যখন কেউ ডাক্তারি পড়তে চাইতেন না, সেই আমলে মানুষের কল্যাণ করবেন বলে মেডিক্যালে ভর্তি হলেন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে যে ওষুধ তিনি আবিষ্কার করেছেন, সেটি এখনো পুরো বিশ্বে সেই রোগের একমাত্র ওষুধ। তিনি ডায়াবেটিসের চিকিৎসা সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খানের অসাধারণ জীবনের মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ।
মানবসেবাই আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য
notdefined

আপনার জন্ম তো বরিশালে?
বরিশালের বাকেরগঞ্জ থানার কৃষ্ণকাঠি গ্রামে জন্ম। পূর্বপুরুষরা আফগানিস্তান থেকে এখানে বসতি গড়েছেন। আমার বাবা ফজলুর রহমান খান ঘটনাচক্রে পরিবারের বড় ছেলে ছিলেন। ম্যাট্রিক পাসের পরেই তাঁকে সংসারের হাল ধরতে হলো।
ঢাকায় এসে কোথায় ভর্তি হলেন?
বাবা আমাকে ঢাকায় পড়তে পাঠালেন। নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার মার্টিনের সঙ্গে আমার মিশন স্কুলের প্রধান শিক্ষকের চিঠি নিয়ে দেখা করলাম।
চিকিৎসাবিদ্যায় ভর্তি হলেন কেন?
বাবা চাইতেন, আমি যেন এমন কোনো পেশায় থাকি, যাতে মানুষের কল্যাণ করতে পারি। সেটি যেকোনো পেশায়ই করা সম্ভব, কিন্তু তাতে যেন অন্যের মুখাপেক্ষী না থাকতে হয়, স্বাধীন পেশার বিষয় নিয়েই পড়ব বলে ঠিক করলাম। প্রকৌশলবিদ্যা কখনো ভালো লাগেনি। তবে আইনজীবী হব—গুরুত্ব দিয়েই ভেবেছি। পরে গভীরভাবে ভেবে দেখলাম, আইন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অনেক দিন পরিবারের সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু বাবার পক্ষে তো আমাকে সহায়তা করা খুব কঠিন। ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬০ সালে পাস করে সিদ্ধান্ত নিলাম—চিকিৎসক হব। যেদিন থেকে আমি চিকিৎসক হয়েছি, সেদিন থেকেই পরিবারকে সাহায্য করেছি। অন্য কোনো পেশায় তো এটি করতে পারতাম না। তার পরও যেহেতু পরামর্শ দেওয়ার কেউ ছিল না, ফলে মনের মধ্যে ভয় ছিল, কোনো কারণে যদি মেডিক্যালে সুযোগ না পাই? ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগে মৌখিক পরীক্ষা দিলাম। মজিদ স্যার সাক্ষাৎকার নিয়ে বললেন, ‘বাবা, তোমার মতো ফল নিয়ে এই বিভাগে কেউ ভর্তি হয় না; তুমি তো উদ্ভিদবিজ্ঞানে ভর্তি হবে না।’ তাঁকে পুরো বিষয়টি খুলে বললাম। তত দিনে তাঁদের ভর্তির সময় শেষ; ফলও হয়েছে। তিনি আমাকে বললেন, ‘তোমাকে তো সবার ওপরে রাখতে হয়। তিনি ‘ওয়ান এ’ লিখে আমার নামটি সবার ওপরে রাখলেন। নিজে থেকেই বললেন, ‘হলে তো হয়েই গেলে, কিন্তু ভর্তি না হলে আমাকে জানিয়ে যেয়ো।’ অবশ্য ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁকে জানিয়ে দিয়েছিলাম। আমাদের ব্যাচে ঢাকা কলেজ থেকে যারা প্রথম বিভাগে পাস করেছিল, তাদের মধ্যে আমি একাই মেডিক্যালে পড়েছি। বাকিরা বুয়েটে পড়েছে। ডাক্তারি পড়ার প্রতি তখন তেমন মোহ ছিল না।
ঢাকা মেডিক্যালে কেমন জীবন কাটিয়েছেন?
