kalerkantho


‘খুব কাছে গিয়েও আমরা জয়ী হতে পারিনি’

১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সালের ঘটনাবহুল সেই উত্তাল সময়ের সাক্ষী। সাতই নভেম্বরের সিপাহি অভ্যুত্থান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহেরের ফাঁসির ঘটনা ওমর শাহেদকে শোনালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কৃতী বিজ্ঞানী ড. মো. আনোয়ার হোসেন। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

২৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



‘খুব কাছে গিয়েও আমরা জয়ী হতে পারিনি’

যুদ্ধ শেষে কর্নেল তাহের কবে দেশে ফিরলেন?

আমার বড় ভাই ১১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহের, বীর-উত্তম ১৯৭২ সালের এপ্রিলে ফিরে এলেন। তাঁর জন্য খালি রাখা সেনাবাহিনীর খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদ ‘অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল’-এর দায়িত্ব নিলেন।

আমি তাঁর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ৫৬ স্টাফ রোডের বাসায় থাকতাম। কিছুদিন পর মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে নবম সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম এ জলিলের বিচার শুরু হলো। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান তাহের তাঁর বিপক্ষে আনা অনেক অভিযোগের কোনোটিরই সত্যতা না পেয়ে সব খারিজ করে তাঁকে সসম্মানে মুক্তি দিলেন। এ পরিস্থিতিতে তখনই আমরা বুঝতে পারলাম, স্বাধীন হলেও এই দেশ পাকিস্তানি কাঠামোতেই রয়ে গেছে। আমাদের পরিবারের নয় ভাই-বোন মুক্তিযুদ্ধ করেছি, আমরা চেয়েছি, বিচারব্যবস্থা, সেনাবাহিনী, প্রশাসন ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি কাঠামোর বদলে স্বাধীন বাংলাদেশের উপযোগী কাঠামোতে হবে। সেগুলোর কোনোটিই হচ্ছে না—এই ছিল আমাদের মনঃকষ্ট।

তিনি কিভাবে সেগুলো বদলানোর উদ্যোগ নিলেন?

কর্নেল তাহের সব সময়ই সক্রিয় কমান্ড করতে চাইতেন। শেষ পর্যন্ত তা করার সুযোগও পেলেন। বঙ্গবন্ধু ‘ডেপুটি চিফ অব স্টাফ (ডিসিওএস)’ পদ তৈরি করে কুমিল্লা সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডার, ৪৪ ব্রিগেডের প্রধান জিয়াউর রহমানকে ঢাকায় নিয়ে এলেন।

সেখানে কর্নেল তাহেরকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। এটি তাঁর জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কুমিল্লা সেনানিবাসে থাকতেই তিনি ‘বাংলাদেশের সেনাবাহিনী হবে উত্পাদনশীল গণবাহিনী’—এই ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করলেন। তাঁর উদ্যোগে ময়নামতি পাহাড়ের ঢালে অফিসার, জওয়ানরা একসঙ্গে খেটে আড়াই লাখ আনারসের চারা রোপণ করলেন। এডুকেশন কোর, মেডিক্যাল ইউনিটসহ বিভিন্ন ইউনিট গ্রামের মানুষের মধ্যে কাজ করতে পাঠিয়ে দিলেন। সেভাবে কাজ করার জন্য বন্ধবন্ধুর কাছেও পরিকল্পনা জমা দিলেন। কিন্তু নানাজন তাঁকে উল্টো কথা বোঝাল। ফলে লন্ডনে চিকিত্সাধীন থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু বার্তা পাঠালেন—‘তাহের, আমার কাছে চলে আসো, এখানে তোমার জন্য উন্নতমানের কৃত্রিম পা সংযোজনের ব্যবস্থা করেছি। ’ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা তাহের বললেন, ‘আমার নকল পা তো আছেই। আমার জন্য বরাদ্দের টাকাগুলো ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের অর্থোপেডিক সেন্টারে কৃত্রিম পা সংযোজনের জন্য দিয়ে দিলে খুশি হব। ’ বঙ্গবন্ধু ফিরে এলে কর্নেল তাহেরকে ‘ডিরেক্টর ডিফেন্স পারচেজ (ডিডিপি)’ করে সক্রিয় কমান্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। তিনি সে পদ গ্রহণ করলেন না। সরকারপ্রধানকে লিখলেন, ‘এই সেনাবাহিনীকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মতো করে রেখে দেওয়া হয়েছে। এখানে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে, আরো হবে। ’ ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে লেখা সেই ঐতিহাসিক পত্রে যে কথাগুলো বঙ্গবন্ধুকে তিনি লিখেছেন, সেগুলোই পরে নিদারুণ সত্য প্রমাণিত হয়েছে। সেনাবাহিনীর ষড়যন্ত্রকারীরাই তাঁকে হত্যা করল। খন্দকার মোশতাকসহ তাঁর দলের অনেক নেতা তাতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

পদত্যাগের বিষয়ে আপনার সঙ্গে আলাপ করেছেন?

তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের ছাত্র। একদিন কার্জন হলে বিভাগের নিচে কুমিল্লার স্টেশন কমান্ডারের পতাকাবাহী গাড়িটি থামল। আমাকে নিয়ে তিনি ক্যান্টনমেন্টের দিকে রওনা হলেন। বললেন, ‘আমি আজ পদত্যাগ করছি, তুমি কী মনে করো?’ কোনো উত্তরই দিতে পারিনি। তাঁর পদত্যাগ করা ঠিক হবে কি না সেই বয়সে বুঝতেই পারিনি।

এখন কী মনে হয়তাঁর সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল?

এই বয়সে পেছনে ফিরে মনে হয়েছে, পদত্যাগ না করে থেকে গেলে পরবর্তীকালে যেসব ষড়যন্ত্র সেনাবাহিনীতে হয়েছে, সেগুলো ভেতর থেকে তিনি মোকাবেলা করার চেষ্টা করতে পারতেন। সফল হতেন কি না জানি না। তবে তিনি সব সময়ই সাধারণ মানুষের সঙ্গে থাকতে চেয়েছেন। সেনাবাহিনী থেকে চলে যাওয়ার সময় বলেছেনও, ‘আমি ফিরে যাচ্ছি তাঁদের কাছে, যাঁরা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ’ সেনাবাহিনীতে থাকলে এমনও তো হতে পারত—নানামুখী ষড়যন্ত্রগুলোর সঙ্গে না চাইলেও তিনি ঘটনাপ্রবাহের কারণে যুক্ত হয়ে যেতেন। তিনি তো সব সময়ই ক্যু, সামরিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ছিলেন।

তিনি রাজনীতিতে জড়ালেন কিভাবে?

সেনাবাহিনী থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করলেন। আমার মাধ্যমেই সিরাজুল আলম খানসহ জাসদের নেতাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হলো। শেষ পর্যন্ত তিনি দেখলেন, যাঁরা জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) গড়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন, তাঁরাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সবচেয়ে সামনের কাতারে আছেন। তাঁদেরও তাঁর মতো একই স্বপ্ন—সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, সুতরাং তাঁরা তো একই। ফলে তিনি সে দলে যোগ দিলেন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আমার মেজো ভাই আবু ইউসুফ, বীরবিক্রমের ভাড়াবাড়ি ফরিদপুর হাউসে সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে তাঁর সেই ঐতিহাসিক বৈঠকটি হলো। আ স ম আবদুর রব, মেজর এম এ জলিল, জাসদের বর্তমান সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গেও দীর্ঘ বৈঠক, অনেক আলোচনার পর তিনি স্থির করলেন, জাসদে যোগ দেবেন। বাংলাদেশের অসম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধকে সম্পূর্ণ করতে আরো বড় যুদ্ধ করতে হবে, গণঅভ্যুত্থান করে ক্ষমতায় যেতে হবে। ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর আত্মপ্রকাশের পর পল্টন ময়দানে জাসদের ঐতিহাসিক সভায় ঘোষণা করা হলো—‘সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট’-এর নামটি ঘোষণা করা হচ্ছে না। যেদিন সেটি প্রকাশিত হবে, আপনারা খুশি হবেন। রক্ষীবাহিনীর বিপরীতে ‘গণবাহিনী’ গড়ে তোলার দায়িত্ব দিয়ে তাঁকে সর্বাধিনায়ক করা হলো। তাঁর নামটি কখনোই ঘোষণা করা হয়নি, পঁচাত্তরের ‘সাতই নভেম্বর’ প্রকাশিত হয়ে গেল, তিনিই সেই মানুষ।

সেনাবাহিনী থেকে বেরিয়ে তিনি কী কাজ করতেন?

বঙ্গবন্ধুই তাঁকে সি-ট্রাক ইউনিট ও পরে ড্রেজার অর্গানাইজেশনের পরিচালকের চাকরি দিলেন। বিভিন্ন নদী খননের কাজ শুরু করেন তিনি। নদী নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল। ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে’ শিরোনামে সেগুলো নিয়ে বিচিত্রায় প্রবন্ধ লিখেছেন। নারায়ণগঞ্জে থাকতে আমাদের নিয়েও নদীতে অনেক ঘুরেছেন। কিভাবে নদীতীরে সভ্যতা গড়ে উঠেছে, কিভাবে নদীগুলো রক্ষা করতে হবে—সেই কথাগুলো তিনি বলতেন।

১৯৭২ থেকে ৭৫ সালের সাতই নভেম্বরের আগ পর্যন্ত আপনার ও কর্নেল তাহেরের জীবন?

