kalerkantho


দুই নম্বরে আমার বিশ্বাস নেই

টাটানগর ঘুরে বদলে গেল এক কিশোরের জীবন। পাঁচ পুরুষের ওকালতির দিকে তো গেলই না, ভালো চাকরিও একসময় ছেড়ে দিল। এক মাসের বেতন মাত্র সম্বল করে কিভাবে শুরু হলো তাঁর সংগ্রাম? বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পোদ্যোক্তা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর ব্যবসাবৃত্তান্ত শুনেছেন ফারজানা লাবনী ও ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দুই নম্বরে আমার বিশ্বাস নেই

ব্যবসা কিভাবে শুরু করেছিলেন?

মানুষটি লম্বা চওড়া, ছয় ফুট তিন ইঞ্চি। ফরাসি, নাম রেমন্ড ক্লেয়ার। ১৯৭২ সালের এপ্রিল কি মে মাসে এক পার্টিতে পরিচয়। পরস্পরকে ভালো লেগে গেল। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী করেন?’ বললাম, ‘ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকোর ঢাকা অফিসের দ্বিতীয় কর্তাব্যক্তি। আপনি? ‘চামড়ার ব্যবসা করি। ’ সেই প্রথম জানলাম, চামড়ার ব্যবসা করা যায়! ‘সে আবার কী?’ ‘বাংলাদেশ থেকে চামড়া কিনে নিয়ে যাই। ’ হঠাত্ মনে পড়ল, চট্টগ্রাম বন্দর তো বন্ধ, পাকিস্তানিরা যাতে সাহায্য পেতে না পারে, যুদ্ধের সময় তাই ভারতীয় বোমারু বিমান সব জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে। তাহলে কিভাবে বিদেশে নেন? ক্লেয়ার খোলাসা করলেন, ‘কার্গো বিমান ভাড়া করে নিয়ে যাই। ওগুলো বিক্রি করে ট্যানারির কেমিক্যাল কিনি। সেগুলো এখানে বিক্রি করি।

’ আমার আগ্রহ হলো না।

কেন? ছোটকাল থেকেই তো আপনার ব্যবসার নেশা?

হ্যাঁ, বাবা ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধান বিচারপতি স্যার সৈয়দ নাসিম আলী, বড় ভাই এস এ মাসুদ এলাহী কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। পাঁচ পুরুষের আইন পেশা হলেও ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা মানে শিল্প-কারখানা গড়ার দিকে আমার ঝোঁক। সেটি হয়েছিল নাইনে পড়ার সময়। ভারতের রাঁচিতে বোর্ডিং স্কুলে পড়ি। গ্রীষ্মের লম্বা বন্ধে বাড়ি ফিরব—জার্মান বন্ধু বলল, ‘চলো আমাদের টাটানগর বেড়াবে। ’ অনেক বন্ধু সেখানে থাকে, শহরটি দেখার লোভ হলো। দুজনে গেলাম। ছোট্ট ছিমছাম শহর, পুরোটা টাটার শিল্প-কারখানায় ছড়ানো। বাস, ট্রাক, লরি, ডিজেল ইঞ্জিনের কারখানা আছে। সেই ১৮৮০ সালে তারা লৌহ-ইস্পাত কারখানা গড়েছে। সব ঘুরে দেখলাম। জার্মানির সঙ্গে প্রাযুক্তিক সহায়তায় কারখানাগুলো চলছে। বিরাট কলোনিতে কয়েক হাজার জার্মান থাকে। পৌরসভাটি ভারতের সরকার নয়, টাটা পরিচালনা করে। তাদের সব প্রতিষ্ঠান, পুরো শহর ঝাঁ তকতকে। ১৯৫৭ কি ১৯৫৮ সালের সেই দৃশ্যগুলোই বদলে দিল আমাকে।

পরে তো টাটার জীবনী পড়লেন?

