kalerkantho


একাত্তরে বাঙালি অন্য রকম ছিল

সাধারণ সৈনিকদের নেতৃত্ব হাতে তুলে নিয়ে টানা আট ঘণ্টা যুদ্ধ করে বেরিয়ে এলেন যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে। এরপর দেশের ভেতরেই হানাদারদের মোকাবেলা করেছেন মে পর্যন্ত। বেনাপোলের অতি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত স্বাধীন রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আলোচিত অপারেশন কামালপুর যুদ্ধের অন্যতম নেতা মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ (অব.) বীরবিক্রমের স্বাধীনতার সংগ্রাম শুনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



একাত্তরে বাঙালি অন্য রকম ছিল

খেলোয়াড় হয়েও সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন কেন?

ফিফা শতবর্ষ উপলক্ষে প্রতিটি দেশের একজন সেরা খেলোয়াড়কে ‘সেন্টিনারি মেরিট’ অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ফিফার তখনকার ভাইস প্রেসিডেন্ট এ দেশে এসে আমার গলায় মেডেলটি পরিয়ে দিয়েছেন। একসময় চেয়েছি, খেলায়ই থাকব। কিন্তু আব্বা ডা. আজহার উদ্দিন খুব চাইতেন  সিএসপি হই। ছাত্রও ভালো ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়ার সময় ৭৫ টাকা বৃত্তি পেতাম। তবে পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষার দিন বাবাকে না জানিয়ে মিয়ানমারে খেলতে চলে গেলাম। তখন তিনি আমার পরীক্ষা ভালো হওয়ার জন্য বাসায় মিলাদ পড়াচ্ছিলেন। পরে জেনে খুব কষ্ট পেয়েছেন। মনে হলো, সিএসপি তো হতে পারলাম না, সেনাবাহিনীতেই বরং যাই।

যোগ দিলেন কবে?

১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে জুনিয়র কমিশন অফিসার হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু হলো। মেজর জিয়াউর রহমান আমার শিক্ষক ছিলেন। তখনই পরিচয়, তাঁকে দেখে উদ্দীপ্ত হয়েছি। সিনিয়র ক্যাডেটরা জুনিয়রদের অত্যাচার করে, দোষ ধরে বলে একদিন তিনি এক ইনস্ট্রাক্টরকে ডেকে আমাকে দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘ইয়াংম্যান এদিকে আসো, প্রশিক্ষণ শেষে তুমি বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেবে।’ একাডেমিতে ফল ভালো ছিল, আমারও সেটিই ইচ্ছা ছিল। তিনি আরো উত্সাহ দিয়েছিলেন, ‘বেঙ্গল রেজিমেন্টের ফুটবলদলটি কিন্তু অনেক ভালো।’ পাকিস্তানি সেনা অফিসার মেজর মালিক তখন পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশনের মহাসচিব। পাকিস্তান জাতীয় ফুটবলদলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই তো পশ্চিম পাকিস্তানি ছিলেন। পশ্চিমা এই খেলোয়াড়রা তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি বটে; কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে তাঁরা দুর্দান্ত ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে সান্টু, পিন্টু, টিপু ও আমি জাতীয় দলে খেলতাম। মোটামুটি শিক্ষিত ছিলাম বলে তিনি আমাদের পছন্দ করতেন। প্রশিক্ষণ শেষে নভেম্বরে কমিশন পেলাম।

কোন ব্যাটালিয়নে যোগ দিলেন?

১৯৬৮ সালের ১০ ডিসেম্বর যশোর ক্যান্টনমেন্টে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ব্যাটালিয়নে পোস্টিং হলো। এটিই ব্রিটিশ (পরে পাকিস্তান) সেনাবাহিনীতে বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে গঠিত সবচেয়ে পুরনো ব্যাটালিয়ন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে এই পদাতিক বাহিনী লাহোরে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সব ব্যাটালিয়নের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ‘গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে। তবে সেনাবাহিনীর বাঙালি-পাকিস্তানিদের বিরোধ সম্পর্কে সামান্যই জানতাম। সব সময়ই তো সেনাবাহিনীর ফুটবলদলের হয়ে নানা জায়গায় খেলতে হতো।

তাহলে স্বাধীনতাসংগ্রামের আকুতি কিভাবে হলো?

