উচ্চশিক্ষা এখন সময়ের দাবি

যুবায়ের আহমাদ   

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



ভারসাম্যপূর্ণ অর্থব্যবস্থার প্রবর্তন করে মানবতার অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সফল অর্থনীতিবিদ হিসেবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান গড়তে সক্ষম হয়েছিলেন প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। অর্থনৈতিক মন্দার কবল থেকে রক্ষা পেতে তাঁর রেখে যাওয়া সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থার দিকেই ঝুঁকছে আধুনিক বিশ্ব। পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার অপপ্রচারে একসময় মানুষ ধারণা করত, সুদ ছাড়া আর্থিক লেনদেন সম্ভবই নয়; কিন্তু ইউরোপ ও আমেরিকার নামিদামি সুদি ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার এ সময়েও দেশে দেশে গড়ে ওঠা ইসলামী ব্যাংকগুলো দেউলিয়া তো হচ্ছেই না, বরং অর্থনীতিতে তাদের অবস্থান ক্রমেই মজবুত করছে। তা দেখে বিশ্বের অনেক পণ্ডিত ও গবেষকই স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন, সুদবিহীন আর্থিকব্যবস্থাই বেশি স্থিতিশীল। এ বাস্তবতা থেকেই আজ মুসলিম দেশগুলোর সীমানা পেরিয়ে ইউরোপ-আমেরিকারও অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামীকরণের দিকে আগ্রহী হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোকেও নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে ইসলামী ব্যাংকিং। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ইসলামী ব্যাংকিংয়ের এই অগ্রযাত্রাকে অকপটে স্বীকার করছে। আইএমএফ বলছে, বিশ্বজুড়েই ইসলামী ব্যাংক ব্যাপক জনপ্রিয় হচ্ছে এবং এ ধারার ব্যাংকিংয়ের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আইএমএফ ইসলামী ব্যাংকিংসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলেছে, এ খাতে মুনাফা ও লোকসান দুটিই সমানভাবে গ্রহণ করা হয়। এতে কাউকেই খুব বেশি ঝুঁকিতে পড়তে হয় না। ঝুঁকি একেবারেই কম থাকায় গণমানুষ এ ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকছে। ব্যাপকভাবে প্রসারিত হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকিং। আস্থা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে এ খাতে বিশ্বে যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে তাতে এটি অনেক সম্ভাবনাময়। (যায়যায়দিন : ৪ মে, ২০১৫)

লন্ডনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইসলামী ইকোনমিক ফোরামের (WIFE) শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইসলামী অর্থনীতি বা ব্যাংককে বেশি স্থিতিশীল উল্লেখ করে বলেছিলেন, তিনি লন্ডনকে ইসলামী আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্র বানাতে চান। তাঁর সরকার শিগগিরই ‘ইসলামী বন্ড সুকুক’ চালু করবে। ঘোষণা অনুযায়ী, ২৫ জুন ২০১৪ ব্রিটেন সরকার চালু করেছিল ‘ইসলামী বন্ড সুকুক’। (ইনকিলাব, ৩০ জুন ২০১৪)

বাংলাদেশেও ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রতি গণমানুষের আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশের প্রথম ইসলামী ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড’ বিশ্বের শীর্ষ এক হাজার ব্যাংকের তালিকায় স্থান করে নেওয়া একমাত্র বাংলাদেশি ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সদ্যোবিদায়ী চেয়ারম্যান আরাস্তু খান জানিয়েছেন, ‘শুধু ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডেই বর্তমানের এক কোটি ২৫ লাখ গ্রাহক। এই সংখ্যা দেশের যেকোনো ব্যাংকের চেয়েও বেশি।’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন : ১০ জানুয়ারি, ২০১৮)

দেশে বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক আটটি। প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোও ঝুঁকছে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের দিকে। ১৭টি ব্যাংক প্রচলিত (কনভেনশনাল) ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর বাইরে ডজনখানেকেরও বেশি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রমের প্রতি আগ্রহ দেখিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছে। প্রচলিত ধারায় পরিচালিত কিছু ব্যাংক পুরোপুরি ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী দেশের ব্যাংকগুলোতে এক হাজার ১১২টি ইসলামী ব্যাংকিং শাখা রয়েছে। (ইত্তেফাক : ১ অক্টোবর ২০১৭)্

ইসলামী ব্যাংকগুলো এখন এক বিশাল জব মার্কেট। শুধু ইসলামী ব্যাংকেই কর্মরত আছে প্রায় ১৪ হাজার লোক। আটটি ইসলামী ব্যাংক এবং অন্য ব্যাংকগুলোর ইসলামী ব্যাংকিং শাখায় ৪০ হাজার লোক কর্মরত। বিভিন্ন ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করে ইসলামী ব্যাংকগুলো তৈরি করেছে প্রায় ৩০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আমাদের দেশে বেশির ভাগ রেমিট্যান্স আসে। গত জুন মাস শেষে দেখা গেছে, আট হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা এসেছে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখার পরও শুধু ‘ইসলামী’ হওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় যথাযথ আনুকূল্য পাচ্ছে না ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা।

