kalerkantho

তুমি তো আছই

১৩ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



তুমি তো আছই

সারা বিশ্বের সব বাঙালি খ্রিস্টানের মধ্যে প্রথম কার্ডিনাল মহামান্য প্যাট্রিক ডি’রোজারিও, সিএসসি। কার্ডিনাল হিসেবে তিনি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপকে নানা বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করেন। পোপ নির্বাচনেও তিনি ভোট দেওয়ার ক্ষমতাধিকারী। তাঁর সহজ-সরল জীবনযাপন যেকোনো মানুষকে উদ্দীপ্ত করবে। স্রষ্টার প্রতি তাঁর আত্মনিবেদন বিশ্বাসী মানুষকে জোগাবে শক্তি ও সাহস। সেই জীবনই জানলেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

 

আপনার জন্ম? পারিবারিক ইতিহাস?

আমার জন্ম ১৯৪৩ সালের পয়লা অক্টোবর বরিশালের বাকেরগঞ্জ থানার পাদ্রি শিবপুর গ্রামে। ১৪ বংশ ধরে আমরা ক্যাথলিক খ্রিস্টান। সেই সুবাদে আমি পুরো খ্রিস্টীয় ধর্মীয় আবহে মানুষ হয়েছি। মা-বাবা খুব ধার্মিক ছিলেন (দীর্ঘশ্বাস)। ছোটকাল থেকে তাঁরা বাড়িতে আমাদের প্রার্থনা করাতেন। নৈতিক জীবনচর্চার ব্যাপারেও খুব কড়া ছিলেন। বাবা মাইকেল ডি’রোজারিও কৃষিজীবী ও মা ডিস্পিনা ডি’রোজারিও গৃহিণী ছিলেন। আট ভাই-বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। সবার বড় ভাই রেজিনাল্ড ডি’রোজারিও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাড়ইপুর জেলার কল্যাণপুর এলাকায় বসবাস করতেন। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার সুযোগ পেলেও বিজ্ঞানমনস্ক এই মানুষটি গোবর থেকে বায়োগ্যাস তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি বেশ কয়েকটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বসিয়েছিলেন। প্ল্যান্টগুলো দিয়ে বড় বড় কম্পানি গ্রামে গ্রামে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা করেছিল। তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘রেজিনাল্ড কম্পানি’ বন্ধ হয়ে গেছে বটে, তবে সরকার সেই কাজটি চলমান রেখেছে। এক বোন বাদে অন্য ভাই-বোনরাও কলকাতা নিবাসী। আমরা দুই ভাই-বোন বেঁচে আছি। কলকাতার খ্রিস্টান সমাজের বেশির ভাগই বাংলাদেশের ঢাকার নবাবগঞ্জের আঠারো গ্রাম, গাজীপুরের ভাওয়াল ইত্যাদি অঞ্চল থেকে ভারতে গিয়েছেন। কলকাতায় তাঁরা বিশেষত ক্যাটারিং সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। বড় বড় হোটেলে শেফ, টেবিল বয়—এই তাঁদের বেশির ভাগ মানুষের চাকরিজীবন (দীর্ঘশ্বাস)। গ্রামে আমাদের পৈতৃক ভিটা আছে। এক ভাইয়ের ছেলে-মেয়েরা বাস করে। বাড়ির নাম ‘পাড়ের বাবুর বাড়ি’।

 

ধর্মের প্রতি আপনার এই প্রবল অনুরাগ ও ভালোবাসা কি মা-বাবার কাছ থেকে পাওয়া?