১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ের সময় যশোরে ছিলাম। রেকর্ডে পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হলেও ১৫-২০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। ভোলার লালমোহনে আমার জন্ম, বাবা তখন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ)। উপকূলীয় এ ঝড়ে আমারও অনেক আত্মীয়-স্বজন মৃত্যুবরণ করেছেন। বলার পরে আমার ইউনিটকে পটুয়াখালী জেলায় ত্রাণের কাজে দায়িত্ব দেওয়া হলো। ইউনিট কমান্ডার হিসেবে গলাচিপায় ত্রাণের কাজে অংশ নিয়েছি। নদীর তীরে অসংখ্য মানুষের লাশ আর মৃত গরু-ছাগল পড়ে ছিল। সেগুলো আলাদা করে মাটিচাপা দিয়েছি। কবর দেওয়ার শুকনো জায়গাটুকুও ছিল না। সেখানেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে প্রথম দেখা। তিনি হেলিকপ্টার থেকে নেমে আমার সঙ্গে কথা বললেন। আশপাশের অনেকে আমার অনেক আত্মীয়-স্বজন মারা গেছেন বলার পর তিনি সান্ত্বনা দিলেন। ঢাকায় ফিরে বেতার ভাষণে তিনি আমার কথা উল্লেখও করেছেন। তখন অনেকে সহানুভূতি জানিয়েছেন, টেলিফোন ও চিঠি পেয়েছি অনেক। তবে তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর উপলব্ধি হলো—সর্বকালের অন্যতম প্রলয়ংকরী এই ঘূর্ণিঝড়ের ১২ দিন পর তিনি ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময় পেয়েছেন। অথচ তার আগে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে তিনি চীন গেলেন, করাচি ফিরলেন। ফেরার পথে ঢাকায় যাত্রাবিরতি করে বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় সংকটকালে পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছাটুকুও তাঁর হয়নি।

আমাদের নেতারা কেউ যাননি?

বয়স্ক ও বৃদ্ধ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী যাতায়াতব্যবস্থা নেই—এই অবস্থায়ও হেঁটে দৌলতখান থেকে ভোলা পর্যন্ত এসেছেন। কোনো নেতা প্রত্যন্ত এলাকার মানুষদের দেখতে এভাবে ছুটে যাবেন—এটা আজের দিনে ভাবা যায়? আগের দিনে সবাই মানুষের জন্য রাজনীতি করতেন। লুটপাট, চাঁদাবাজি কিছু ছিল না। ঢাকায় ফিরে তিনি খুব জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন—‘ওরা কেউ আসে নাই।’ সব পত্রিকায় এই খবর ছাপা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে?

খেলতে যেতে হতো বলে নির্বাচনের পর দেশের উত্তপ্ত পরিস্থিতি, শেখ সাহেবের সাতই মার্চের ভাষণ—কোনো কিছু সম্পর্কেই আমি স্পষ্টভাবে জানতাম না। তখন মুলতানে একটি ন্যাশনাল ফুটবল লীগে অংশ নিচ্ছিলাম। তখনকার মুলতানের মতো শহরে তো দেশের এ পরিস্থিতির কথা পৌঁছে না, পাকিস্তানের পত্রিকাগুলোয়ও খবরগুলো ছাপা হয় না। ১৬ মার্চ খেলা শেষ হওয়ার পর সেদিনই ইউনিটের কাছে আমাকে ফেরত যেতে বলা হলো। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে যাওয়ার টিকিট পাওয়া যায় না, প্লেনও খুব কম। এক বন্ধু টিকিট জোগাড় করে দিলেন।

সেনাবাহিনীতে বিরোধ কেমন দেখেছেন?

শেখ মুজিব ভালো না ইয়াহিয়া ভালো—এ নিয়ে সেনাবাহিনীতে আমাদের টুকটাক ঝগড়া হতো। দেশে কেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না, এসব নিয়ে আমরাও খুব উত্তেজিত ছিলাম। শেখ মুজিব অনেক ভোটে জেতার পর সবাই খুব খুশি ছিলাম—এবার পাকিস্তানের সরকারপ্রধান বাঙালি হবেন। তবে যেখানেই থাকি, জানতাম, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের শাসনক্ষমতায় যাওয়ার অধিকার আছে। অন্যদের মতো সেটি আমারও দাবি ছিল।

ঢাকায় নেমে কী দেখলেন?   

ঢাকায় এয়ারপোর্টে নেমে মনে হলো, সেনাবাহিনীর কোনো ক্যাম্পে এসেছি। বিহারিরা পশ্চিমে যেতে টিকিটের খোঁজে ঘুরছে। ক্যান্টনমেন্টের দিকে যাওয়ার জন্য গাড়ি খুঁজছি। এক হাবিলদার আমার দিকে খুব খারাপ চোখে তাকিয়ে বলল, ‘ক্যায়া হুয়া?’ পাত্তাই দিল না দেখে অবাক হলাম। আমার গায়ে সেনাবাহিনীর পোশাক, ব্যাচ আছে। নিম্নপদস্থ কোনো সেনা সদস্যের তো এমন আচরণ করার কথা নয়। এত পরিবর্তন কেন? তখন পাশ দিয়ে যাওয়া পরিচিত এক লেফটেন্যান্ট স্যালুট করে ইংরেজিতে বললেন—‘কী হয়েছে, স্যার?’ বলার পর সে ‘সরি’ বলল। বেঙ্গল রেজিমেন্টের পরিচিত এক হাবিলদার দৌড়ে এসে একটি গাড়ি ডেকে দিলেন এবং বললেন, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে উত্তেজনা চলছে, ওদিকে না গেলেই ভালো। গেলাম না। পথে বেরিয়ে দেখি, ছাত্ররা পথে পথে ব্যারিকেড দিয়ে সবাইকে তল্লাশি করছে। অনেক পথ ঘুরে যশোরে এলাম।

সেখানে তখন কী অবস্থা?     