জামসেদজি টাটার ওপর তিন-চারটি বই পেলাম, পড়লাম। জেনেছি, টাটা মানে কখনো আপস করে না, কোনো দিনও কর ফাঁকি দেয় না—পুরোপুরি করপোরেট কালচারে চলে। হোটেল থেকে শুরু করে কী নেই তাদের? তাদের সিএসআরে (করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি) সবচেয়ে উদ্দীপ্ত হয়েছি। আরো অনেক উদ্যোক্তাই তো ছিলেন, তার পরও ব্রিটিশ আমলেই তারা ভারতের বেঙ্গালুরুতে ইন্ডিয়ান সায়েন্স একাডেমি করেছে। মুম্বাইয়ে তাদের ক্যান্সার ইনস্টিটিউট আছে। টাটা ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটে তারা দেশ সেরা গ্র্যাজুয়েটদের প্রশিক্ষণ, ডিগ্রি দেয়। চাইলে তাঁরা টাটার চাকরিতে যোগ দিতে পারেন। নানাভাবে ভারতবাসী, বিশ্বের অর্থনীতি ও মানুষের জন্য অবদান রেখে চলেছে টাটার প্রতিষ্ঠানগুলো। সেই থেকে স্বপ্ন দেখতাম, তাঁর মতো কারখানা গড়ব। কয়েক হাজার শ্রমিক, তাঁদের পরিবারকে সাহায্য করব। জীবনের প্রয়োজনে, লগ্নির অভাবে চাকরি করলেও সব সময়ই অনুভব করেছি, চাকরি করে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখা সম্ভব নয়, আমাদের উদ্যোক্তা প্রয়োজন, যাঁরা চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করবেন।

কিভাবে সে সুযোগ এলো?

রেমন্ড ক্লেয়ার সরাসরি প্রস্তাব করলেন, ‘আমার সঙ্গে যোগ দেবেন?’ তাঁর ইংরেজি তো তত ভালো নয়, আমি বেশ ভালো ছাত্র ছিলাম। সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২২ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে গড়ে ৮০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়ে ডিস্টিংশনসহ ‘সপ্তম’ হয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এমএ করেছি। বললাম, ‘চামড়া ব্যবসার কিছুই তো বুঝি না। ’ উত্তর দিলেন, ‘ফ্রান্সে নিয়ে গিয়ে সপ্তাহখানেক ট্যানারিতে রেখে দিলেই দরকারি সব শিখে ফেলবেন। ’ আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কেন আমাকে নিতে চান?’ ‘পাইলটের পাশের ছোট্ট সিটে সপ্তাহে দুইবার ঢাকা-প্যারিসের লম্বা বিমানভ্রমণ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছি, বয়সও হয়েছে। ’ ‘কাজটা কী?’ ‘মাল ঠিকমতো প্লেনে উঠছে কি না, ট্যানারির কেমিক্যালের হিসাব রাখা, বিক্রি—সব দেখাশোনা করবেন। আপনি আমার বাংলাদেশ এজেন্ট হবেন। দুই ক্ষেত্রেই কমিশন পাবেন। ’ হিসাব কষে দেখলাম, লাভের অঙ্ক অনেক।

তাই বলে ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকোর বাংলাদেশের দুই নম্বর ব্যক্তির চাকরি ছেড়ে দেবেন? 