হোস্টেলে থাকতাম। ‘গ্রেড ওয়ান স্কলারশিপ’ পেতাম। বেতন দিতে হতো না। তখন শুধু তিনটি মেডিক্যাল কলেজ ছিল—ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী। সে বছরই বোধ হয় রাজশাহী ও চট্টগ্রাম মেডিক্যালের যাত্রা শুরু হয়। বাড়ি থেকে বাবা থাকা ও খাওয়ার খরচ দিতেন; বাড়তি খরচ ছিল না, প্রয়োজনও বোধ করিনি। ক্লাস, লেখাপড়া নিয়ে ছিলাম। ফাইনাল পরীক্ষায় ফার্মাকোলজি ও ফরেনসিক মেডিসিনে অনার্স (৮০ শতাংশের ওপর নম্বর) পেলেও বলব, আমার ফলাফল গড়পড়তা। প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলাম। পরে আর প্রথম হতে পারিনি। এখানে স্মৃতিশক্তির এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় যে ছাত্র-ছাত্রীদের মুখস্থ করতেই হয়। ফলে মেডিক্যালে পড়ার সময় অনেকবার মনে হয়েছে, হয়তো ভুল জায়গায় পড়তে এসেছি। আমি তো বিষয়গুলো মনে করতে পারি, মুখস্থ করতে পারি না। এখনো ফোন নম্বর মুখস্থ থাকে না। বিষয়গুলো বুঝে পড়তাম। পরে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ডিফিল (ডক্টর অব ফিলোসফি) করতে গিয়ে দেখেছি, স্মৃতিশক্তির এত গুরুত্ব নেই। সব কিছু তো মনে রাখা লাগে না। কিভাবে বিষয়টিকে তুলে ধরা হচ্ছে, নতুন জ্ঞান আহরণ করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. ফজলে রাব্বির সংস্পর্শে কিভাবে এলেন?
১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে ফলাফল বেরুল। গণ-আন্দোলনের কারণে আমাদেরই প্রথম ছয় মাসের সেশনজট হলো। এরপর হাউসম্যানশিপ (ইন্টার্ন) করতে হবে। সিদ্ধান্ত নিলাম, গ্রামের মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেব। তাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি রোগ পেটের পীড়া ও লিভারের অসুখ আছে বলে ‘গ্যাস্ট্রো-অ্যান্ট্রোলজিস্ট’ হতে চাইলাম। ভালো কোনো অধ্যাপকের সঙ্গে ইন্টার্ন করব ভাবলাম। বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. ফজলে রাব্বির সঙ্গে ছাত্র অবস্থায় কিছুটা পরিচয় ছিল বলে দেখা করলাম। তিনি আমাকে খুব আদর করে নিলেন। আমার জীবনের পরম পাওয়া যে এক বছরের বেশি সময় তাঁর হাউসম্যান ছিলাম। তাঁর যে মমত্ববোধ, স্নেহ পেয়েছি; কোনো দিন ভুলতে পারব না। স্যারের স্বাক্ষর হুবহু নকল করতে পারতাম, এখনো পারি। স্যার ছুটিতে আছেন—বিলেতে কমনওয়েলথ স্কলারশিপের জন্য দরখাস্ত করতে হবে বলে যেহেতু নিজে লিখেছি, ‘আমি তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়েছি’—এমন একটি সার্টিফিকেট লিখলাম। এর মধ্যে তিনি ফিরে আসায় ‘অন্যায় করে ফেলেছি’—এই বলে পুরো ঘটনা জানালাম। তিনি দেখে ‘কই, কী লিখেছ এসব হাবিজাবি’ বলে সেটি ছিঁড়ে ফেলে ‘আমার জীবনে এত সচেতন ও বুদ্ধিমান চিকিৎসক আর পাইনি’—এই ভাষায় সার্টিফিকেট লিখে দিলেন। যেহেতু কমনওয়েলথ স্কলারশিপের দরখাস্ত করে হয়নি, লবিংয়ের মাধ্যমে স্কলারশিপ দেওয়া হয়েছে; ফলে ‘এফসিপিএস’ পড়ব ঠিক করলাম। ১৯৭০ সালে এফসিপিএস পাশ করলাম।
তাঁর সঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন ছিল?
তিনি খুব সিগারেট খেতেন, তাও আবার কড়া তামাকের কিংস্টর্ক ব্র্যান্ড। রোগীদের কেউ কেউ চেকে ফি দিত, সেগুলো আলাদা এক অ্যাকাউন্টে জমা করতেন। চেকবই, প্রেসক্রিপশনের ফরম আমার কাছে থাকত। দুই-তিন সপ্তাহ পরপর তিনি বলতেন, ‘আজাদ, ব্যাংক থেকে শ দুয়েক কি ৩০০ টাকা তুলে এনে দিও।’ কোনো দিন সইও করেননি। তাঁর সই দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলতাম। এতটা বিশ্বাস করতেন যে কোনো দিন জিজ্ঞাসাও করেননি। অসাধারণ মানবিক ছিলেন। ছোট ভাইয়ের মতো, সন্তানের মতো তিনি আমাকে লালন করেছেন, হাতে-কলমে কাজ শিখিয়েছেন। আমাদের সময় তাঁর মতো শিক্ষক খুব কম ছিল। ভালো ছাত্র ছিলেন, নিজেও খুব পড়তেন। পড়ার প্রতি আমার যে আগ্রহ তাঁর কিছুটা তাঁর কাছেও শেখা। আমার চিকিৎসা পেশার জীবনে তাঁর অবদান বলে বোঝানো যাবে না। যে ‘ক্লিনিক্যাল মেডিসিন’ শিখেছি, আমাকে তিনি সেটি হাতে ধরে শিখিয়েছেন, নিজের সবটুকু বিদ্যা, অভিজ্ঞতা আমাকে দিয়েছেন। স্যারের কাছ থেকে মেডিসিনের যে তালিম নিয়েছি, সেটি আমার ভিত্তিই গড়ে দেয়নি, জীবনের পাথেয়ও হয়েছে। ছয় মাসের পুরোনো রোগীদের তিনি নিজে দেখতেন না, আমাকে দেখতে বলতেন। তাঁদের বিষয়ে কোনো পরামর্শ চাইলে ডা. ফজলে রাব্বি উল্টো বলতেন, ‘কি মিয়া! আমাকে জিজ্ঞাসা করছ কেন? তুমি তো সবই জানো।’ ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর তাঁকে আলবদর বাহিনী ধরে নিয়ে গেল। আমিই সম্ভবত পরিবারের বাইরে শেষ ব্যক্তি যে তাঁর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছি। সেগুনবাগিচায় থাকি, কারফিউর মধ্যে তিনি যেতে পারেন না বলে সেই এলাকার তাঁর এক রোগীকে দেখতাম। তাঁকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, এমন একটি ওষুধ দিতে বলে বলে স্যারের পরামর্শ নিতে টেলিফোন করলাম। তখনও তিনি উত্তর দিলেন, ‘তুমি তো ভালোই জানো। আমাকে জিজ্ঞাসা করার কী দরকার?’ কথোপকথনের আধা ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো।
আইপিজিএমআরে শুরু হলো কিভাবে?
এফসিপিএস পাসের পর আমার জীবনে সন্ধিক্ষণ এলো। একটি নীতিই জীবনে সব সময় অনুসরণ করেছি—‘সব কিছু সৎ উপায়ে মোকাবেলা করা।’ এটিই বেশি করেছি। ১৯৭০ সালে পোস্টিং হবে; আমার তো শিক্ষকরা ছাড়া সমর্থন দেওয়ার মতো কেউ নেই; ফলে পটুয়াখালীতে ‘অন সুপার নিউমারারি ডিউটি’ হিসেবে বদলি করে দিলেন। যে সহকারী পরিচালক বদলির ফাইল দেখতেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করে বললাম, ‘স্যার, আপনি আমাকে আমার কাজের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হাসপাতালে না দিয়ে ওখানে কেন বদলি করলেন? শিক্ষাদীক্ষায় যাঁরা আমার কাছাকাছিও নেই, তাঁদের ওসব প্রতিষ্ঠানে বদলি করেছেন? সরকারের চাকরি করলে সরকার আদেশ করলে আমি মানতে বাধ্য, কিন্তু সমবণ্টন তো হতে হবে। ভালো ভালো গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যাঁদের বদলি করেছেন, তাঁদের কারো ক্যারিয়ার আমার কাছাকাছি থাকলে আলাদা কথা, কিন্তু তাঁরা তো আমার ধারেকাছেও নেই।’ দুই পার্টের এফসিপিএসের প্রথম পার্টে পুরো পাকিস্তানে যিনি সবচেয়ে ভালো ফল করতে পারতেন, তাঁকে ‘কর্নেল জাফরি গোল্ড মেডেল’ দেওয়া হতো। আমি সেই স্বর্ণপদকধারী। তিনি উত্তর দিলেন যে তাঁরা একজন বিশেষজ্ঞ চেয়েছেন। বললাম, ‘আপনি তো আমাকে সুপার নিউমারারি (অতিরিক্ত) করে দিয়েছেন। আমাকে ওখানে পোস্টিং দিলে নিয়মিত হিসেবে বদলি করুন।’ তিনি যে আমাকে ‘রেগুলার পোস্টিং’ দিতে পারবেন না জানতাম। কারণ ওখানে রেগুলার পোস্টে যিনি আছেন, তাঁর আবার রোগী ধরপাকড়ের খুব অভ্যাস, তাঁকে সরাতে পারেন না বলে আমাকে ‘সুপার নিউমারারি’ হিসেবে দিয়েছেন। তিনি বোঝালেন, ‘সেখানে গেলে আপনার অনেক পসার হবে।’ বললাম, ‘আপনি কিভাবে বুঝলেন যে অনেক টাকা কামাতে চাই? শিক্ষা-গবেষণায় অবদান রাখতে চাই, চেম্বারে রোগী দেখে টাকা কামানো আমার জীবনের মূল উদ্দেশ্য নয়’—এই বলে চলে এলাম। বিষয়টি তিনি নজরে রাখলেন। আইপিজিএমআরও আমাকে চাইছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি আমাকে ‘রেজিস্ট্রার’ পদে আইপিজিএমআরে বদলি করলেন। সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা হলাম। কমনওয়েলথ ফেলোশিপের আবেদন ঘোষণা করা হলো, সেখানে নির্বাচিত হলাম। কিন্তু এরই মধ্যে তো দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কোথায় ছিলেন?