এসে দেখি, আমার ইউনিট এক মাস ধরে সীমান্তে যুদ্ধের মহড়া দিচ্ছে। এটি সৈনিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ। যশোর ক্যান্টনমেন্টে শুধু তিন-চারজন অফিসার। ১৭ মার্চ আমাকেও সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। ৭০০ সৈনিকের ৩০০ ছুটিতে, বাকি ৩০০ প্রশিক্ষণে। ক্যান্টনমেন্টে শুধু ৫০ জন। ঢাকায় ক্র্যাকডাউন হলো, মেজর জিয়া কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন—এসবের কিছুই আমরা জানি না। কারণ রেডিও সংযোগ বিচ্ছিন্ন। জনমানবহীন এলাকায় আমরা থাকি, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশাও বারণ। ২৯ মার্চ ক্যান্টনমেন্টে ফেরার জন্য মেসেজ এলো। হেঁটে গভীর রাতে পৌঁছলাম।

বাঙালিদের সেখানে কী অবস্থা?

সকালে আমরা সবাই ক্লান্ত। আমি আর একজন মাত্র বাঙালি অফিসার, বাকি সব পাঞ্জাবি। ৩০ মার্চ সকালে ফ্রেশ হয়ে বেরোনোর পর একজন সৈনিক এসে কাঁদতে লাগলেন। ‘কী হয়েছে?’ ‘স্যার, আমাদের হাতিয়ার নিয়ে গেছে।’ সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেললাম, আমাদের নিরস্ত্র করা হয়েছে। যেকোনো সৈনিকের জন্য নিরস্ত্র হওয়াটা অপমানকর। সঙ্গে সঙ্গে মাথা গরম হয়ে গেল। আগের সব ঘটনা মনে পড়ল। পরিস্থিতি কিছুটা বুঝে ফেললাম। বললাম, ‘কম্পানিতে যাও। সবাইকে ইউনিফর্ম পরে রেডি হতে বলো।’ জুনিয়র কিন্তু খুব উদ্যমী সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আনোয়ারকে পরিস্থিতি জানালাম। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘এই চাকরি আর করব না। আজ অফিসে গিয়ে কমান্ডিং অফিসারের সামনে বেল্ট খুলে দেব।’ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে প্রস্তুত হতে বললাম। অফিসার্স মেসের রুমে গিয়ে দেখি, চার পাঞ্জাবি রুমমেটও কিছু জানেন না। তাঁরাও খবরটি জেনে দ্রুত তৈরি হলেন। আমরা অফিসে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে গোলাগুলি শুরু হলো।

আপনাদের নিরস্ত্র করার নির্দেশ কে দিয়েছিলেন?

যশোর ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার দুররানি আমার ব্যাটালিয়নকে নিরস্ত্র করার নির্দেশ দিয়ে অস্ত্রাগারের (কোথ) চাবি নিয়ে গিয়েছিলেন। খবরটি সব সৈন্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা বাঙালি অফিসারদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। প্রথম থেকেই তাঁরা বাঙালিবিদ্বেষ দেখেছেন এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তাঁদের মধ্যে ধারণাও বেশি ছিল। পশ্চিমা সেনারা তাঁদের হাঁটা, চলা—সব কিছু নিয়েই খুব হেয় করত। বলত, আকারে ছোট, মছলি (মাছ) খায়। ঘৃণা করত, দুর্বল জায়গায় খোঁচা দিত। ফলে তাঁরা পশ্চিমাদের ভালো চোখে দেখতেন না। আগে তো এ দেশে মিলিটারি ঐতিহ্য প্রচলিত ছিল না। কিন্তু ব্রিটিশ আমল থেকেই সেনাবাহিনীতে কর্মরত সৈনিকরা এসব বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞ। ফলে তাঁরা অস্ত্রাগার ভেঙে বিদ্রোহ করলেন এবং পাঞ্জাবি সেনাদের গুলিবর্ষণ শুরু করলেন।

পাকিস্তানিরা কী করলো?