দেশ স্বাধীন করব বলে পাকিস্তান আমলেই দুইবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া ছেড়ে সিরাজ শিকদারের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলাম। তৃতীয়বার স্বাধীন বাংলাদেশে তাহের ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় গ্রামের কৃষকদের মধ্যে কাজ করতে ময়মনসিংহে ব্রহ্মপুত্রের পারে নাইট স্কুল, জমিতে উন্নত জাতের ধানের বীজ রোপণ ও পোলট্রি ফার্ম গড়েছি। তবে প্রতিবারই আমার বিভাগের শিক্ষকদের বিশেষত বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক কামালুদ্দিন আহমদের প্রেরণায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসেছি। শেষ পর্যন্ত অনার্স ও মাস্টার্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ হলো। রাত ১১টায় বাসায় ফিরে দেখি, আমার মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেয়ে দোতলা থেকে ক্র্যাচে ভর দিয়ে খট খট শব্দ করে তাহের ভাই নামছেন। আমি অবাক—এত রাতে তিনি কেন নামছেন? তিনি হেসে বললেন, ‘কংগ্র্যাচুলেশন, প্রফেসর। ’ ইন্টারভিউ দেওয়ার বিষয়ে কোনো কিছুই কিন্তু আমি তাঁকে জানাইনি। তিনি বন্ধুদের মাধ্যমে খবর পেয়েছেন। আমার ধূমপানের কথা জানতেন। নিজের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে দিয়ে বললেন, ‘এখন তুমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। আমার সামনেই সিগারেট খেতে পারো। ’ বিস্ময়ে আমি তো ‘থ’। এর আগে ১৯৭৪ সালে ঢাকা শহর গণবাহিনীর প্রধান হিসেবে কাজ শুরু করেছি। শুরুর দিকে শিক্ষকতাজীবন অল্পই ছিল। ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানের পর পলাতক জীবন ও ছিয়াত্তরের মার্চে গ্রেপ্তার হয়ে গেলাম।

গণবাহিনীর প্রধান হিসেবে আপনার দায়িত্ব কী ছিল?

পুরো ঢাকা আমার অধীনে ছিল। আমার নেতৃত্বে ছয় শ সদস্য ছিলেন। রাজনৈতিক বাহিনী বলে আমরা হাতে অস্ত্র তুলে নিইনি, তবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অস্ত্র চালাতে জানি। আমাদের লক্ষ্য—গণঅভ্যুত্থান। বঙ্গবন্ধুকে মাথার ওপর রেখে এই দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করব। হো চি মিনের মতো তিনি বিপ্লবের পর শ্রদ্ধার আসনে সবার নেতা হয়ে থাকবেন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কী করলেন?

আমরা ভেবেছিলাম, ১৯৭৬ সালের শেষ নাগাদ অভ্যুত্থান করতে পারব। কারণ তখনো তো জরুরি অবস্থা আছে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। ফলে আমাদের কাজকর্মও খুব সীমিত হয়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো স্থানে আমরা জনগণ থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছি। তার পরও ঢাকার মতো কোথাও কোথাও সুসংগঠিত ছিলাম। তবে ১৫ আগস্টের পর কর্নেল তাহের বললেন, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিয়েছে, এই রাষ্ট্র আরো বিশৃঙ্খলার দিকে যাচ্ছে, আরো প্রাসাদ ষড়যন্ত্র হবে। সময়ের আগেই আমাদের ওপর বিশাল দায়িত্ব এসে পড়বে। এ সময় আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নচেত্ আরো সবল কোনো শক্তি চলে এলে সেটি পরাস্ত করা কঠিন হবে। প্রাসাদ যড়যন্ত্র, সেনাবাহিনীতে অন্তর্কোন্দল ঠেকাতে আমাদের সিপাহি অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিতে হলো। সেসবের আমি সাক্ষী। সেনাবাহিনীর সৈনিকরাই তাহের ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। সেনাবাহিনীতে আমাদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সৈন্যদের মধ্যে আমি গোপনে সমাজতন্ত্রের ক্লাসও নিয়েছি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সৈনিকরা বলেছেন, আমরা তো বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করিনি। অফিসাররা তাঁদের স্বার্থে আমাদের ব্যবহার করেছেন। তখনকার বাস্তবতা ছিল—উচ্চাভিলাষী বিবদমান অফিসাররা এসব সাধারণ সৈনিকের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। একদিকে আর্টিলারি, অন্যদিকে পদাতিক সৈন্যরা মুখোমুখি। তাঁরা বলেছেন, এই অফিসাররা দেশ ধ্বংস করে দিচ্ছেন। তাঁদের কেউ মেজর জেনারেল, কেউ সেনাপ্রধান হবেন, কেউ ক্ষমতায় যাবেন। আমাদের কী লাভ হবে? আমরা পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছেড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আপনারা বলেছেন, দেশে সমাজতন্ত্র হবে, সেনাবাহিনী গণবাহিনী হবে। এখন আমাদের নেতৃত্ব দিন। আমরা অভ্যুত্থান করব।

কিভাবে পাল্টা অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নিলেন?