ঢাকার বাইরে যাইনি, কিন্তু আমাদের চিকিৎসকের দলটি—ডা. নুরুল ইসলাম সাহেব, আমি, ডা. আনোয়ারুল হক ঢাকার ভেতরের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম; নানাভাবে তাঁদের ওষুধপত্র পাঠাতাম। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর মা-বাবা পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সত্যি কথা বলতে কি, তাঁর মা-বাবার কোনো অসুখ ছিল না। আমাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও দেশের স্বার্থে আমরা তাঁদের ভর্তি করে রেখেছিলাম। বিশেষত আমি তাঁদের সরাসরি দেখাশোনা করতাম।
অক্সফোর্ডে কিভাবে গেলেন?
আগেই জীবনের লক্ষ্য ঠিক করেছিলাম, ‘গ্যাস্ট্রোএন্টোরোলজিস্ট’ হব। কমনওয়েলথ ফেলোশিপের মাধ্যমে ভাগ্য ভালো বলে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে প্লেসমেন্ট পেলাম। ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে সেখানে গেলাম। এটিই আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। আমার তো স্মৃতিশক্তি অত ভালো নয়, সেখানে গিয়ে দেখলাম, চিকিৎসকদের স্মৃতিশক্তির অত প্রয়োজন হয় না। অক্সফোর্ডে ‘এস সি ট্রু লাভ (সিডনি চার্লস ট্রু লাভ)’-এর সঙ্গে গবেষণার সুযোগ পেয়েছি। মানুষ, বিজ্ঞানী দুই হিসেবেই তিনি খুব উঁচুমানের ছিলেন। মানুষ হিসেবে তিনি কেমন, একটি গল্প বলি—১৯৭০ সালে আমাদের বিয়ে হয়েছে। অক্সফোর্ডে যাওয়ার বছরে আমার স্ত্রী ডা. কিশোয়ার আজাদ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে তৃতীয় বর্ষে পড়েন। শ্বশুর ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে বললাম, ‘এখন যদি তাঁকে ফেলে যাই, সেখানে তো এক বছর থাকব, মহামূল্যবান সময়ে তো আমার পড়ালেখা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তিনি বলেন, ‘তুমি তাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে।’ ঢাকা মেডিক্যালে খোঁজ নিয়ে জানলাম, নেওয়া যাবে। তবে অক্সফোর্ডে গিয়ে যে তিনি লেখাপড়া চালিয়ে নিতে পারবেন সেটি ভাবিনি। এটি তো বিশ্বের অন্যতম নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাঁর বড় বোন প্রফেসর ডা. হাজেরা মাহতাব পোস্ট গ্র্যাজুয়েটে আমার সহপাঠী ছিলেন। তিনি আমার দুই সপ্তাহ আগে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে গেছেন। প্লেসমেন্ট হয়েছে লন্ডনের কিংস কলেজে। তাঁর অধ্যাপকের সঙ্গে আলাপের পর তিনি রাজি হলেন যে তাকে এক বছরের মেডিক্যালের ছাত্রী হিসেবে কিংস কলেজে ভর্তি করে নেবেন। লেখাপড়া শুরুর সাত দিন আগে ট্রু লাভের সঙ্গে দেখা করার নিয়ম ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্ত্রী কী করেন?’ বললাম। ‘কোথায় আছেন?’ বলার পর তিনি বললেন, ‘এ কেমন কথা? তুমি অক্সফোর্ডে থাকবে, স্ত্রী লন্ডনে থাকবেন? এখানে পড়ালেখা করলে অসুবিধা কী?’ ‘এখানে তাঁকে ভর্তি করবে?’ কেন নেবে না? তিনি মেডিক্যাল স্কুলের অধ্যক্ষ জিম হোল্টকে ডেকে আনলেন। তাঁরা অধ্যক্ষকে ‘ডিরেক্টর অব দি ক্লিনিক্যাল স্টাডিজ’ বলেন। তিনি তাঁকে বললেন, ‘ডা. খান তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন, তিনি এখানে লেখাপড়া চালিয়ে গেলে হয় না?’ জিম হোল্ট বললেন, ‘হ্যাঁ, তিনি এলে তো ভালোই হবে।’ ট্রু লাভ টয়লেটে গেলেন, জিম হোল্ট আমাকে বললেন, ‘আপনি কয় দিন থাকবেন?’ ‘এক বছর আছি।’ ‘গবেষক চিকিৎসকদের স্ত্রীদের এক বছর ভর্তি নেওয়ার তো বিধান নেই, বড়জোর তিন মাস আছে।’ পুরো ব্যাপার শুনে ট্রু লাভ বললেন, ‘দেয়ার ইজ অল ওয়েজ অ্যা ফার্স্ট টাইম। তুমি ভর্তি নিলেই তো হয়ে গেল।’ জিম হোল্ট যুক্তি দিলেন, ‘তাহলে ফ্যাকাল্টির অনুমতি নিতে হবে।’ তিনি গম্ভীর হয়ে উত্তর দিলেন, ‘আমি তো ফ্যাকাল্টি মিটিংয়ে যাই না, ঠিক আছে, বুধবারের মিটিংয়ে এটি আলোচনার জন্য উত্থাপন করো, সেদিন যাব।’ পরে তিনি আমাকে বললেন, ‘তরুণদের কোনো কিছু করার ক্ষমতা দিলেই তারা মনে করে সেটি করার একক ক্ষমতা তার নেই। কিন্তু প্রধান হিসেবে তার তো সে ক্ষমতা আছে। সে নিলেই হলো, ফ্যাকাল্টির তো নেওয়ার কোনো কিছু নেই।’ তিনি আমাকে অভয় দিলেন, ‘এটি হয়ে যাবে, ভেব না।’ তিনি খুব সম্মানিত লোক ছিলেন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধীনে রেডক্লিফ ইনমারফারি হাসপাতালে গ্যাস্ট্রোএন্টোরোলজি বিভাগে কাজ করেছি। পেটের পীড়া ও লিভারের অসুখ—এ দুটি বিষয় তখন একসঙ্গেই ছিল।
অক্সফোর্ড কিভাবে জীবনটি বদলে দিল?