বাসায় ফিরে স্ত্রীর সঙ্গে আলাপের পর ঠিক এ কারণেই তিনি খেপে লাল হয়ে গেলেন। অনেকেই তাঁকে চেনেন—সানবিমস স্কুলের অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর। বঙ্গবন্ধু সমাজতন্ত্র কায়েমের স্বপ্নে দেশে ফিরে সর্বোচ্চ বেতন ২০ হাজার টাকা ধার্য করলেন। ৯০ হাজার টাকার কাছাকাছি পেতাম, হয়ে গেল ১৫! সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে, সদ্য স্বাধীন দেশে ব্যবসার প্রচুর সুযোগ দেখে পুরনো স্বপ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আমি মনে করি, সবারই স্বপ্ন দেখা উচিত। তবে স্ত্রী বেঁকে বসল, ‘আগের অভ্যস্ত জীবন থেকে সরে এসে কষ্ট তো আমাদের একার হচ্ছে না। সবাই যেভাবে কষ্ট করে চলছে, আমরাও চলব। ছোট দুটি শিশুসন্তানকে (সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর ও মুনিজ মঞ্জুর) অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে? তোমার কী অভিজ্ঞতা আছে যে সফল হবে?’ ভাইয়েরাও খুব খেপে গেলেন, বংশের কেউ ব্যবসা করেনি, খুব বাজে পেশা, ব্যবসায়ী মানে কর ফাঁকি দেয়—আরো অনেক খারাপ কাজ করে, ভুলে যা। তাঁরা পাত্তাই দিলেন না। আমিও কিছু বলতে পারলাম না, সেই চার বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে তিন ভাই, ভাবিদের হাতেই তো মানুষ। তাঁরা আমাকে ভালো স্কুলে পড়িয়েছেন, মা (শরীফা আলী), বাবার অভাব বুঝতে দেননি।        

পাশে দাঁড়ালেন কে?

শ্বশুর, ড. মফিজ আলী চৌধুরী। তিনি ১৯৪৯ সালে সরকারি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফলিত রসায়নে পিএইচডি, ১৯৭৩ সালে সরকারের প্রাকৃতিক সম্পদ, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি গবেষণা এবং আণবিক শক্তি দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। নানা অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। বললেন, ‘বুদ্ধিটা খারাপ না, আরো খোঁজ খবর নাও। ’ নিলাম, তিনিও ফ্রান্সে যোগাযোগ করে, চামড়া বিক্রি, কেমিক্যাল কেনা—সব জেনে বললেন, ‘ভালো কম্পানি, ঘাপলা তো দেখি না। ঠিক আছে, পদত্যাগ করো। ’ তিনি তাঁর মেয়েকে রাজি করালেন। একটি স্যুটকেস নিয়ে পাকিস্তান টোব্যাকোতে ১৯৬৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘ম্যানেজমেন্ট প্রবেশনার’ হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম, পাকিস্তানের মূল শাখা করাচিতে ছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের আগে তারাই লন্ডনে বদলি করেছিল, যুদ্ধের পর আবার দেশে কম্পানি পুনর্গঠনের জন্য দেশে বদলি করেছে, সেই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে পাঁচ-ছয়টি স্যুটকেস নিয়ে ১৯৭২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বেরিয়ে গেলাম। পোশাক-আশাক বাদে সব সুবিধাই তারা দিত। ফোন করলে ঘরের বাতিটিও লাগিয়ে দিত, বিছানার চাদরও তাদের। ৩০তম জন্মদিনে সেই চাকরি ছেড়ে দিলাম।

তখন আপনার পুঁজি কত?

(দীর্ঘশ্বাস), বিচিত্র নিয়ম ছিল, যেহেতু হেড অফিস ব্রিটেনে, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও পেনশনের টাকা তখনো করাচির অফিসে; পরে সে টাকা দিলেও এক মাসের বেতন মানে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে ব্যবসায় নামলাম। ইন্দিরা রোডের বাসায় উঠলাম। আয়ের সব টাকা স্ত্রীকে দিয়ে দিলে তো পুঁজি তৈরি করতে পারব না, ফলে বললাম, ‘তুমি কিছু একটা করো, সংসার চালাও। আমায় বিরক্ত করো না। ’ সে মেপললিফ ইন্টারন্যাশনালে যোগ দিল। ওরা কত আর দেবে? আমাকেও দিতে হতো।

খুব পরিশ্রম গেছে?