সৈনিকদের সঙ্গে আমাদের পরপর অনেক মিটিং হলো। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর প্রথম প্রহরে শেষ মিটিং হয়েছিল গুলশানের একটি বাড়িতে। তাহের ভাই, ইনু ভাই ও আমি দলের পক্ষে সেখানে ছিলাম। সৈন্যরা বলেছেন, ‘এই অফিসাররাই সব কিছুর জন্য দায়ী। আমরা তাঁদের রাখব না। সেনাবাহিনীর ভেতরে যেসব অসত্ অফিসার আছেন, তাঁদের শেষ করে দেব। আপনারা বাইরের অসত্ লোকদের শেষ করে দিন। এভাবেই বিপ্লব হবে। ’ তাহের ভাই তাঁদের বোঝালেন, হত্যাকাণ্ড বিপ্লব নয়। যেসব অফিসার অপরাধ করেছেন, তাঁদের বন্দি করতে হবে। বাইরে যাঁরা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত, আমরা তাদের বন্দি করব। কিন্তু তাঁদের মতো আমরা রক্তারক্তি করব না। তাতে দেশের মঙ্গল হবে না। অল্প কয়েকজন অফিসার হত্যার জন্য অনেকেই কর্নেল তাহের এবং সিপাহিদের দায়ী করেন। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো—এই সেক্টর কমান্ডার তখন নেতৃত্ব না দিলে ক্যান্টনমেন্টে রক্তগঙ্গা বয়ে যেত। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার দায়িত্ব সিপাহিদের দিলেন। তাতে সৈনিকরা খুশি হলেন না। তিনি বোঝালেন, যেহেতু সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় পদাধিকারী খালেদ মোশাররফ নিজে ‘চিফ অব স্টাফ’ পদ পেতে জিয়াকে বন্দি করেছেন, যাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও নেই, তাই তাঁকে মুক্ত করলে আমাদের মিত্র হিসেবে পাব। তিনি যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, সেটি তখনো জানা যায়নি। জিয়াউর রহমানও জানতেন, কর্নেল তাহের সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে কাজ করছেন। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা অক্টোবর মাসে তাঁর টেবিলেও লিফলেট রেখে গিয়েছিল। যা তিনি তাঁকে ফোনে জানিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার লোকেরা আমার টেবিলে লিফলেট রেখে গেছে। ’ এবার গৃহবন্দি হয়ে কর্তিত ফোন লাইনের প্যারালাল সংযোগ থেকে তিনি কর্নেল তাহেরকে বললেন, ‘আমার জীবন বিপন্ন, আমাকে বাঁচাও। ’ ফলে এক বন্দিকে বাঁচানোর জন্য তিনি সেই উদ্যোগ নিলেন। তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘আপনি তাঁকে বিশ্বাস করছেন?’ তিনি বলেছিলেন, “আমাদের সৈন্য, শ্রমিক ও ছাত্ররা আছে। ফলে সে আমাদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবে না। ‘জিয়া উইল বি আন্ডার মাই ফুট। ’ আমি তাঁকে বিশ্বাস করছি না। কিন্তু সে থাকলে সেনাবাহিনীর ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়বে। তাঁর তেমন কোনো দুর্নামও নেই। ” তবে সেটি হয়নি।

কেন?

যে ভুলগুলো আমি দেখি, আমাদের পরিকল্পনা অনুসারে, সৈন্যরা গুলি ফোটাতে ফোটাতে ট্রাকে ট্রাকে করে ঠিকই ব্যারাক থেকে বেরিয়ে এসেছেন, সিদ্ধান্ত অনুসারে তাঁদের একেকজনের হাতে তিন-চারটি অস্ত্র থাকলেও শ্রমিকরা, বিশেষত তেজগাঁও, পোস্তগোলার শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠনের সদস্যদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক নির্দিষ্ট পয়েন্টগুলোতে জড়ো করা যায়নি। স্থির হয়েছিল, তাঁরা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনীর নামে স্লোগান দেবেন ও অস্ত্র হাতে তুলে নেবেন। তবে সৈন্যরা এসে কাউকে পেলেন না। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার খুলে দেওয়া হলেও সেখান থেকে কেউ বেরোলেন না। শুধু জাসদ নেতা আবদুল আউয়াল, মোহাম্মদ শাহজাহান ও সুলতান রাজা বেরোলেন। এম এ আওয়াল সাহেবের গোয়াতুর্মিতে কোনো বন্দি বেরোতে পারলেন না। সেখানে তো আওয়ামী লীগ ও জাসদের নেতাকর্মীরাই বন্দি ছিলেন। তাঁরা বেরিয়ে এলে তো আমাদের বিশাল শক্তি হয়ে যেত। সেটিও হয়নি।

জিয়াউর রহমানের অবস্থান কী ছিল?