সেখানে তো ফেলোশিপ করতে গিয়েছিলাম; কিন্তু গিয়ে দেখলাম, যাঁরা ফেলোশিপে যান, তাঁরা সাধারণত তেমন কিছু করেন না। আমার আগ্রহ দেখে ট্রু লাভ সহযোগিতা করলেন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা শুরু করলাম। এক বছরের মাথায় যখন ফেলোশিপের সময় প্রায় শেষ, তাঁরাই বললেন, ‘আপনার গবেষণাকর্ম এত ভালো হচ্ছে যে কাজটি সম্পন্ন করা প্রয়োজন। শেষ করুন এবং থেকে যান।’ বললাম, ‘দেখুন, আমার দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এসে সব সময় উন্নত দেশগুলোতে থেকে যায়। ফলে আমি সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ করলে আমার সরকার মনে করবে, আমিও তাদের মতো থেকে যেতে চাইছি। ফলে এই কাজের জন্য আমার থেকে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ মনে করলে আপনারাই সরকারকে চিঠি লিখুন।’ তাঁরা লিখলেন এবং মন্ত্রণালয় উত্তর দিল, ‘আবেদনকারীকে অনুরোধপত্র লিখতে হবে। এটিই আমাদের নিয়ম।’ অনুরোধ জানালাম। এরপর আমার সময়সীমা বাড়ল।
সেখানে আপনার আবিষ্কারটি কী?
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি সব সময় মৌলিক আইডিয়াকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত আমার বিভাগের শিক্ষকরা সব সময়ই স্বীকার করেছেন, তাঁরা এ যাবৎ যত ছাত্র-ছাত্রী পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে আমার চেয়ে বেশি মৌলিক গবেষণার আইডিয়া কেউ করতে পারেননি। সেখানে আমি ‘ইনফরমেটরি ভল ডিজিজেস’ নিয়ে কাজ করেছি। সেই আলোকে নতুন ওষুধ তৈরি করেছি। ইচ্ছা করেই সেটিকে পেটেন্ট করিনি। করলে আমি পয়সা পেতাম। কিন্তু তাহলে ওষুধটি বাজারে রোগীদের হাতে আসতে দেরি হতো। এখন যেকোনো কম্পানি এটি তৈরি করতে পারে। যে ওষুধটি আবিষ্কার করেছি সেটির নাম—‘5-ASA Biased Drug’। ডায়রিয়ার সঙ্গে রক্ত পড়ার চিকিৎসার এটি মূল ওষুধ। সেখান থেকে নানা ওষুধ বেরিয়েছে। বাজারে এখন ‘অ্যাসাকল’, ‘ম্যাসাকল’ এ নামে পাওয়া যায়। এই ওষুধ খুব কার্যকর। মূল আইডিয়াটিও আমারই।
আইডিয়াটি কিভাবে পেয়েছেন?