২৯ মার্চ আমরা যেদিন প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে বিদ্রোহ করলাম, তার আগেই তো দ্বিতীয়, তৃতীয় ও অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট জয়দেবপুর, সৈয়দপুর ও চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করেছে। আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলায় খবরগুলো জানি না। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা তো জানে, তারাও প্রস্তুত ছিল। ফলে কামানের গোলাবর্ষণ শুরু করল এবং ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই আমাদের ঘিরে ফেলল। অফিসাররুমে গেলাম। আমাদের কমান্ডিং অফিসার বাঙালি লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেজাউল জলিল তখন পরিস্থিতির চাপে কাঁদছেন। স্যালুট করে বললাম—‘স্যার, কী হয়েছে?’ আমাদের নিরস্ত্র করা হয়েছে। বললাম, ‘স্যার, আমাদের ওপর কেন গোলা ফেলা হচ্ছে?’ তিনি বললেন, ‘আর্মির নিয়মানুসারে বিদ্রোহ করলে গোলাবর্ষণ তো হবেই।’ তাঁর কাছে নির্দেশ চাইলাম। কোনো কথা না বলে শুধু কাঁদতেই থাকলেন। এরপর বেরিয়ে এলাম। পুকুরপাড়ে কয়েকজন সিনিয়র সুবেদার ঘিরে ধরলেন। একজন বললেন— ‘স্যার, এখানে একটু বসুন, শান্ত হোন।’ আর্মিতে এমন কোনো কথা সুবেদাররা তাঁদের অফিসারদের সাধারণত বলার সাহস পান না। এরপর একজন বললেন—‘স্যার, আজ আমরা শেষ। আমরা তো তেমন লেখাপড়া জানি না। আপনি নামকরা খেলোয়াড়, সবাই আপনাকে চেনে। আজ একটি সিদ্ধান্ত আপনাকে দিতে হবে। আমরা বিদ্রোহ করেছি, আপনি নেতৃত্ব দিন। এলোমেলোভাবে গোলাগুলি করছি, এখন নেতৃত্ব না দিলে আমরা শেষ হয়ে যাব।’ বললাম, কমান্ডিং অফিসারকে বলুন। তাঁরা বললেন, ‘তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।’ ঠিক আছে, আমিও একটু বলে দেখি। তাঁকে বললাম, ‘আমরা এখন বসে থাকতে পারব না।’ তিনি বললেন, ‘আমরা এখন কী করতে পারি?’ এক পাঞ্জাবি অফিসার এসে পড়ায় তিনি চুপ হয়ে গেলেন। তাঁর কাছ থেকে কোনো নির্দেশ পাব না বুঝতে পেরে চলে এলাম। তখনো যুদ্ধ চলছে। দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছি, কী করব? কমান্ডিং অফিসারের রুমে বসে থাকব না বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেব। সারা দেশে যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, তা-ও তো তখন জানি না। মিনিট দুয়েক ভেবে মনে হলো—বিদ্রোহীদের সঙ্গেই আমার থাকা উচিত। তখন তো তরুণ ও অবিবাহিত ছিলাম। ফলে জীবনের প্রতি তেমন টান ও মায়া ছিল না। বিদ্রোহীদের কাছে গিয়ে বললাম, ‘আপনাদের সঙ্গে থাকব। আমার কমান্ডে যুদ্ধ চলবে।’ স্লোগান উঠল—‘জয় বাংলা, ক্যাপ্টেন হাফিজ জিন্দাবাদ।’

তারপর কী হলো?

কোথায় কোন পজিশনে সৈনিকরা যুদ্ধ করছেন জেনে নিলাম। কোথায় মেশিনগান বসানো হবে, নির্দেশ দিলাম। প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরো বিন্যস্ত করলাম। ২৯ মার্চ সকাল ৮টায় আমাদের দিক থেকে প্রথম ফায়ার ওপেন করা হলো। টানা আট ঘণ্টা যশোর ক্যান্টনমেন্টের ভেতর থেকে আমরা ও বাইরে থেকে বেলুচ রেজিমেন্টের যুদ্ধ হলো। মাঝে পাকিস্তানি অফিসারদের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য অফিসে গেলাম। মেজর ইকবাল কোরেশি আমাকে হ্যান্ডমাইক ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনার সৈনিকদের যুদ্ধ বন্ধ করতে বলুন। আমরা সবাই ভাই ভাই—বলুন।’ উত্তরে জানালাম, ‘আপনি তাদের আগে যুদ্ধ বন্ধ করতে বলুন। ওরা গুলি করছে কেন?’ তখন বললেন, ‘ইয়াংম্যান, দিস ইজ নট অ্যা ফুটবল ম্যাচ।’ ততক্ষণে দুই পক্ষের অন্তত সাত-আটজন আহত হয়েছে। ফিরে এসে আনোয়ারকে অবস্থা জানিয়ে বললাম, ‘কী করবে? আমাদের পক্ষে থাকবে, না অফিসে যাবে?’ বলল, ‘আপনাদের পাশে আছি।’ তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আবার যুদ্ধ শুরু করলাম। আমাদের তো প্রস্তুতি ছিল না, তাড়াহুড়ো করে অস্ত্র জোগাড় করে যুদ্ধ শুরু করেছি। বিকেল ৪টায় গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেল। তখন সুবেদারদের ডেকে বললাম, ‘আপনারা তিন-চারজনের ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বেরিয়ে যান।’ তিন দিক থেকে ঘেরাও আছি, খোলা মাঠের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে হাজার গজ দূরের গ্রামের উদ্দেশে তাঁরা রওনা দিলেন। শেষ দলে আমি ছিলাম। তার আগে আনোয়ারকে বলার পর বলল, ‘রাতে বেরোলে হতো না, স্যার?’ ‘একপাশ আপাতত ফাঁকা আছে। রাতে সেখানেও তারা অবস্থান নিলে আর বেরোতে পারব না। তখন তারা আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে হত্যা করবে।’ সে বেরিয়ে গেল। পথে কোমরে গুলি লাগল, আনোয়ার শহীদ হলো।

ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরোনোর পর?