মেজো ভাই আবু ইউসুফ বীরবিক্রমের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় আমরা জেনারেল জিয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। সৈন্যরা সেখানে তাঁকে মুক্ত করে নিয়ে আসবেন। আমাদের চূড়ান্ত বোঝাপড়া হবে। সিপাহি ইউনিটটি কর্নেল তাহেরের আদেশে জিয়াকে মুক্ত করলে তিনি বললেন, ‘তিনি (কর্নেল তাহের) তো শুধু তোমাদের নন, আমারও নেতা। ওখানে কেন? তিনি এখানে এসে নেতৃত্ব দেবেন। তাঁকে নিয়ে আসো। ’ তাঁরা তাঁকে সেখানে রেখেই চলে এলেন। তিনি তো ধূর্ত লোক, নানা পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। এই সুযোগে তিনি জেনারেল মীর শওকত আলীসহ তাঁর প্রতি অনুগত অফিসারদের চারপাশে জড়ো করলেন। তাঁকে সেকেন্ড ফিল্ড আর্টিলারিতে নিয়ে গেলেন। তাঁকে সেনানিবাস থেকে বের করা গেল না—এটিও অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। সবাই তো মনে করছেন, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাই জিয়াকে মুক্ত করেছে, ফলে সব ঠিকই আছে। যদি রাশিয়ার মতো সৈনিকদের সঙ্গে ছাত্র ও শ্রমিকদের সেতুবন্ধ তৈরি হতো, তাহলে জিয়ার না আসায়ও কোনো সমস্যা হতো না। সেটি তো হয়নি।

এই অবস্থায় কর্নেল তাহের কী করলেন?

এমন অবস্থায়ও শেষরাতে সিপাহিদের সঙ্গে ইউসুফ ভাই ও ইনু ভাইকে নিয়ে তিনি ঢাকা সেনানিবাসে গেলেন। জিয়াকে বললেন, আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। তবে অনুগত অফিসাররা তাঁকে আগেই বুঝিয়েছিলেন, কোনোভাবেই ক্যান্টনমেন্ট ছাড়বেন না। ফলে তিনি বেরিয়ে এলেন না। সেখানেই তাহের ভাই তাঁকে বললেন, মেজর জলিল, আ স ম রবসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠিত করে সাধারণ নির্বাচন দিতে হবে, সিপাহিদের দাবি মানতে হবে। তিনি মেনে নিলেন। মুখে বললেন—‘তাহের, তুমি বিপ্লবী, রাজনীতিবিদ। আমি সেনা অফিসার। শহীদ মিনারে যেতে পারব না, বক্তৃতাও দিতে পারব না। তুমিই সব করো। ’ জিয়ার চারদিকের দক্ষিণপন্থী অফিসারদের সবাইকে তো কর্নেল তাহের চেনেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, পরিস্থিতি অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। তিনি ফিরে এলেন। অফিসারদের মধ্যে আমাদের যোগসূত্র ছিলেন সেনা গোয়েন্দা সংস্থার মেজর জিয়াউদ্দিন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় সুন্দরবন অঞ্চলের কিংবদন্তি মুক্তিযোদ্ধা। তবে তখন তিনি খুলনায় সেনা রিক্রুটমেন্টের কাজে ছিলেন বলে আমরা সিপাহি অভ্যুত্থানের সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করতে পারিনি। জিয়ার উদ্ধারের দায়িত্বে সিপাহিদের সঙ্গে একজন অফিসার থাকলে জিয়াউর রহমানকে অবশ্যই নির্দেশমতো বাইরে কর্নেল তাহেরের কাছে নিয়ে আসা যেত।

তখন আপনি কোথায়?

অভ্যুত্থানের ঘোষণা দেওয়ার কথা নেতারা আমাকে বলে যাননি। আমি স্ব-উদ্যোগে সেদিন রাতেই মাইকে ঘোষণা করলাম—‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতৃত্বে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছি। সকালে সবাই শহীদ মিনারে আসুন। কর্নেল তাহের ও জিয়াউর রহমান বক্তব্য রাখবেন। ’ সিরাজুল আলম খানকে টেলিফোন করলাম। গোপন আস্তানা থেকে আমাকে বেতারে কী বলব সে নির্দেশনা দিলেন। তবে তিনি জাসদ কিংবা কর্নেল তাহেরের নামটি বললেন না। শুধু নির্দেশনা দিলেন—বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, গণবাহিনীর নেতৃত্বে সফল অভ্যুত্থান হয়েছে। আপনারা সবাই তাদের সহযোগিতা করবেন। গণকণ্ঠের সাংবাদিক শামসুদ্দিন আহমেদ পেয়ারাকে মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে শাহবাগের বেতার ভবনে গেলাম। ইউ টার্ন নিতে দেরি হবে বলে সৈন্যরা আমাদের মোটরসাইকেলসুদ্ধ ওপরে তুলে আইল্যান্ড পার করে দিলেন। সকাল পর্যন্ত ঘোষণা চলল। সকালে খন্দকার মোশতাক আহমদ বেতারে এলেন এবং ঘোষণা বন্ধ করার নির্দেশ দিলেন।

কর্নেল তাহের কি বেতারে গিয়েছিলেন?