আমার জন্মের তিন বছর পর বড় ভাইদের কাছে সংসারের দায়িত্ব দিয়ে বাবা সংসার ত্যাগ করেছেন। ভারতের দার্জিলিংয়ের গভীর বনে টানা ছয়টি বছর গভীর সাধনা করে ১৯৫২ সালে তিনি ফিরে এলেন। তাঁর পোশাকও আমার এই পোশাকের মতো লম্বা ধরনের ছিল—লাল পায়জামা, গায়ে লাল চাদর; বড় দাড়ি, বড় চুল, বুকে বিরাট ক্রুশ। তার পর থেকে তিনি এভাবে সাধুর জীবনই কাটিয়েছেন। পরিবারে ফিরেছেন, কিন্তু বাড়িতে থাকতেন না। কোনো কিছুর প্রতিই তাঁর আসক্তি দেখিনি। তিনি সব ধর্মের মানুষের কাছে গিয়েছেন, সবার সঙ্গে মিশেছেন, সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করেছেন। তিনি আমাদের ফসলাদিও গরিবদের মধ্যে বিলি করতেন; অবিবাহিতদের নিজ উদ্যোগে অল্প খরচে বিয়ে দিয়েছেন।  হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে চলে যেতেন, সাধুদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে এক-দুই মাস পর ফিরতেন। তাঁর নিজের বলতে কোনো পোশাকও ছিল না। আমরা ভাই-বোনরা অনেক বলে-কয়ে তাঁকে দুই সেট কাপড় দিতে পেরেছিলাম। এটুকুই তাঁর সম্বল ছিল। তিনি সুদূর রাঙামাটিতে এক ফাদারের সঙ্গে থেকে পাহাড়ি, আসামের মানুষদের মধ্যে বাণী প্রচার করতেন। বেতনাদি, সুযোগ-সুবিধা কিছুর প্রতিই বিন্দু পরিমাণ লোভ ছিল না, নিতেনও না। ফাদারকে সেবা দিতেন। হাতে বাইবেল, প্রার্থনা পুস্তক ও লাঠি নিয়ে গ্রামে গ্রামে যেতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁকে আমি এই বেশেই দেখেছি।

 

তাহলে আপনাদের মানুষ করেছেন কে?

মা। তিনি পিঠাপিঠি আমরা দুই ভাই-বোনকে মানুষ করেছেন। তখন আমাদের অবস্থা গরিবই ছিল। পঞ্চাশের মন্বন্তরের পরের বছরই তো আমার জন্ম; অভাব তখন জেঁকে বসেছে। পুরো দেশেই অভাব ছিল বলে কলকাতা থেকে ভাই-বোনরা তেমন টাকাও পাঠাতে পারতেন না। আর তাঁদেরও তো পরিবার আছে। স্কুলে পড়ার সময় গরু লালন-পালন করেছি, ওদের জন্য ঘাস কেটেছি, জমিতে ধান কেটেছি। বর্গাচাষিদের জন্য ভাত নিয়ে গেছি। আমাদের দুই একর জমি যেকোনো পরিবারের সচ্ছলতার জন্য যথেষ্ট ছিল, কিন্তু চাষাবাদের তো কেউ ছিল না। বর্গা দিয়ে সংসার চালাতে হতো। একটি কালো গাইয়ের দুধ বিক্রি করে মা আমাদের মানুষ করেছেন। ছোটবেলা থেকে ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা যাই হোক না কেন প্রতিদিন তিনি আমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তেন। ১৫ মিনিট কাদামাখা পথ হেঁটে গির্জায় যেতেন। আধা ঘণ্টা, ৪৫ মিনিট উপাসনা করতেন। তখন বাঙালিদের মধ্যে যাজক বেশি হননি। ছোটবেলায় কানাডিয়ান, হলিক্রসের ফাদারদের বেশি দেখেছি। আমাদের গ্রামে অবশ্য দুইজন বাঙালি ফাদার ছিলেন। তাঁরা গির্জা, উপাসনা পরিচালনা করতেন। উপাসনার সময় আমি তাঁদের সেবা দিতাম, মানে সাহায্য করতাম। এই কাজকে আমরা ‘বেদির সেবক’ বলি। মা  ঈশ্বরের আনুকূল্য লাভ করতে কোনো বাঁধায়ই বাড়িতে থাকতেন না, আমাকে নিয়ে গির্জায় চলে যেতেন। তিনি প্রতিদিন সকালে আমাদের নিয়ে পারিবারিক প্রার্থনা করতেন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় একবার প্রার্থনা করিনি বলে তিনি রাতে ‘ভাত’ খেতে দেননি। এখন তো সিগারেট খায়, তখন তরুণরা বিড়ি, তামাক পাতা খেত। আমাদের অঞ্চলে প্রচুর সুপারি হয়। একবার বাড়ি থেকে ১০টি সুপারি নিয়ে গিয়ে স্কুলের সামনের দোকানে বিক্রি করে কয়েকটি বিড়ি কিনেছিলাম। এই কথা জেনে তিনি তিন দিন আমাকে বাড়িতে ঢুকতে দেননি, বারবার বলেছেন, ‘তুমি অন্যায় করেছ।’ তখন মাসির বাড়িতে ছিলাম। মায়ের কাছে এমন শাসনের পাশাপাশি নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও প্রার্থনা জীবনও পেয়েছি। আনুষ্ঠানিকতা নয়, আমাদের বাড়িতে সত্যিকারের ধর্মচর্চা ছিল। সকালে প্রার্থনা করে স্কুলে যেতে হতো, রাতেও প্রার্থনায় বসতে হতো।