যশোরের সেই গ্রামে প্রবেশের পর মনে হলো, নবজন্ম লাভ করেছি। হাজার হাজার মানুষ ‘জয় বাংলা’ বলে চিত্কার করছে। সবার হাতে দা, বঁটি ও কুড়াল। এই গ্রামে আসার আগে মনে হয়েছিল, সেখানে জায়গা হবে না। বিদেশে চলে যেতে হবে। কারণ সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ মানেই তো ফাঁসি। কিন্তু তাঁরা জানালেন, জিয়াউর রহমানসহ অন্য সেনা অফিসাররাও বিদ্রোহ করেছেন। আমি একা বিদ্রোহী নই ভেবে নিশ্চিন্ত হলাম। ততক্ষণে আমার বিদ্রোহের কথা ছড়িয়ে পড়েছে। সেনারা জানালেন, আশপাশের ইপিআরের (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) সদস্যরাও বিদ্রোহ করেছেন। যশোরের চৌগাছা বাজারে তাদের ও আমাদের সদস্যদের একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দিলাম। পাশের ইপিআরের সেনাদেরও আসতে বললাম। তবে ভাবনা ছিল, বাঙালি কত দিন এই যুদ্ধ চালিয়ে রাখতে পারবে? পরদিন খাল পেরিয়ে জায়গাটিতে গেলাম। আমার সেনা ২০০ আর বাকি অন্য বাহিনী। শখানেক সৈনিক কমান্ডিং অফিসার বিদ্রোহে যোগদান করেননি বলে আমার সঙ্গে বেরিয়ে এলেন না। তাঁদের প্রত্যেককে পরে পাকিস্তানি হানাদাররা মেরে ফেলে। চৌগাছা বাজারে শ দুয়েক সৈন্য নিয়ে হাজির হওয়ার পর আমাদের দিকে হাজার হাজার তরুণ, তরুণী, কিশোর-বৃদ্ধ আসতে লাগলেন। সবার একটিই দাবি—অস্ত্র দিন, যুদ্ধ করব। সেখানেই প্রথম ডিফেন্স গড়ে তুললাম। এভাবেই ৩০ মার্চ আমার মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হলো।

দেশের ভেতরে থেকে কিভাবে যুদ্ধ করেছেন?

আমি যাইনি, একজন সৈনিককে দায়িত্ব দিয়ে কী কী প্রয়োজন, তালিকা পাঠালাম। পরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন বাঙালি অফিসার এসে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘আপনারা যুদ্ধ করুন, যা প্রয়োজন আমরা দেব। চাইলে আমাদের দেশেও আসতে পারেন।’ গেলাম না। দুই দিন পর আমার বন্ধু এসপি মাহবুবকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় গিয়ে বিদ্রোহী সেনা অফিসার মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর সঙ্গে আলাপ করলাম। তখন বাংলাদেশকে চারটি অঞ্চলে বিভক্ত করে মুক্তিযুদ্ধ চলছে। তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনের কমান্ডার। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ প্রধানত জনগণের যুদ্ধ। একটি উদাহরণ দিই—দা, কুড়াল, বঁটি—হাতের কাছে যা পেয়েছেন, তা নিয়েই সাধারণ মানুষ ইপিআরের ক্যাপ্টেন আজিম চৌধুরী ও তাঁর বাহিনীর সঙ্গে মিলে খান সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধে হেরে পাক সেনারা যশোর সেনানিবাসের দিকে পালানোর সময় মানুষ ও বাঙালি সৈনিকরা তাদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করেছে। সে হামলায় পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন শাহেদ ও মেজর শোয়েব মারা যায়, লেফটেন্যান্ট আতাউল্লাহ সাকীকে তারা জ্যান্ত ধরে ফেলেন। খান সেনাদের ফেলে যাওয়া চাইনিজ রাইফেল ও মেশিনগানের ব্যবহার না জানায় সেগুলো তাঁরা আমাকে দিয়ে দিলেন। আমার শক্তি বাড়ল। ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা বললেন, আপনার এলাকায় খোলা জায়গা থেকে সহজে যুদ্ধ চালানো যাবে। ফলে বেনাপোল চলে গেলাম। তত দিনে ইপিআরের ২০০ ও আমার ২০০ সৈনিক একসঙ্গে আমার অধীনে যুদ্ধ করছে। অস্ত্র বলতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও কয়েকটি মেশিনগান। মর্টার বা অন্য কোনো ভারী অস্ত্র নেই। ২৬ এপ্রিল বেনাপোলের কাগজপুকুরে পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের আক্রমণ করল। তুমুল যুদ্ধের পর প্রতিরক্ষার খাতিরে মাইল দেড়েক পিছিয়ে আবার প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি করলাম। এর পর থেকে তারা নিয়মিত আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে, আমরাও যুদ্ধ করেছি। তবে কাগজপুকুর যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে ভালো ছিল। পেছনে ভারত বলে পেছন থেকে আক্রমণের ভয় নেই। ফলে আক্রমণকারীদের ভালোভাবে ঠেকিয়ে দিলে তাদের অনেক ক্ষতি হয়। সেটিই হচ্ছিল। ১৭ এপ্রিল মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু তিনি চুয়াডাঙ্গার দখল ধরে না রাখতে পেরে মেহেরপুর চলে গেলেন। ফলে সেদিকেই সৈন্যদের নিয়ে যাত্রা করলাম। তিনি বললেন, আজ বাংলাদেশ সরকার শপথ নেবে। আমরাও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধা ও সহায়ক শক্তির সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য সরকারের প্রয়োজনীয়তা বোধ করছিলাম। শত শত দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সামনে প্রবাসী সরকারের শপথানুষ্ঠানে আমিও উপস্থিত ছিলাম।