ওই সময় ‘ইনফরমেটরি ভল ডিজিজেস’র প্রধান ওষুধ ছিল সেলাজোপাইরিন (salazopyrine)। ওষুধটি যদি খাওয়া হয়, তাহলে সেটি কোলনে গিয়ে ভেঙে দুটি সাবস্ট্যান্ট রিলিজ হয়—‘সালফাপিরিডিন’ ও ‘ফাইভ এ এস এ’। গবেষকরা মনে করতেন, সালফাপিরিডিনই হলো অ্যাকটিভ এজেন্ট। কারণ সালফাপিরিডিন ফাইভ এ এস একে ক্যারি করে ওখানে নিয়ে যায়। তবে আমি এ বিষয়ে অনেক গবেষণাপত্র পড়ে দেখলাম, তাঁরা যে উপসংহার টেনেছেন, এর উল্টোটাও তো হতে পারে।‘ইনফরমেটরি ভল ডিজিজেস’ নামের এই রোগের কারণ জানা নেই। এই ওষুধ আবিষ্কারের পর আমার ডিফিল বা ডক্টরেট হলো। বাংলাদেশে আমিই প্রথম ক্লিনিশিয়ান, যিনি ডক্টরেট করেছেন। আমার পরে ডা. মাহমুদ, ডা. হারুন (হারুন-অর-রশিদ) ক্লিনিশিয়ান হিসেবে ডক্টরেট করেছেন। কিন্তু অক্সফোর্ড থেকে ডক্টরেট করা আমিই একমাত্র ক্লিনিশিয়ান। বিশ্বে অন্তত কোটিখানেক আলসারেটিভ কোলাইটিস রোগীর জন্য আমার ওষুধই এখনো চলছে। এটি আবিষ্কারের জন্য গভীর রাতেও গবেষণা করেছি। তবে সে খাটনি আমার জন্য পরম আনন্দের ছিল।
এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের ফলে তো সেখানে চাকরির অফার ছিল?
হ্যাঁ, অনেক চাকরির অফারই ছিল। বড় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘গবেষণা পরিচালক’ পদে যোগদানের প্রস্তাবও করেছে। বিশ্বের যেকোনো দেশে উচ্চমানের গবেষক হিসেবে আমার চাকরি হতো। কিন্তু আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, দেশে ফিরব। আমার দেশের বেশির ভাগ লোক এই উন্নত দেশটিতে গিয়ে থেকে যাওয়ার কথা ভাবে। কিন্তু বিলেতে আমি সম্পত্তি গড়িনি, ব্রিটিশ পাসপোর্ট নেব কল্পনায়ও ভাবিনি। চাইলে যে ব্রিটিশ পাসপোর্ট পেতাম না, তা নয়।
বিমানে না এসে সড়কপথে এসেছিলেন কেন?
আমি সব সময় ইতিহাস-সচেতন, এখনো ইতিহাসের বই পড়ি। ১৯৭৭ সালে দেশে ফেরার সময় আমি ও স্ত্রী সিদ্ধান্ত নিলাম—সড়কপথে আসব। দেশ, মানুষ ও প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্রভূমিগুলো দেখে বাংলাদেশে ফিরতে ফিরতে দুই-আড়াই মাস লেগেছে। হোটেলেও থাকিনি, তাঁবু খাটিয়ে পথের ধারে থেকেছি। সারা জীবন যেসব সভ্যতার কথা জেনেছি, সেগুলো দেখার সুযোগ হয়েছে। ‘অক্সফোর্ড’ নামে যে শহরে ছিলাম, সেটির প্রাচীন নাম ‘অক্সেনফোর্ড’। সেখান একসময় গরু পালা হতো। এলাকাটি গরুর খামার ছিল। তুরস্ক হয়ে যখন এশিয়ায় এসেছি, সেই জায়গাগুলো একসময় মুর বা আরবদের দখলে ছিল। পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির কাছে বিশ্বের সর্বপ্রাচীন আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ‘তক্ষশীলা’ দেখেছি। ভারতীয় পুরাণের অন্যতম চরিত্র ‘রাম’-এর অনুপস্থিতিতে তাঁর ভাই ভরত ১৪ বছর রাজত্ব করেছিলেন। তাঁর ছেলে ‘তক্ষ’র নামে এই বিশ্ববিদ্যালয়। পাঞ্জাবের অমৃতসরে মহামুনি বাল্মীকির আশ্রমে রামের ছেলে লবকুশের জন্ম হয়েছে। আমার সেই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে বই আছে—‘সড়কপথে অক্সফোর্ড থেকে ঢাকা’।
আইপিজিএমআরে আগের পদেই যোগ দিলেন?