এ খবর তিনি পেয়ে সেখানে গিয়ে মোশতাককে বললেন, ‘ষড়যন্ত্রের দিন শেষ। ইফ ইউ অটার অ্যা ওয়ার্ড, আই উইল কাট ইউর টাং। গেট লস্ট। ’ সৈন্যরা তাঁর নির্দেশে তাঁকে বের করে দিলেন। এভাবে নানা ঘটনা চলতে লাগল। ৯ নভেম্বর বায়তুল মোকাররমে ফারুক-রশীদের অনুগত মোশতাকের ঘাতক বাহিনী জাসদের সভায় গুলি চালাল।

আপনার অধীন ঢাকা শহর গণবাহিনীর সদস্যরা মাঠে নামলো না কেন?

তাহের ভাই গণবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেও তিনি যেমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নির্দেশ মেনে চলতেন, আমিও তাহের ভাই নন, আমার ঊর্ধ্বতন নেতার কমান্ডে চলতাম। তাহের ভাইয়ের নির্দেশও ছিল তা-ই। আমার অধীনস্থ গণবাহিনীর সদস্যদের বিষয়ে তাঁর কাছে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘তাদের অ্যালার্ট রাখো, অভ্যুত্থান বিষয়ে এখনই জানানোর প্রয়োজন নেই। ’ আমার নেতৃত্বাধীন ৬০০ সদস্যও অভ্যুত্থানি সিপাহিদের দেওয়া অস্ত্র হাতে তুলে নিলে একটি সংগঠিত শক্তি হয়ে যেত, তা হয়নি। অভ্যুত্থানটি সৈনিক-জনতার অভ্যুত্থান হতে পারেনি। এসব ব্যর্থতার ফল হলো ভয়াবহ। অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে কর্নেল তাহেরের ব্যর্থতা ছিল না। তাঁকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো তিনি শতভাগ পালন করেছিলেন। সিপাহিরা অস্ত্রাগার দখল ও জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিলেন, কারাগার খুলে দিয়েছিলেন, বেতার, টেলিফোন, বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন। কিন্তু রাজপথে সংগঠিত জনতার সমাবেশ আমরা ঘটাতে পারিনি। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর সংকটময় পরিস্থিতিতে জাসদের কোনো কোনো নেতা বলেছিলেন, অভ্যুত্থানে আমাদের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তারা নিজেরা মারামারি, কাটাকাটি করুক, পরে জাসদ মাঠে নামবে। তাহের ভাই বুঝিয়েছেন, নিশ্চেষ্ট হয়ে এভাবে বসে থাকলে পরে আমাদের আরো শক্তিশালী শত্রুর মুখোমুখি হতে হবে। তখন আমরা কিছুই করতে পারব না। ফলে শেষ পর্যন্ত দল সিদ্ধান্ত নিল—রাশিয়ার মতো সৈনিক-জনতার অভ্যুত্থান হবে। জাসদের রণনীতিও ছিল তা-ই। স্থির হয়েছিল, ৯ নভেম্বর ঢাকায় হরতাল আহ্বান করা হবে। শ্রমিক-ছাত্র-জনতা রাস্তায় থাকবে। সেটির সঙ্গে সমন্বয় করে অভ্যুত্থানের ক্ষণটি নির্ধারণ করা হবে, যাতে সৈনিক-জনতার অভ্যুত্থান সম্ভব হয়। কিন্তু ক্যান্টনমেন্টে বিস্ফোরণোন্মুখ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় ৭ নভেম্বরই অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাই বলা যায়, অতি দ্রুত ঘটে যাওয়া পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করতে পারিনি। ক্ষমতা লাভের খুবই কাছে গিয়েও আমরা জয়ী হতে পারিনি। এই বিপ্লবের মর্মার্থ সাধারণ সৈন্যরা বুঝেছিলেন, আমরা পারিনি। ফলে বলি হিসেবে শত শত সৈন্যকে জীবন দিতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ২৪ নভেম্বর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সভা থেকে তাহের ভাই গ্রেপ্তার হয়ে গেলেন। আমি দেরি করে গিয়েছিলাম বলে পুলিশ ধরতে পারেনি। এর আগে ২২ নভেম্বর ইউসুফ ভাই ও মেজর জলিল, আ স ম আবদুর রব ও হাসানুল হক  ইনুকে গ্রেপ্তার করা হয়। বলতে কি, সিপাহিদের দ্বারা মুক্ত জিয়া অতি দ্রুত প্রতিবিপ্লবী পথে এগিয়ে যান এবং এসব গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রতিবিপ্লব জয়ী হয়।

কর্নেল তাহেরকে মুক্ত করতেই কি ভারতীয় দূতাবাসে অভিযান চালিয়েছিলেন?