আলাদা ব্যাটালিয়ন করলেন কবে?

মে মাসের শুরু পর্যন্ত আমি ও আমার সৈন্যদল দেশের ভেতরে থেকে যুদ্ধ করেছি। আমার অধীনে বেনাপোল চেকপোস্টেই প্রথম বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়েছে। বিদেশি অনেক সাংবাদিক সেদিন উপস্থিত ছিলেন। চেকপোস্টে হাতে লেখা কাগজে সিল দিয়ে ভিসার ব্যবস্থা হলো। সরকারের ডাক বিভাগও হলো। এই চেকপোস্ট দিয়েই চিঠি দেশের ভেতরে পাঠানো হতো। তবে আমার সৈনিকদের কিন্তু কোনো বিরাম নেই। ৩০ এপ্রিল থেকে তাঁরা যুদ্ধ করে চলেছেন। যখন কোনো দল ভারতে বিশ্রাম নেয়, অন্য দল এখানে এসে যুদ্ধ করে। তত দিনে তাঁরা আহত-নিহত হয়ে সংখ্যায় কমে গিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানী নতুন রিক্রুটের জন্য পরামর্শ ও পরে লিখিতভাবে আদেশ দিলেন। ফলে ৬০০ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ ব্যাটালিয়ন তৈরির জন্য ভারতের ইয়ুথ ক্যাম্পগুলোতে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। এখন তো ওরা নির্জীব, মৃতপ্রায়। তবে একাত্তরে বাঙালি অন্য রকম ছিল। সারা দিনে একবেলা পচা ও গন্ধযুক্ত মিষ্টি কুমড়ার তরকারি খেয়েও মাটিতে পড়ে থাকা তরুণরা যুদ্ধের জন্য পাগলপারা ছিল। একেক ক্যাম্পেই পাঁচ-ছয় শ যুবক, বেশির ভাগেরই শরীর দুর্বল। পাঁচ ফুটের ওপর ২০-২৫ জনের বেশি কোনো ক্যাম্প থেকে পাই না। বাকিরা আমাকে ঘিরে ধরে, গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ে—দেশের জন্য যুদ্ধ করব, কেন আমাদের নেওয়া হবে না? কিন্তু আমি তো সেনাবাহিনীর উচ্চতা ও স্বাস্থ্য অনুসারে যোদ্ধা বাছাই করতে এসেছি। তারা উল্টো বলে, দেশের জন্য যুদ্ধ করব, উচ্চতা, স্বাস্থ্য কেন প্রয়োজন? আমাদের পরীক্ষা নিন, পাকিস্তানি সেনাদের বাংকার, নিশানা দেখিয়ে দিন, যে গ্রেনেড ছুড়ে চলে আসতে পারবে, তাকে নিন। আমরা সাহসের পরীক্ষা দেব। তারা সব স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কোনোমতে বুঝিয়ে ফেরত আসি। এভাবে কয়েকটি ক্যাম্প ঘুরে, ইপিআরের সেনা বাছাই করে ব্যাটালিয়ন গড়লাম। একটি ছেলে আমার জিপের সামনে এসে এমন কান্নাকাটি করছিল, না পেরে নিতে হয়েছে। স্বাধীনতার কয়েক দিন আগে এমসি কলেজের যুদ্ধে সে শহীদ হয়।

আপনি কোন ফোর্সের অন্তর্ভুক্ত হলেন?

এর মধ্যে নির্দেশ এলো, স্পেশাল ট্রেনে আমাদের ভারতের মেঘালয়ের গভীর বনে তুরা নামে একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে আমার নতুন ব্যাটালিয়নকে প্রশিক্ষণ ও সেক্টরের অধীনে নেওয়া হবে। আমার দলের ছেলেরা কেউ ছাত্র, কেউ মুদি দোকানদার ও গাড়িচালক। তাদের নিয়ে গেলাম। আরো সৈনিক আছে সেখানে। তাদের সবাইকে নিয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম, তৃতীয় ও অষ্টম ব্যাটালিয়ন নিয়ে মেজর জিয়াউর রহমানকে সেক্টর কমান্ডার করে ‘জেড ফোর্স’ গড়ে তোলা হলো। আমার সেনাদের এক মাস প্রশিক্ষণের পর তারা যুদ্ধ করার উপযোগী হয়ে উঠল। আমাদের রাইফেল, গ্রেনেডসহ সব যুদ্ধাস্ত্র দেওয়া হলো।

আপনার স্বরণীয় যুদ্ধ কোনটি?