সরকারি নিয়ম হলো অনুপস্থিতিতে বা ছুটিতে থাকলে সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হয় না। শ্বশুর যেহেতু কিছুদিন সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ছিলেন, আমিই তাঁকে জানিয়েছিলাম, প্রচলিত আইনের বাইরে গিয়ে অনুপস্থিতিতে আমাকে যেন পদোন্নতি দেওয়া না হয়। ফলে আইপিজিএমআরে ফিরে আগের পদ ‘সহকারী অধ্যাপক’ হিসেবে যোগ দিলাম।
আপনাকে এদেশে গ্যাস্ট্রোএন্টোরোলজির জনক বলা হয়।
যখন বিভাগটি চালু করার উদ্যোগ নিলাম, পিজির অন্য সহকর্মীরা, অতীতে যাঁরা বিশেষায়িত বিভাগ চালুর চেষ্টা করেছেন, তাঁরা বললেন, ‘ভাত পাবেন না।’ মজা করে বললাম, ‘আপনারা যা বলছেন তা হয়তো সত্যি। স্পেশালাইজড বিভাগ চালু করলে তো আমার ভাত খাওয়ার সময়ও থাকবে না। কারণ আমাকে স্পেশাল সার্ভিস দিতে হবে।’ পেটের পীড়া নিয়ে অতীতে যেসব রোগী আসতেন, তাঁদের এই সমস্যা, ওই সমস্যা হতে পারে বলে বিজ্ঞজনরা বলতেন। আমি বলতাম, ‘স্যার, পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন, কী রোগ হতে পারে বলে দিচ্ছি।’ এরপর পেটে এন্ড্রোসকপি মেশিন ঢুকিয়ে দিয়ে আলসার আছে কি নেই, বলে দিতাম। পেটের পীড়ায় আক্রান্ত কোনো রোগী এলেই সিনিয়ররা দেখে আমাকে যেন শেষে দেখানো হয় সে পরামর্শ দিতেন। তখনো দেশে স্পেশালাইসড চিকিৎসা তেমনভাবে শুরু হয়নি। যাঁরা কার্ডিওলজি বা হৃদরোগের চিকিৎসা করতেন, তাঁরা ‘ফিজিশিয়ান অব কার্ডিওলজি’ লিখতেন। কিন্তু আমি শুরু থেকেই ‘গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোরোলজিস্ট’ লিখতাম। আইপিজিএমআরে এই বিভাগের শুরুতে জায়গা ছিল না, বেড ছিল না, মানুষের মধ্যে এই রোগের বিষয়ে কোনো ধারণাও ছিল না। বলেছিলাম বেড না থাকলেও হবে। রোগীরা অন্যের বেডে ভর্তি হবেন, পরামর্শ দিয়ে দেব। পরে আমার বিভাগ চালু হলো, একজন সহকারী রেজিস্ট্রার ছিলেন। বেড হওয়ার পর তিনজন হাউসম্যান ছিলেন। এই বিভাগটি আমি এ দেশে শুরু করেছি, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এন্ড্রোসকপি চালু করে সেটির প্রশিক্ষণ কার্যক্রম করেছি। এমনকি যাঁরা পিজিতে চাকরি করেন না, তাঁদেরও এই প্রযুক্তি কিনে আনার পর প্রশিক্ষণ দিয়েছি। পরে তো চাহিদার কারণে, আমাদের উদ্যোগে বাংলাদেশের সব মেডিক্যাল কলেজে গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোরোলজি বিভাগ চালু হয়ে গেছে। এই রোগের চিকিৎসাকে আমি ছড়িয়ে দিয়েছি। এখন যাঁরা এ বিষয়ে চিকিৎসা করেন, তাঁদের শিক্ষকরাও আমার ছাত্র। সেখানে আমার যা করা সম্ভব সবই করেছি। পিজিতে পেপটিক আলসার নিয়ে গবেষণা করেছি। আমার দেশে ইনফরমেটরি ভল ডিজিজ কী রকম হয় সেটি নিয়ে গবেষণা করেছি। কিন্তু সরকারি সেই প্রতিষ্ঠানে গবেষণা খাতকে চালু করা সম্ভব ছিল না। আরো কাজের সুযোগ আছে এবং গবেষণা খাতকে আরো উন্নয়ন করা যাবে বলে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতিতে যুক্ত হলাম।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতিতে শুরুতে কী হিসেবে ছিলেন?
প্রথমে অনারারি রিসার্চ ডিরেক্টর হিসেবে যুক্ত হয়েছিলাম। ১৯৮৭-৮৮ সাল থেকে পার্টটাইম কাজ করতাম। এমনকি আমার শ্বশুর অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম সাহেবের মৃত্যুর পরও এখানে উপদেষ্টা ছিলাম না। তিনি এই বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ১৯৫৬ সালে চালু করেছিলেন, এটি এখনো আছে। কর্মচারীদের মধ্যে গোলমালের কারণে পরে আমাকে এটির হাল ধরতে হলো। ১৯৯২ সালে পিজি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে বারডেমে কাজ শুরু করলাম। ১৯৯২ সাল থেকে এখনো বারডেমে বিনা বেতনে চাকরি করি।
বারডেমে আপনার অবদান?