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুদকে বর্জন করাই ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল লক্ষ্য। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সফলতা-ব্যর্থতার বিষয়টি এখানেই নিহিত। সফলতার মানদণ্ড যদি হয় শরিয়া নীতি থেকে সরে গিয়ে অথবা শরিয়া নীতি ঢিলেঢালাভাবে অনুসরণ করে অধিক মুনাফা অর্জন, রেমিট্যান্স অর্জনে রেকর্ড গড়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আমানত গ্রহণ ও বিনিয়োগ বাড়ানো তাহলে নির্দ্বিধায় বলতে হবে ইসলামী ব্যাংকগুলো সফল। কিন্তু যদি এই সফলতার মানদণ্ড ইসলামী শরিয়ায় দৃঢ়ভাবে অটল থাকার ওপরে হয় তাহলে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর সফলতার ব্যাপারে আছে জনমনে প্রশ্ন। সুদ বর্জনের অঙ্গীকার নিয়েই ইসলামী ব্যাংকের জন্ম। সুদ বহাল রেখে ইসলামী ব্যাংক কল্পনাই করা যায় না। মুনাফায় চ্যাম্পিয়ন না হতে পারলেও শরিয়াহ নীতি  অনুসরণ করতে পারলে ব্যাংক হবে শতভাগ সফল। সুদকে যত বেশি এড়িয়ে চলতে পারবে ইসলামী ব্যাংকিং হবে ততই সফল।

স্বতন্ত্র ইসলামী ব্যাংকিং আইনসহ যথাযথ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা না থাকা এবং শরিয়াহ নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল জনশক্তি কম থাকায় এ খাতের সফলতা কিছুটা ম্লান হচ্ছে। শরিয়াহ নীতি প্রশ্নাতীতভাবে অনুসরণ করতে না পারার পেছনে একদিকে যেমন মুরাবাহা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের পণ্য না নিয়ে কৌশলে নগদ অর্থ গ্রহণের প্রবণতা এবং স্বতন্ত্র ইসলামী ব্যাংকিং আইন না থাকা দায়ী, অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকিং আইনে পারদর্শী, শরিয়াহ নীতি বাস্তবায়নে আন্তরিক দক্ষ জনশক্তির অভাবও এর একটা বড় কারণ।

ব্যাংক একটি প্রতিষ্ঠান। এর কোনো হাত-পা নেই। কর্মী বাহিনীই এর অন্যতম মূল পুঁজি। কর্মীদের আন্তরিকতা ছাড়া কখনো শরিয়াহ নীতি অনুসরণ সম্ভব নয়। আমাদের দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোতে নিয়োজিত জনশক্তির বেশির ভাগই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত। ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে পড়াশোনার ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত সামান্য প্রশিক্ষণই যাদের সম্বল, তাদের শিক্ষাব্যবস্থা ইসলামী না হওয়ায় তাদের হৃদয়ে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রতি কাঙ্ক্ষিত শ্রদ্ধা অনুপস্থিত। ফলে শরিয়াহ নীতি অনুসরণের বিষয়টি অনেকটাই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রতি গ্রাহকদের শরিয়াহসম্মত হওয়ার ব্যাপারে অনাস্থাই এর প্রমাণ।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় কর্মী বাহিনীর খোদাভীরু হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। অর্থাৎ কর্মী বাহিনী যত খোদাভীরু হবে শরিয়াহ নীতি ততই কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে। মুত্তাকি ও ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রতি বীতশ্রদ্ধ জনশক্তির অভাবেই আজ ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে পূর্ণ ইসলামী সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রাহকদের প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকগুলো চ্যালেঞ্জ করতে পারছে না যে তারা পূর্ণ শরিয়াহভিত্তিক।

বাংলাদেশে ৪০টি পাবলিক ও ১০০টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। গণমানুষের চাহিদার ভিত্তিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ, অনুষদ ও গবেষণা হবে এটাই স্বাভাবিক। সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে নাট্যকলা বিষয় নিয়েও উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে বিভাগ আছে। কিন্তু ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশের ১৪০টি পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটিতেই আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশেও এর ব্যাপক চাহিদা থাকা ইসলামী ব্যাংকিং বা ইসলামী অর্থনীতির মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিভাগ নেই। নেই গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ। এমনকি বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও কোনো বিভাগ নেই। গণমানুষের ইসলামী শিক্ষা ও গবেষণার চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গত কয়েক বছরে ডজনখানেক বিভাগ খোলা হলেও ইসলামী ব্যাংকিং বা ইসলামী অর্থনীতি নিয়ে ইবিতে কোনো বিষয় খোলার নামগন্ধও নেই। ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়েও নেই কোনো বিভাগ। ফলে চাহিদা অনুয়ায়ী দক্ষ জনশক্তি পাচ্ছে না ইসলামী ব্যাংকগুলো। এতে ব্যাহত হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা। কর্মবাজারে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিরাট চাহিদা থাকায় পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে বিভাগ খুললে শিক্ষার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়বে। ব্যাংকগুলো পাবে শরিয়াহ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল দক্ষ জনশক্তি। তখন ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পূর্ণ ইসলামীকরণ সম্ভব হবে। তাই উচ্চশিক্ষায় ইসলামী অর্থনীতি ও ইসলামী ব্যাংকিং বিভাগ খোলা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও খতিব



মন্তব্য