‘স্কিন’ মানে যে গরুর চামড়া তা-ও জানি না, সেই আমি হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো ঘুরে চামড়া কিনে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করাই। কাঁচা চামড়া কিনে ড্রামে কেমিক্যাল মিশিয়ে গন্ধ দূর করে রপ্তানির উপযোগী করি। একে আমরা ‘ওয়েট ব্লু’ বলি। রাতে এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে থাকি। ১০টায় বিমান আসে, কোনো দিন আরো দেরি করে। প্লেন থেকে কেমিক্যাল নামাই, চামড়া তুলে দিই। কেমিক্যাল বিক্রি করি। ১৭-১৮ ঘণ্টা কাজ করতে হতো। পারিবারিক জীবনে প্রচণ্ড প্রভাব পড়লেও কোনো অসুবিধার কথা আমার পরিবার বলেনি।

ট্যানারি কিনলেন কিভাবে?

স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত এ দেশের চামড়াশিল্প পাঞ্জাবিরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করত। অন্য কাউকে ব্যবসায় আসতে দিত না। স্বাধীনতার পর সব ট্যানারি খালি পড়ে রইল। সরকার ‘ট্যানারিজ করপোরেশন’ করে সবগুলো জাতীয়করণ করল। তবে দুর্নীতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো খুব লোকসান করল। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে প্রথমেই এগুলো বেসরকারি খাতে দিয়ে দিলেন। নিলাম হলো। ১২ লাখ ২২ হাজার ২২২ টাকায় সর্বোচ্চ নিলাম ডেকে তিন বিঘা জমিতে কারখানাসহ ‘ওরিয়েন্ট ট্যানারি’ কিনলাম। এটিই এ দেশের বেসরকারি খাতের প্রথম ট্যানারি। এখন সেটি ‘এপেক্স ট্যানারি’, হাজারীবাগেরই ট্যানারি।

ট্যানারি চালানোর টাকা কিভাবে জোগাড় হলো?

৬০ জন শ্রমিকের বেতনসহ ট্যানারি চালাতে তো পুঁজি লাগবে। আগের লেনদেনের সূত্রে অনেক ব্যাংক কর্মকর্তাকেই চিনি। কিন্তু যাঁর কাছেই যাই, বলেন, ‘সম্পত্তি বন্ধক দেবেন?’ ‘নিজের তো সম্পদ নেই, বাবার যেটুকু আছে, ভাই-বোনরাও তো মালিক, আমি কিভাবে দেব?’ ‘আপনার মুখ দেখে তো টাকা দিতে পারব না। ’ ‘দুই-তিন বছর যে লেনদেন করলাম, আপনাদের কমিশন এলো, সেসবের কোনো দাম নেই?’ ‘আছে, কিন্তু সেখানে তো আমরা টাকা দিইনি, আপনার টাকা। ’ কেউই আমাকে ঋণ দেয় না। মনে আছে, ১৯৭৫ সালের ১৭ বা ১৮ আগস্ট মতিঝিলের স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সামনে দিয়ে রিকশায় যাচ্ছি। ভারতবিদ্বেষী মনোভাব তখন তুঙ্গে, ব্যাংকটির সামনে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তা, গেটে তালা ঝোলানো। লাঞ্চ ব্রেকের আগে পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়লাম। মাস দুই-তিনেক বয়সী বাংলাদেশ শাখার প্রথম ম্যানেজার পিনাকী বাগচী পত্রিকা পড়ছেন, তাঁর তো কোনো ক্লায়েন্ট নেই। সব খুলে বলার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী চান?’ ‘নগদ পুঁজি। ’ কত? ‘চার লাখ। ’ ‘এক লাখ পারব। এর বেশি হলে মুম্বাইয়ের সদর দপ্তরে আবেদন করতে হবে। ’ ‘এক লাখে কিচ্ছু হবে না। চার লাখই লাগবে। ’ আবেদনপত্র জমা দিলাম। দেশের যে পরিস্থিতি ভারতীয় ব্যাংক থেকে ঋণ পাব কী পাব না—এই শঙ্কায় বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করতে লাগলাম। তবে কারোরই অবস্থা ভালো না। কে টাকা দেবে? আবেদনের কথা ভুলেই গেলাম। সপ্তাহ দুই-তিনেক পর বাগচী সাহেব ফোন দিলেন, ‘আসুন। ’ গেলাম। আমাকে বিষ্মিত করে দিয়ে বললেন, ‘আপনার ঋণ মঞ্জুর হয়েছে। ’ ‘কিন্তু বন্ধক তো দিতে পারব না। ’ ‘দরকার নেই, এ দেশে আমাদের ব্যবসা করা প্রয়োজন। আপনাকে দিয়েই শুরু করব। ’ আমার অ্যাকাউন্ট নম্বর ‘এক’। ব্যাংকের প্রথম ম্যানেজার পিনাকী সাহেব খুব সহযোগিতা করেছেন। পরের সব ম্যানেজারও খুব করেছেন। এপেক্স ট্যানারিতে তাঁদের অংশগ্রহণ সারা জীবন আমার মনে থাকবে। এখনো হেড অফিসের কোনো বড় কর্মকর্তা এলে তাঁরা দাওয়াত করেন। যদিও আমার এখন অ্যাকাউন্ট নেই!