 

বাঙালি প্রথম কার্ডিনালের মা-বাবাই কি তাঁর প্রথম ধর্মশিক্ষক?

মা-বাবা ছাড়া আমি কে? আমার মা তো লেখাপড়া শিখতে পারেননি। তবে তিনি ‘ঈশ্বর ভক্ত’ নারী ছিলেন। ধর্মীয় দিক থেকে আমার চেয়েও অনেক বেশি জ্ঞান তাঁর ছিল। ১৯৯৫ সালে তিনি মাত্র ৯০ বছর বয়সে মারা গেছেন। আমি ফাদার, বিশপ হওয়ার পরও মায়ের জীবন থেকে কিভাবে ঈশ্বরকে ভালোবাসতে হয় তা উপলব্ধি করেছি, শিখেছি। এই প্রসঙ্গে বলি—তখন চিঠিপত্রের যুগ ছিল। আমি রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের বিশপ। তিনি চিঠি লিখলেন, ‘বাবা, বাড়িতে এসো, তোমার সঙ্গে সুখ-দুঃখের কথা বলব।’ যখনই বাড়িতে পা দিতাম, তিনি বলতেন, ‘আমার কাছে এসে বসো।’ আমি বাড়ি গেলাম। বললাম, ‘কী যেন বলবেন মা?’ ‘কী আর বলব? তুমি তো আছই।’ আমার উপস্থিতি অন্তর থেকে তিনি অনুভব করতেন। তাঁর সব বেদনা, দুশ্চিন্তা দূর হতো। স্রষ্টার সামনে যখন আমরা প্রার্থনায় বসি, তখন তো আমাদের কোনো কথা থাকে না। যতক্ষণ তাঁর কাছে আত্মনিবেদন করতে না পারি, খুব উদগ্রীব লাগে। যখনই তাঁকে অনুভব করতে পারি, সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। মা তাঁর আচরণ, অনুভব, প্রার্থনা দিয়ে আমাকে শিখিয়েছেন—কিভাবে ঈশ্বরের প্রার্থনা করব, কিভাবে তাঁর সঙ্গে থাকব। আর বাবা তো সংসারে এসেও সংসারত্যাগী ছিলেন। এ ঘটনাও আমার মধ্যে খুব দাগ কেটেছে। আত্মীয়দের খুব ভালোবাসি, কিন্তু আমার কোনো দায়িত্ব নেই। সংসারে আমার জন্ম, বিকাশ, কিন্তু সংসার ত্যাগই আমার জীবন—বাবার কাছ থেকে এই বোধটি শিখেছি। তিনি সব সময় বলতেন—ঈশ্বরের রাজ্য মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান বা অন্য কোনো ব্যক্তিবিশেষের নয়, এই রাজ্য সৃষ্টিকর্তার রাজ্য। এই কথাটি সব সময় নাড়া দেয়। তিনি তাঁর জীবনাদর্শের মাধ্যমে আমার জীবনে খুব রেখাপাত করেছেন। বিশপ হওয়ার ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে তাই প্রথমেই বলেছিলাম, আমি খ্রিস্টসমাজের ধর্মপালক হয়েছি বা আমাকে তা করা হয়েছে; কিন্তু মা-বাবা বাড়িতে লালন-পালন না করলে আমি কোথায় থাকতাম? মণ্ডলীর বা পালকের তিনটি দায়িত্ব আছে—আধ্যাত্মিক জীবনের মাধ্যমে মানবসেবা, তাদের শিক্ষা দেওয়া ও সমাজকে পরিচালনা করা। এই তিনটি কাজই প্রভু যিশু করেছেন। পালক হিসেবে এ কাজগুলো আমিও করছি, পোপ মহোদয়ও করছেন। মা-বাবাও এ দায়িত্বগুলো পালন করেছেন।

 

আপনার স্কুলটি তো খুব বিখ্যাত?

