kalerkantho


শিশু আইন ভেঙেছে রাজাপুর থানা

ঝালকাঠি প্রতিনিধি   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



চৌদ্দ বছরের এক শিশুর বয়স বাড়িয়ে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছে ঝালকাঠির রাজাপুর থানা পুলিশ। ছেলেটি ১৮ দিন ধরে কারাগারে রয়েছে। এর মাধ্যমে কার্যত শিশু আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। প্রতিকার চেয়ে ছেলের মা পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে অভিযোগ করে উল্টো শাসানির মুখে রয়েছেন।

শিশুটির নাম সিরাজুল ইসলাম সুজন। সে রাজাপুর উপজেলার তুলাতলা গ্রামের দিনমজুর আনোয়ার খানের ছেলে। সেও বাবার সঙ্গে দিনমজুরি করে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর সকাল ১১টার দিকে বাড়ি যাওয়ার সময় রাজাপুর প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের সামনে ৭০০ টাকা কুড়িয়ে পেয়েছিল সুজন। স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা নূরুল আমিনের পকেট থেকে এই টাকা রাস্তায় পড়ে যায়। টাকা পেয়ে সুজন হাতে তুলে নেয়। নুরুল ও স্থানীয় কিছু যুবক টাকা খুঁজতে থাকেন। একপর্যায়ে তাঁরা সুজন টাকা পেয়েছে কি না জিজ্ঞাসা করেন। সুজন টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করে এবং পকেট থেকে তা বের করে নূরুলকে ফেরত দেয়। এ সময় কিছু যুবক সুজনকে পকেটমার সন্দেহে মারধর করে। তারা রাজাপুর থানায় খবর দেয়। সুজনকে উপপরিদর্শক (এসআই) চান মিয়া রাজাপুর থানায় নিয়ে যান। রাজাপুর থানার পরিদর্শক সুজনের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ দেন। টাকার মালিক নূরুল মামলা করতে রাজি হননি। তিনি পুলিশকে বলেন, ‘টাকা আমি ফেরত পেয়েছি। এতেই সন্তুষ্ট। সুজনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। এর পরও সুজনকে ছেড়ে দেয়নি পুলিশ। এসআই চান বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করেন।

সাজানো মামলায় এসআই চান দাবি করেন, সুজনের দেহ তল্লাশি করে ২০ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে। মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় এসআই রফিকুল ইসলামকে। সাজানো মামলায় সুজনের বয়স দেখানো হয় ২০ বছর। কিন্তু জন্মনিবন্ধন সনদ অনুযায়ী সুজনের জন্ম ২০০৩ সালের ৭ মার্চ। এ হিসাবে ঘটনার দিন তাঁর বয়স ১৪ বছর ৯ মাস ২২ দিন। এদিকে ৩০ ডিসেম্বর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে শিশুটিকে আদালতে পাঠান এসআই রফিকুল ইসলাম। ১৮ দিন পার হলেও দরিদ্র বাবা আদালতে জামিনের আবেদন করতে পারেননি।

সুজনের বাড়ি গেলে তাঁর মা খাদিজা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে যদি টাকা চুরি করে থাকে অথবা পকেট কেটে থাকে তাহলে পুলিশ সেই অভিযোগে মামলা করতে পারত। কেন পুলিশ আমার ছেলের নামে মিথ্যা মামলা করল? আমি এর বিচার চাই।’ তিনি অভিযোগ করেন, ছেলেকে মিথ্যা ঘটনায় জড়িয়ে মামলা দেওয়ার বিষয়ে গত ১০ জানুয়ারি এসপি বরাবরে সুবিচার চেয়ে একটি আবেদন করেন। ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগটি তদন্ত করে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি, রাজাপুর সার্কেল) মো. মোজাম্মেল হোসেন রেজাকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। গত রবিবার দুপুর দেড়টার দিকে এএসপি মোজাম্মেল হোসেন রেজা তাঁকে ডেকে পাঠান। তিনি গেলে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ায় তাঁকে ভর্ত্সনা করেন। এসএসপি তাঁকে বলেন, ‘চান যা করেছে ঠিকই করেছে। আপনার ছেলে ভালো না মন্দ, তা সাক্ষ্যপ্রমাণে আদালত বিচার করবে। আমার কিছু করার নাই। আপনি কার পরামর্শে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন?’

রাজাপুর থানার পরিদর্শক শামসুল আরেফিন বলেন, ‘এসআই চান মিয়ার অভিযোগ পেয়ে আমি মামলা নথিভুক্ত করেছি। তদন্ত চলছে। খোঁজখবর নিয়ে আমি বিস্তারিত জানাব।’

রাজাপুর সার্কেলের এএসপি মো. মোজাম্মেল হোসেন রেজা বলেন, ‘এসপি আমাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সুজনের মায়ের বক্তব্য শুনেছি। আমি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা করছি।’

এ বিষয়ে ঝালকাঠির আইনজীবী নাসির উদ্দিন কবির বলেন, ‘শিশুরা অপরাধ করলে তাকে ধরে আনার সময় হাতকড়া পড়ানো যাবে না। তাদের অন্য আসামিদের সঙ্গে জেলে একত্রে রাখা যাবে না, তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা যাবে না। শিশুদের জন্য জেলখানা নয়, সংশোধনাগার রয়েছে, সেখানে তাদের রাখতে হবে। শিশুদের আলাদা আদালতে বিচার করতে হবে। কোনো শিশুকে বয়স বেশি দেখিয়ে আসামি করাটাও এক ধরনের অপরাধ।’


মন্তব্য