কিভাবে সফল হলেন?

সাত-আট বছর প্রচুর খাটনি গেছে। সত্ভাবে ব্যবসা করতে গেলে পরিশ্রমের বিকল্প নেই। কাঁচা চামড়ায় কেমিক্যাল

মিশিয়ে ড্রামে রেখে পশম ফেলে সেগুলো রপ্তানি করতাম। ১৯৮২ সালে গরুর চামড়া রপ্তানিতে গেলাম। সে চামড়া ওই অবস্থায় আনতে প্রাযুক্তিক সহায়তা লাগে। সে জন্য আমার আরো পুঁজি দরকার। এপেক্সকে পাবলিক লিমিটেড কম্পানি করলাম। সে টাকায় ইতালি থেকে দামি যন্ত্রপাতি কিনলাম। ওয়েট ব্লু’র পরের ধাপ ক্রাস্টিংয়ে বাংলাদেশে আমিই প্রথম। যন্ত্রপাতির মাধ্যমে চামড়াকে পাতলা, আরো দুর্গন্ধমুক্ত এবং তেল চকচকে করা হয়। এই চামড়া নিয়ে ইউরোপে যাওয়ার পর কেউ তো বিশ্বাস করেন না। বলেন, ‘নিশ্চয়ই ভারত থেকে নমুনা নিয়ে এসেছেন। আপনার দেশে তো কেউ এই চামড়া তৈরি করেন না। ’ বুঝিয়ে বলার পরও তাঁদের প্রশ্ন, বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদনের গ্যারান্টি? আপনার তো কোনো অভিজ্ঞতা নেই। সে-ও অনেক কষ্টের গল্প। ঢাকা থেকে বহুবার ইতালি, প্যারিসে আসা-যাওয়া করতে হয়েছে। পরে যখন বাংলাদেশ ফুটওয়্যার লেদার গুডস ম্যাপে প্রবেশের চেষ্টা করেছে, সেখানেও লেদারকে সে মানচিত্রে সংযোজনের জন্য আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।

ঝুঁকি কেমন নিতে হয়েছে?