আমাদের সেন্ট আলফ্রেড স্কুল আগে থেকেই নামকরা। স্কুলটি কানাডিয়ান ফাদাররা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এলাকায় আমরা সংখ্যালঘু, কিন্তু পুরো অঞ্চলে, সারা দেশে এটি নামকরা স্কুল। সেই আমলেই চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফরিদপুরসহ দেশের নানা জেলার মেধাবী ছাত্ররা স্কুলের বোর্ডিংয়ে (হোস্টেল) থাকতেন। মুসলিম বোর্ডিং ছিল। সেখানে জায়গা হতো না বলে আশপাশের বাড়িতে লজিং মাস্টার থেকে তাঁরা লেখাপড়া করতেন। খ্রিস্টান বোর্ডিংও ছিল। শিক্ষকদের মধ্যে বিদেশি ফাদার ছিলেন। নামকরা বাঙালি শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতা পেশাটি তখন চাকরি ছিল না। আমাদের লতিফ স্যার অঙ্কের জাহাজ ছিলেন। আমি বীজগণিতে দুর্বল ছিলাম, তবে জ্যামিতিতে খুব ভালো ছিলাম। ম্যাট্রিকের আগে লতিফ স্যার বলেছিলেন, ‘পরীক্ষার দুই সপ্তাহ আগে আমার কাছে এসে তুমি বীজগণিত শিখে যাবে।’ সেই জন্য কিন্তু তিনি এক পয়সাও নেননি। উর্দু শিক্ষক রাজ্জাক আলী স্যার তো মাওলানা ছিলেন। তিনি এত ভালো পড়িয়েছেন যে এখনো আমি ভালো উর্দু পারি। বাংলার রাজেন্দ্রমোহন রায়ও খুব বিখ্যাত শিক্ষক। আবদুল আলী স্যার ইংরেজি গ্রামারের ওস্তাদ ছিলেন। একবার ক্লাসে টেন্স  ভুল হওয়ায় তিনি আমাকে এমন এক চড় মেরেছিলেন যে আর কোনো দিন টেন্স ভুল করিনি। আমাদের স্কুল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হতো, ১৯৩৭ সালে প্রথম ব্যাচ ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে। এখন সমবায়ের জন্য ক্ষুদ্র ঋণদান কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। তবে আমাদের সময়ে সমবায়ের ধারণা অন্য রকম ছিল। আমাদের স্কুলের চত্বরে প্রতিটি ছাত্রের জন্য আলাদা জমি বরাদ্দ ছিল। সেখানে ফসল উত্পাদন করে স্কুলের সামনের সমবায় দোকানে আমাদের বিক্রি করতে হতো। এভাবে সমাজ উন্নয়নের পাঠ নিয়েছি। ১৯৬১ সালে মানবিক বিভাগ থেকে ম্যাট্রিক পাস করলাম। বাড়ি থেকে ১৫ মিনিট হেঁটে স্কুলে আসা-যাওয়া করতাম।

 

ছাত্র হিসেবে কেমন ছিলেন?

ছাত্র হিসেবে আমি ভালো ছিলাম। তবে প্রথম শ্রেণিতে এত ভালো ফল করেছিলাম যে দ্বিতীয় শ্রেণি না পড়িয়েই শিক্ষকরা তৃতীয় শ্রেণিতে তুলে দিলেন। দ্বিতীয় শ্রেণির পড়া তো আর জানতে পারিনি। তখন তো আজকের মতো প্রাইভেট টিউটর, নোট-গাইড ছিল না, শিক্ষকদের পড়ানোর মানও খুব ভালো ছিল। ফলে এই না জানায় আমাকে খুব সংগ্রাম করতে হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণিতে পাস নম্বর ছিল ১০০-তে ৫০, যখন ম্যাট্রিক দিলাম, তখন পাস নম্বর ছিল ‘৩৩’। পাস নম্বরের ওঠানামায় সব সময়ই আমার নম্বর ৫১ থেকে ৫৩-এর মধ্যে ছিল।

 

স্কুলে আপনার ধর্মীয় জীবন?