নেতাদের মুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ কাউকে জিম্মি করা হবে, এটি পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত ছিল, যাতে টিভি বা বেতারে প্রকৃত ঘটনা আমরা দেশবাসীকে জানাতে পারি। ‘জাসদ ভারতের চর’— সরকারের এই প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে দেশবাসীর বিশ্বাস অর্জনের জন্য অন্য দূতাবাসের বদলে ২৬ নভেম্বর ভারতীয় দূতাবাসে অভিযান চালানো হলো। কর্নেল তাহেরের দুই ভাই বাহার (সাখাওয়াত  হোসেন, বীরপ্রতীক), বেলালসহ (ওয়ারেসাত হোসেন, বীরপ্রতীক) গণবাহিনীর ছয় সদস্য তাতে অংশ নেন। আগে রেকি করা হলেও তাঁদের জানা ছিল না, সেখানে ১২ জন সশস্ত্র ভারতীয় রক্ষী আছেন। ভীতসন্ত্রস্ত রাষ্ট্রদূত সমর সেনকে দুজন দুই পাশ থেকে ধরে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলেন। দলনেতা বাহার পেছন থেকে তাঁকে রিভলবার ধরে বারবার বলছিলেন, কেউ গুলি করবেন না। তাহলে আমরাও গুলি চালাতে বাধ্য হব। তবে নিচে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রক্ষীরা গুলি করলেন। ফলে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত নিজেও আহত হলেন। আমার ভাই বাহারসহ চারজন সাথি মারা গেলেন। আরেক ভাই বেলাল আহত হলো। সবুজও আহত হলো। চিফ অব স্টাফ জেনারেল এ কে এম মঞ্জুর ত্বরিত তাঁদের গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনীর আয়ত্তে নিয়ে এসে সিএমএইচে ও পরে কারাগারে পাঠিয়ে দিলেন।

আপনি কিভাবে গ্রেপ্তার হলেন?

১৯৭৬ সালের ১৫ মার্চ সেনা গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আমি গ্রেপ্তার হয়ে যাই। আমাকে ডিজিএফআইয়ের সেফ হৌলে তিন মাস রাখা হলো। সারাক্ষণ চোখ বেঁধে রাখত। গ্রেপ্তারের পর ছবি তোলার জন্য নিয়ে যাচ্ছে, পাশ থেকে একজন কানে কানে বললেন—স্যার, আমি বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্য। কোনো চিন্তা করবেন না। পরদিন তিনজন উচ্চপদস্থ অফিসার আড়াই ঘণ্টা ইন্টারোগেশন করলেন। তাঁরা বলেছেন, ‘এখনো সময় আছে। আপনার ভাইকে বুঝিয়ে বলুন, আমরা সবাই মিলে আসুন একটি দল করি। ’ উত্তরে বলেছি, ‘কিসের দল করব? আমাদের দল তো আছেই। ’ আমার ছোট্ট ডায়েরিতে তাঁরা অনেক সভার তারিখ পেলেন। তবে নামগুলো ছিল না, সেগুলো জানতে চাইলেন। বললাম, ‘যাঁরা আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন, তাঁদের নাম বলব? আমাকে মেরে ফেলতে পারেন, কিন্তু আশ্রয়দাতাদের নাম কখনোই বলব না। দ্বিতীয়বার এই প্রশ্নও করবেন না। ’ করেননি। যেদিন আমাকে কোর্টে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, সেদিন একজন সৈন্য জানালেন, আপনাদের সামনে ভীষণ বিপদ।  

কী বিপদ?

কর্নেল তাহেরের মামলা সাজানো, তাঁর ফাঁসি—সব ঠিক হয়ে গেছে। আমার তিন মাসের বন্দিদশা না দেখিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হাজতি হিসেবে নিয়ে যাওয়া হলো। ১৯৭৬ সালের জুনে গোপন বিচার শুরু হলো। ১৭ জুলাই রায় হলো। আমার ১০ বছরের কারাদণ্ড, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, অনাদায়ে আরো দুই বছরের জেল হলো। ইউসুফ ও জলিল ভাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের কারণে সাজা কমিয়ে তাঁদের যাবজ্জীবন করা হলো! অথচ সেক্টর কমান্ডার যুদ্ধাহত বীর-উত্তম কর্নেল তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো!  