যে দরে মাল দেব, সেই অঙ্গীকার রাখতে গিয়ে এপেক্স ট্যানারিতে তিনবার আর্থিক সংকটে ভুগেছি। একবার এখানে কাঁচামালের দাম হঠাত্ বেড়ে গেল। তবে চুক্তি আগের কম দামে করা। এই দামে কাঁচামাল পাঠালে শুধু আমারই নয়, পুরো হাজারীবাগেরই বিশাল লোকসান হবে। সব ট্যানারি মালিক বিদেশি ক্রেতাদের বললেন, দাম না বাড়ালে পণ্য সরবরাহ করব না। তবে আমরাই একমাত্র ট্যানারি, যারা চুক্তিকে চুক্তি মেনে পণ্য রপ্তানি করেছি। আমার অফিসের সবাই বলেছিলেন, স্যার খুব লোকসান হয়ে যাবে। বলেছি, মুখের কথায় নয়, আমি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছি। তাঁরা ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতেই বলেছেন, স্যার সবাই যেখানে ৫ থেকে ১০ শতাংশ দাম বাড়ানোর দাবি তুলছেন, সে অবস্থায় কেন আপনি রপ্তানিতে যাবেন? তার পরও লোকসান গুনে অঙ্গীকার রাখতে গিয়ে আমার খুব ক্ষতি হয়ে গেল; কিন্তু অঙ্গীকার রক্ষার ভালো দিক হলো—এখানে পণ্যের দাম পড়ে গেলে সব চুক্তির অফার আমার কাছেই এলো, অন্য ট্যানারিগুলোর কাছে নয়। বিদেশিরা তো আমার আগের অঙ্গীকার মনে রেখেছেন। তখন পুরো হাজারীবাগের সব ট্যানারি মালিক এসে ‘স্যার আমাদের দাম আরেকটু বেশি দেন’ বলার পর বিদেশিরা বলেছেন, আপনারা আগেরবার দাম বাড়ানোর আন্দোলন করেছেন, এবার দাম কমান। সুনাম, কঠোর পরিশ্রম ও অঙ্গীকার রক্ষাই ব্যবসায়ীর মূলধন, আর সবচেয়ে বড় বন্ধু ব্যাংক। যে দিন টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন, সেই দিনই ফেরত দিতে হবে—এ কথাটি সব সময়ই বলি। সব তো গ্রাহকের টাকা। আমিও তো মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান। মানুষের টাকাই তো আমরা খাটাই। রপ্তানিমুখী শিল্প হলে বিদেশিদের সঙ্গে যেকোনো মূল্যে অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে। আপনার অজুহাতে তাঁদের কোনো আগ্রহ নেই। ব্যবসায় কুইক মানি বলে কিছু নেই, টাকা দ্রুত আসে, চলেও যায়।

শুরুতে উত্পাদনক্ষমতা কেমন ছিল? এখন?

শুরুতে দুই-তিন লাখ স্কয়ার ফুট বকরির চামড়া রপ্তানি করতাম। এখন বকরি ও গরু ১০ লাখ করে মোট ২০ লাখ স্কয়ার ফুট রপ্তানি করি। চামড়া রপ্তানির ধারাবাহিকতায় জুতা, চামড়াজাত বিভিন্ন উপকরণ তৈরি শুরু করেছি।

এপেক্স ফুটওয়্যার কিভাবে হলো?

জাপানে আমার খুব ভালো মার্কেট ছিল, এখনো আছে। জাপানি এজেন্ট মারুটুমি বললেন, ‘চামড়া রপ্তানি করছেন, জুতা তৈরি করেন না কেন? আমার দেশের কারখানাগুলো তো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ’ তাদের তরুণরা জুতার কারখানায় কাজ করতে চান না, হোটেল বা হাইটেক কম্পানিতে কাজ করতে চান, শ্রমিক মজুরিও অনেক। বললাম, ‘কারখানা করব, জুতা কিনবে কে?’ ‘কেন? আমি। ’ ১৯৯০ সালে এপেক্স ফুটওয়্যারের জন্ম হলো। প্রতিদিন আট ঘণ্টায় এক হাজার জোড়া জুতা তৈরি করতাম। এর নিচে উত্পাদনের যন্ত্রপাতি নেই। জাপানে রপ্তানি করতাম। তাদের টেকনিশিয়ান, কোয়ালিটি কন্ট্রোলার এখানে এসে কাজ করতে লাগলেন। তাঁদের দেওয়া ডিজাইনে পণ্য তৈরি করতাম। আমাদের শ্রমিকদের দক্ষতা ধীরে ধীরে বাড়ল। জাপানে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর ১৯৯২ সালে মারুটুমির হাজারখানেক দোকান ছিল বন্ধ হয়ে গেল। তিনি স্রেফ দেউলিয়া হয়ে গেলেন। আমার মাথায় বাজ পড়ল। বিদেশ থেকে অর্ডার আসাই বন্ধ! তওবা করলাম, কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকব না, বিভিন্ন দেশে যাব। ফলে এপেক্স ইউরোপে গেল। ইউরোপ, ইউরোপই।  

ওরিয়েন্ট থেকে এপেক্স নাম কেন নিলেন?