আমার নবীন সৈন্যরা যুদ্ধবিদ্যায় কতটা পারদর্শী হয়েছে, পরীক্ষার জন্য ভারতীয় অফিসাররা বললেন, পাকিস্তানি আর্মির এক কম্পানি বেলুচ রেজিমেন্ট আছে, কামালপুরে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। রেজিমেন্টের সেনাদের বাইরে যাওয়া ঠেকাতে এই যুদ্ধক্ষেত্রের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া ছিল, ভেতরে মাইন পেতে রাখা। জামালপুর জেলার সর্ব-উত্তরের সীমান্ত এলাকায় এই যুদ্ধক্ষেত্র। সেদিন ছিল ৩১ জুলাই। ভোরে বি (ব্রাভো) ও ডি (ডেল্টা) কম্পানি মিলে আমরা ৩০০ সৈনিক বেলুচ রেজিমেন্টের ওপর আক্রমণের উদ্দেশ্যে চললাম। আমি ‘বি’ আর ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন ‘ডি’ কম্পানির কমান্ডার। তিনি সে মাসেই পাকিস্তান থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। কথা ছিল বেতার যন্ত্রে  আমার নিদের্শ পাওয়ার পর ভারতীয় মাউনটেইন ব্যাটারি শত্রুর অবস্থানের ওপর গোলা বর্ষণ করবে। কিন্তু দেখা গেল আমার নির্দেশ ছাড়াই, আমরা সুবিধাজনক অবস্থান নেওয়ার আগেই ভারতীয়রা গোলাবর্ষণ শুরু করে এবং একটি গোলাও লক্ষ্যস্থলে পড়েনি, বরং তার ফলে শত্রুরা আগে থেকেই সাবধান হয়ে গেল। এখনো সেই ভয়ংকর মুহূর্তগুলোর কথা ভুলতে পারি না। মাইন পোঁতা যুদ্ধক্ষেত্রে আমি ও আমার বেতারযন্ত্র বহনকারী সৈনিক পাশাপাশি টার্গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। দুজনের মধ্যে দূরত্ব ছয় ইঞ্চির বেশি নয়। তাঁর পিঠে ওয়্যারলেস। আমার হাতে সেটির হ্যান্ডসেট। আস্তে আস্তে এগোচ্ছি, আমি হ্যান্ডসেটে, সামনে পেছনের সৈন্যদের নির্দেশ দিচ্ছি। হঠাত্ মাইনের ওপর পা পড়ায় সিগন্যালার সিরাজের পা উড়ে গেল এবং সেখানে সে তাত্ক্ষণিকভাবে শহীদ হয়। একটু এদিক-ওদিক হলে আমিও ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতাম। সঙ্গে সঙ্গে শহীদ সহযোদ্ধার সেটটি খুলে নিজের কাঁধে নিয়ে নিলেন আরেক সাহসী বীর সৈনিক। কোনো সহায়তা ছাড়াই মাত্র এক মাসের প্রশিক্ষিত সেনাদের নিয়ে আমরা কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে পাকিস্তানিদের দুটি বাংকার দখল করতে পেরেছিলাম। এটি বিশ্বের কোনো পেশাদার সেনাবাহিনীও করতে পারবে না। কেবলমাত্র দেশপ্রেমে উজ্জীবিত, দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষেই এই ধরণের আক্রমণ পরিচালনা করা সম্ভব। আমরা তো তাদের দেখতেও পাইনি। তারা সিমেন্টের বাংকারের পেছনে বসে মেশিনগান চালিয়েছে। শুধু ফ্ল্যাশ দেখে তাদের অবস্থান নির্ণয় করে আমরা গুলি করেছি। এই যুদ্ধে ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিনসহ ৩৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। ৬০ জন আহত হয়েছেন। দুঃসাহসী সালাউদ্দিন আমার বন্ধু ছিলেন। আমরা তাঁর লাশটিও আনতে পারিনি। কামান সহায়তা থাকলে হয়তো মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ংকর এই অপারেশনটি আমরা আরো ভালোভাবে করতে পারতাম।

কামালপুর যুদ্ধ তো অনেক সেনাবাহিনীতেও পাঠ্য?