একটি ছোট্ট প্রতিষ্ঠান ছিল। একে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ায় আমার অবদান আছে। সাধারণ রোগীদের মধ্যে রোগের বিষয়ে সচেতন করার জন্য অসংখ্য রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি করেছি। ধনী, গরিব সবার মধ্যে এই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ছড়িয়ে দিয়েছি। একে ‘মডেল হাসপাতাল’-এর রূপ দিয়েছি। আজকের ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ড্রোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিসঅর্ডার (বারডেম)’ আমার হাতে গড়া, আমিই একে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছি। আগে তো চিকিৎসকরা গবেষণা করবেন এই ধারণাটিই ছিল না। সে ক্ষেত্রেও আমার অবদান আছে। এখানে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে গবেষণার আগ্রহ তৈরি করেছি। ‘প্ল্যান্ট ম্যাটেরিয়াল অ্যান্ড ডায়াবেটিক’, ‘এ দেশে ডায়াবেটিকের এপিডিমোলজি বা ধরন’, ‘কিভাবে ডায়াবেটিস রোগের সেবাকে আরো বিস্তৃত করা সম্ভব’—এসব নিয়ে আমরা গবেষণা করি। অত্যন্ত মানসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা জার্নালে আমার ১৬৭টি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। আমার হাতে ‘ইব্রাহিম কার্ডিয়াক (হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট)’ হয়েছে। ডায়াবেটিক রোগীদের হৃদরোগ বেশি হয়। হৃদরোগের চিকিৎসা খুব উন্নত ছিল না বলে এটি চালু করেছি। ইব্রাহিম মেডিক্যাল কলেজ বাংলাদেশের সেরা বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ। এটিও আমি চালু করেছি।
স্বাস্থ্যসেবাকে ছড়িয়ে দিতে আর কী কী করেছেন?
ন্যাশনাল হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্ক (এনএইচএন) আমার গড়া। এর মাধ্যমে আমরা চিকিৎসাসেবাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছি। এই নেটওয়ার্কের অধীনে ঢাকার মিরপুর-১০, সাভার, ওয়ারীসহ বিভিন্ন জায়গায় আমাদের ডায়াবেটিক সমিতিরও সেন্টার আছে। আমাদের বেতনভুক চিকিৎসক আছেন। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস আমার হাত দিয়েই করা। উত্তরবঙ্গের হেলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের মাধ্যমে আমাদের ডায়াবেটিক কেয়ার মডেল অনুযায়ী দিনাজপুর, পাবনা, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, সিরাজগঞ্জে যে ডায়াবেটিক সমিতিগুলো আছে, সেগুলো জেনারেল হাসপাতাল হয়েছে। এই হাসপাতালগুলোর অধীনে সেই জেলাগুলোর গ্রামগুলোতে ডায়াবেটিক সেন্টার করা হয়েছে, আরো সেন্টার করব। সেগুলোও আমার গড়া, প্রজেক্টগুলো তৈরি করে দিয়েছি। এখন ঢাকার মিরপুরের দারুস সালামে আমরা ৬০০ আসনের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেস হসপিটাল করছি। হরমোনের অসুখ প্রতিরোধের জন্য সমমনাদের নিয়ে ‘বাংলাদেশ এন্ড্রোক্লিন সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেছি, প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ছিলাম। কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে আমার উদ্যোগে এই বিভাগটি চালু হয়েছে। এখন যে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ডাক্তাররা রোগী দেখে আসেন, সেই কর্মসূচিও আমার হাতে তৈরি ও বিস্তৃত হয়েছে। রোগীর কাছে চিকিৎসকরা যাবেন—এই ধারণাটিই আমার সৃষ্টি। দেশের এমন কোনো জেলা নেই, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পের মাধ্যমে বিনা পয়সায় রোগী দেখিনি। আমার জীবনটি যদি মানুষের উপকারে না আসত তাহলে তা বোঝা হয়ে যেত। মানবসেবাই আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
এই হাসপাতালের মান ধরে রাখতে কী করছেন?
আমরা চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দানের চেষ্টা করি। সম্প্রতি ১৩ হাজার জেনারেল প্র্যাকটিশনার্সকে (জিপি) আমরা আমাদের ডিসট্যান্স লার্নিং প্রজেক্টের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় জিপি ট্রেনিং প্রগ্রাম। তাঁরা সারা দেশে কাজ করছেন। আমি ডায়াবেটিসের সাধারণ বইগুলোকে আধুনিক করেছি। এখানকার ব্যবস্থাপনাকে আরো উন্নত, শৃঙ্খলাপরায়ণ করেছি। কারণ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলাই তো জীবন। সরকার আমাদের অনুদান দেয়; কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। আমাদের মূল সমস্যা হলো, গরিব রোগীদের ইনসুলিনসেবা বিনা মূল্যে দিতে চাই, সেটি করতে পারছি না। তাঁদের বিনা মূল্যে ইনসুলিন দেওয়া দরকার। বারডেমের ৩০ শতাংশ বেড গরিব রোগীদের জন্য ফ্রি, সেই বেডে ভর্তি হলে সব চিকিৎসা ফ্রি। আমরা ফ্রি বেডের কোনো লেভেল দিই না। ফলে তাকে অন্য রোগীদের মতোই চিকিৎসকরা সেবা দেন। এখানে সারাক্ষণ সুপারভিশন করি।
শ্রুতলিখন : ইয়াকুব ভূঁইয়া
(২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বারডেম, ঢাকা)
সম্পর্কিত খবর