এপেক্স মানে উচ্চতম, শীর্ষে। খারাপ বা ভালো গুণ যেটিই মনে করুন—আমি প্রথম হতে চাই, দুই নম্বরে আমার বিশ্বাস নেই। বাংলাদেশে চামড়া খাতে আমরাই এক নম্বর। অনেক জায়গায় বলি না, বিদেশে রপ্তানি ও স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রিতে আমরা ‘বাটা’ থেকেও এগিয়ে।

প্রবল এই প্রতিপক্ষকে কিভাবে সামলেছেন?

বাজার গবেষণা করে কৌশল করলাম—ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, আলাদা ডিজাইনের চামড়ার জুতা বিক্রি করব। অনেকের ধারণা, বাটার বেশির ভাগ পণ্য প্লাস্টিকের। সেগুলোতে চামড়ার আরাম পাওয়া যায় না। বাটার জুতার গড় দাম ২৯০ টাকা, আমাদের প্রায় ৯০০। দামের এত হেরফেরের কারণ আমাদের মান ও ডিজাইন। মান আমরা ধরে রাখতে চাই। বাটা সস্তায় চপ্পল করে। অনেকে বলেছেন, দামি চামড়ার জুতাই নয়, আরো পণ্য দিন, তখন আমাদেরও চপ্পলে যেতে হয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উদাহরণ দিই—বছর পাঁচেক আগে মফস্বলের ছোট্ট এক শহরে পণ্য দেওয়া শুরু করলাম। ভেবেছিলাম, সেখানকার মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আর কী? ৬০০-৭০০ টাকার বেশি কোনো পণ্য দেব না। বাটার জুতা খুব বিক্রি হলেও আমাদেরগুলো তেমন হচ্ছে না। শাখাটির ম্যানেজারকে তলবের পর বললেন, ক্রেতারা বলেন, আপনাদের চেয়ে সস্তায় একই জুতা বাটা থেকে কিনতে পারি। তিনি বললেন, ‘স্যার আরেকটু দামি জুতা দিন। ’ আমি তো অবাক, ‘এত অল্প দামের জুতা বিক্রি করতে পারেন না, আরো দামি করবেন? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘ক্রেতারা মানসম্পন্ন পণ্য চায়, প্লাস্টিকের নয়। মানসম্পন্ন জুতা দিন। ’ ১২০০-১৩০০ টাকার জুতা দিলাম। ধাঁ করে বিক্রি বেড়ে গেল। মোদ্দা কথা, মান ও দোকানের সার্ভিসে আমরা বাটার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা করি। বাটা সেলস সেন্টারগুলোর কর্মীদের বেতন দেয়। আমরা বেতন খুব কম দিই। যাঁরা যত বিক্রি করতে পারেন, তাঁরা তত কমিশন পান। বাটার যেকোনো সেলস সেন্টার দুই-তিন বছর পর পর নতুন করে সাজায়। আমরা তা অনুসরণ করি। বৈচিত্র্যপূর্ণ পণ্যের সমাবেশ ঘটাই। আজকাল তো ক্রেতারা ঘন ঘন সেলস সেন্টারে আসেন। তখন বলেন, এক জুতা কয়বার দেখাবেন? নতুন কী আছে? আমাদের ইন হাউস ডিজাইন সেন্টার আছে। ভারতে কিন্তু ফুটওয়্যার ডিজাইন সেন্টার আছে। সরকারকে অনেকবার অনুরোধ করেছি, তারাও রাজি। ইতালির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সেন্টার স্থাপনের কথা বলছে। আমাদের চামড়াশিল্পে ইতালিই সেরা। চীন যতই বলুক, ইতালির কোয়ালিটি দিতে পারে না। জাপানি বা চীনা ও ইতালিয়ানদের মতো সৃজনশীলতা নেই।

ট্যানারি থেকে বিভিন্ন খাতে ব্যবসা কিভাবে ছড়িয়েছেন?