জিয়াউর রহমান বিষয়ে কর্নেল তাহের কিছু বলেছেন?

তাঁর সেই বিখ্যাত জবানবন্দিতেই আছে—সে মীরজাফর। তার পরিণতি হবে খুব ভয়াবহ। কারণ সে পেছন থেকে আমাদের ছুরিকাঘাত করেছে। এই বিশ্বাসঘাতকতার একটিই নিদর্শন আছে। মীরজাফর সেটি করেছে। কিন্তু এখন তো স্বাধীন বাংলাদেশ হয়েছে। এখানে সে পার পাবে না। তাঁর মৃত্যুও তো করুণ! ফাঁসির আগের দিন আমি, বেলাল ও ইউসুফ ভাই তাঁর সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করেছি। প্রাণভিক্ষার আবেদন করলে সেটি মঞ্জুর হতে পারে—এই সম্ভাবনার কথা শুনে মেজর জলিল আমাকে বলেছিলেন, আমি যেন তাহের ভাইকে তা বলি। তবে জলিল ভাইকে বলেছিলাম, আমি সেটি বলতে পারব না এবং তা করা ঠিকও হবে না। তাহের ভাইকে এ কথা বলার পর তিনি পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘ঠিকই বলেছ। ’ সেদিন তাঁর কাছে মিনিট বিশেক ছিলাম। যেন বেশিক্ষণ থাকতে পারি, সে জন্য তিনি আমাকে চা খাওয়াতে বললেন। তিনি বললেন, ‘আজ রাতে আমার ফাঁসি হবে। আমি প্রস্তুত। ’ আরো বললেন, ‘আমরা সমাজতন্ত্র চাই। একটি উন্নত ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। সে জন্য আত্মত্যাগ প্রয়োজন। ঘটনাচক্রে আমাকেই তা দিতে হচ্ছে। তাতে যে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হবে, সেটি তোমাদের কাজে লাগাতে হবে। তোমরা ও জাসদ তা পারবে। ’ জাসদের ওপর তাঁর খুব আস্থা ছিল। তিনি বললেন, একটি চিঠি লিখেছি, পড়ে শোনাই। এটিই তাঁর সেই বিখ্যাত শেষ চিঠি। গোপনে এটি কারাগারের বাইরে চলে গিয়েছিল। প্রকাশিতও হয়েছে। একটি খাতা থেকে নিয়ে তিনি আমার প্রিয় বাবা, মা, প্রিয় লুত্ফা (তাহের) এসব বলে পুরোটি আমাকে পাঠ করে শোনালেন।

ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি কী বলেছিলেন?

‘নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে জীবনে আর বড় কোনো সম্পদ নেই। আমি তার অধিকারী। আমি আমার জাতিকে তা অর্জন করতে ডাক দিয়ে যাই। ’

সেই রাতের কথা মনে আছে?

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আমরা সবাই জেগে আছি। আমি পুরনো ২০ সেলে। পুরো কারাগারের হাজার হাজার সাধারণ রাজবন্দির কেউই খাননি। ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই শেষ রাতে ফ্লাশলাইট জ্বলে উঠল। রাত ৪টায় মুক্তিযোদ্ধা, বীর-উত্তম কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর হলো। একজন সিপাহি আমার সেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললাম, কী খবর? তিনি কিছুই বললেন না। তাঁর চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরছিল। আমি বুঝলাম, আমার ভাইয়ের ফাঁসি হয়ে গেছে।

তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা?

সকাল ৯টায় আমাকে বলা হলো—লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে। আমাদের তিন ভাইকে এক এক করে লাশ দেখাতে নিয়ে গেল। মর্গে যাওয়ার সময় কারাগারের বাগান থেকে একটি ফুল তুলে নিলাম। টেবিলের ওপর ‘ভাইজান’-এর লাশ শোয়ানো আছে। তাঁর শরীর সেলাই করা। তিনি ঘুমিয়ে আছেন। ফাঁসির পর চেহারা যে বিকৃত হয়, তার চিহ্নমাত্র নেই। আমি মুক্তিযুদ্ধে আমার নেতা, এ দেশের মানুষের জন্য জীবন দেওয়া আমার ভাইকে স্যালুট করলাম। তাঁর বুকের ওপর ফুলটি দিলাম। ইউসুফ ভাই তাঁর সাদা পাঞ্জাবি খুলে আগেই তাঁর শরীরের রক্ত মেখে নিয়ে এসেছিলেন। সেই রক্তমাখা পাঞ্জাবি ভাবির কাছে এখনো আছে।

শ্রুতলিখন : মাসুদ রানা আশিক
(১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, শহীদ মুনীর চৌধুরী ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)


মন্তব্য