এখনো অবাক লাগে, কিভাবে এত কিছু পেরিয়ে যুদ্ধটি করেছিলাম। এই যে তিন-চার শ অ্যাওয়ার্ড যুদ্ধের পর দেওয়া হলো, সেগুলো সিনিয়রিটি বেসিসে দেওয়া হয়েছে। এর আশি শতাংশই ভুয়া। সিনিয়র আর্মি অফিসারদের নয়, যাঁদের বেশির ভাগই ভারতে বসে ছিলেন, তাঁদের না দিয়ে এগুলো সাধারণ সৈন্য ও জুনিয়র অফিসারদের দেওয়া উচিত ছিল। যাঁরা জীবন হাতে নিয়ে সরাসরি শত্রুর মোকাবেলা করে দেশ স্বাধীন করেছেন। যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে আমি একা বাঙালি অফিসার বেরিয়েছি, আমাকে বীরবিক্রম উপাধি দেওয়া হয়েছে। এটি তিন নম্বর পদক। যাঁরা যুদ্ধই করেননি, পেয়েছেন বীর-উত্তম। আমাদের প্রশিক্ষণ ছিল না। কামালপুর যুদ্ধে সৈন্যদের আরো ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দিতে পারলে তাঁরা এত হতাহত হতেন না। তার পরও ছাত্রদের প্রবল তেজ ও সাধারণ মানুষের অকুতোভয় মনোবলের কারণে এই দেশটি স্বাধীন করা সম্ভব হয়েছে। কামালপুরের যুদ্ধে শত্রুর গোলার আঘাতে আমি আহত হয়েছিলাম। তুরা মিলিটারি হাসপাতালে চিকিত্সা লাভ করি।

কামালপুর থেকে কোথায় গেলেন?

মাসখানেক পর আমার ব্যাটায়িনকে সিলেটে সরিয়ে আনা হলো। ২২ নভেম্বর এখানে প্রধান যুদ্ধ জাকিগঞ্জের চারগ্রাম ও আটগ্রাম ইউনিয়নে হয়েছে। আটগ্রামে পাকিস্তানি সেনা চৌকি আক্রমণ করে ১০ পাকিস্তানি সেনাকে জীবিত গ্রেপ্তার করেছিলাম। এরপর পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটতে শুরু করে। ২৮ নভেম্বর জকিগঞ্জের গৌরীপুরে আমরা প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি করেছিলাম। সেখানে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের দুটি দল আক্রমণ করেছিল। তবে আমাদের শৌর্যের ফলে তাদের অধিনায়ক মেজর সারোয়ারসহ ৫০ জন নিহত হলো। ৩০ জনকে জীবিত গ্রেপ্তার করেছি। তখন জেড ফোর্সের কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানও সঙ্গে ছিলেন। এরপর চা-বাগানের দিকে যেতে নির্দেশ এলো। বনে ওয়্যারলেস কাজ করছে না। বাগানের ভেতর দিয়ে দুই দিন না খেয়ে হেঁটে তিন দিন পর বাগানের প্রান্তে একটি ভবন দেখলাম। বুঝলাম, এটিই সিলেট শহর। সেটি এমসি কলেজের অধ্যক্ষের বাসভবন ছিল। আমরাই প্রথম গেরিলাপদ্ধতিতে সিলেটে পৌঁছেছি। তাঁর বাসভবন দখল করে রাখা পাকিস্তানি সেনারা ৩০০ গজ দূর থেকে পাঞ্জাব ভাষায় জানতে চাইল, তোমরা কারা? তাদের মতো খাকি পোশাক, চাইনিজ রাইফেল দেখে আমাদের পরিচয় বুঝে ফেলল। শহরে আসায় ওয়্যারলেস চালু হলো। নিচ থেকে উঁচুতে আমাদের ওপর আক্রমণ করা হলো। সারা দিন যুদ্ধ হয়েছে। সঙ্গের ভারতীয় মেজর গোলাবর্ষণ করতে হবে কি না জানতে চাইলেন। বললাম, শত্রু খুব কাছে, কামানের বদলে রকেট লঞ্চার বা বিমান আক্রমণ করতে পারলে ভালো হয়। তিনি বললেন, নো প্রবলেম। আধা ঘণ্টা পর দুটি ফাইটার জেট থেকে অধ্যক্ষের বাসভবনে বোমাবর্ষণ করা হলো। তাদের বাংকারগুলো ধ্বংস হয়ে গেল। আমরা খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলাম। এই প্রচণ্ড যুদ্ধে তাদের ৪০ জন মারা গেল। সুবেদার ফয়েজসহ ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হলেন।

পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের খবর কিভাবে পেলেন?

এরই মধ্যে খবর পাচ্ছিলাম, পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করবে। ১৬ ডিসেম্বর সকালে পাহাড় থেকে ব্যাটালিয়নসহ নামলাম। ৭০০ সৈন্যসহ লাইন ধরে সার্কিট হাউসে গেলাম। চা খাচ্ছিলাম, এমন সময় মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ওসমানী এলেন। বললাম—স্যার, এখানে কেন? বললেন, এখানে আসতে পেরেছি, তা-ই ভাগ্য। আমার বিমানে আক্রমণ করেছে। তিনি তাঁর সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানার (এখন ওসমানীনগর থানা) দয়ামীরে চলে যান। পরদিন সিলেটে ১৭ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমপর্ণ করেছে। আমাদের ডাকেওনি, মেজর জিয়া এমনিতেই ১৭ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন।

শ্রুতলিখন : সুমাইয়া সীমা

(২ নভেম্বর, ২০১৭, বনানী, ঢাকা) 


মন্তব্য