এরপর এপেক্স ফার্মা করলাম। অভিজ্ঞ সিইও (চিফ অপারেটিং অফিসার) পেয়েছিলাম। তবে যতটা মনে করেছিলাম, ওষুধশিল্প তত সহজ নয়। এ তো ভোগ্যপণ্য নয়, ট্যাবলেট বা সিরাপ বিক্রি করতে ডাক্তারদের সন্তুষ্ট করতে হয়। মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভের চিকিত্সকের সন্তুষ্ট করার যোগ্যতা না থাকলে তিনি তো তাঁর কম্পানির ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখবেন না। যত বেশি ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লেখা হবে, তত সেই ফার্মাসিউটিক্যালসের সাফল্য। তবে চিকিত্সকসমাজকে সন্তুষ্ট করা খুব কঠিন। এর ভবিষ্যত্ ভালো। ১৫ কোটি বাঙালির এই দেশে কিছু হলেই তো মানুষ ডাক্তারের কাছে ছোটে। আমি সেই দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে ভুগছি। তবে এই খাতেও সাফল্যের চেষ্টা করছি। ব্লু ওশান ফুটওয়্যার হলো তাইওয়ানের সঙ্গে আমাদের যৌথ উদ্যোগ। সেখানে তাইওয়ানিজ-চীনাদের ‘গ্রিন ল্যান্ড’ নামের বিশাল এক কম্পানি আছে। চীনে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় তারা ভিয়েতনামে ব্যবসা শুরু করল। সেখানে লোকেরা চাকরি করে। শ্রমিক খুঁজে না পেয়ে বাংলাদেশে এসে আমাকে খুঁজে বের করল। বললাম, ‘আমার তো সময় নেই, অন্য ব্যবসা আছে। ’ তাঁরা বললেন, সময় প্রয়োজন নেই, আপনার সম্পর্কে খোঁজ নিয়েই এসেছি। আমাদের স্থানীয় অংশীদার প্রয়োজন। আমরা এই কম্পানিতে লগ্নি করেছি, তারাই প্রতিষ্ঠান চালায়। বোর্ড মিটিংয়ে থাকি। জুতা তৈরি হয়, সব বিদেশে রপ্তানি হয়। ল্যান্ডমার্ক নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মালিক নিজেই এসে কম্পানি বিক্রি করলেন। এখানে জাপানের জন্য জুতা তৈরি করি। এপেক্সও জাপানের জন্য জুতা তৈরি করে। তবে ক্রেতা আলাদা। এপেক্স ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে আমরা শেয়ার কেনাবেচা করি। এখন এটি খুব লোকসানে আছে। ‘কোয়ান্টাম’-এর মাধ্যমে একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে বাজার গবেষণা করি। ‘গ্রে অ্যাডভারটাইজিং’-এর আমি চেয়ারম্যান, শেয়ার আছে। মালিক নই। এটিও আমেরিকান কম্পানি। তারাও সত্ ব্যবসায়িক অংশীদারের খোঁজে আমার কাছে এসেছিল।

এখন আপনার অধীনে কত শ্রমিক আছেন?

প্রায় ৯ হাজার মানুষের পরিবারকে আমি প্রতিপালনের সৌভাগ্য অর্জন করেছি।

শ্রুতলিখন : মাসুদ রানা আশিক
(১৯ নভেম্বর, ২০১৭, গুলশান-১, ঢাকা)


মন্তব্য