আমিও দুই বছর বোডিংয়ে ছিলাম। সকালে প্রার্থনা, ধ্যান, উপাসনা, গির্জায় প্রার্থনা, দুপুরের খাওয়ার পর প্রার্থনা আর সন্ধ্যায় প্রার্থনা করতে হতো। বাইবেল পড়তাম। অন্যান্য ধর্মগ্রন্থও পড়তাম। ব্রাদাররা আমাদের নীতি শিক্ষা দিতেন। সপ্তাহে এক দিন চরিত্র গঠন, সবাইকে নিয়ে একত্রে বসবাস, নিয়মানুবর্তিতা ইত্যাদি উপদেশের ক্লাস নিতেন।

 

এই জীবনের টার্নিং পয়েন্ট?

পরিবারেই তো আমি উন্নত নৈতিক, ধর্মীয় শিক্ষা পেয়েছি। জমিতে নতুন ফসল এলেই আমার মা বলতেন, ‘প্রথম ফসলটি যেন গির্জায় যায়, এরপর আমরা খাব।’ তার আগে কোনো কিছু ছুঁয়েও দেখতে পারতাম না। ফাদারদের জীবনের সঙ্গে এভাবে আমাদের জীবনের সংযোগ তৈরি হয়েছে। বাড়ির ফসল গির্জায় দিতে দিতে এই জীবনটিও আমি গির্জায় দিয়ে দেওয়ার প্রেরণা লাভ করেছি। ভারতের গোয়া অঙ্গরাজ্যের ফাদার বাট্রার্ন্ড রড্রিক্স আমাদের পাদ্রি শিবপুর ধর্মপল্লীর প্রধান ধর্মযাজক ছিলেন। একবার আমার পায়ে ঘা হলো। জমিতে ধানগাছের সঙ্গে লেগে সেটি আরো বেড়ে যেত। প্রতি সপ্তাহে তিনি তিনবার আমাকে তাঁর ঘরে নিয়ে যেতেন। বাসনের মধ্যে ডেটল মিশিয়ে পা ডেটল দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করতেন। তিনি ফাদার আর আমি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। এই যে যত্ন, ভালোবাসা, সেবা তিনি আমার করলেন, তারপর আমার মনই বদলে গেল—আমি তাঁর মতো হতে চাই। তাঁর মতো সাধারণ মানুষের সেবা করতে চাই। ফাদাররা যেভাবে নিস্বার্থভাবে সেবা করেছেন, আমি তাঁদের মতো মানুষের সেবক হতে চাই। 

 

হলিক্রসের সঙ্গে যুক্ত হলেন কবে?

ফাদার রড্রিক্স রাঙামাটিতে বদলি হয়ে গেলেন। আমিও সপ্তম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করে অষ্টম শ্রেণিতে উঠলাম। তিনি চিঠি লিখলেন, ‘মন চাইলে চলে এসো।’ তাঁর বদলে যে নতুন কানাডীয় ফাদার (পাঁইয়া নেইজল) এসেছেন, তিনি পবিত্র ক্রুশ সংঘের (সিএসসি) সদস্য। গির্জায় আসি, ফাদারদের সেবা করি বলে ভালোভাবে চেনেন। চলে যাওয়ার আগের দিন ধর্মপল্লীতে গিয়ে তাঁর কাছে শেষ বিদায় নিতে গিয়েছি; তিনি বললেন, ‘ওখানে কেন যাবে? ওখানে তো আমাদের স্কুল নেই, এখানে ভালো স্কুল আছে। ফাদার হতে চাইলে এখানে থেকে হও।’ এই আমার জীবনের মোড় ঘুরে গেল। পবিত্র ক্রুশ সংঘের (সিএসসি) সংস্পর্শে এলাম। সেই থেকে প্রতি মাসে একবার তিনি আমার সঙ্গে বসে আধ্যাত্মিক আলাপ করতেন। জীবনকে কিভাবে পরিচালিত করব—এ বিষয়ে পরামর্শ দিতেন।

 

বিশ্বাস প্রবল হলো কিভাবে?

১৯৬১ সালের ৭ মার্চ ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলাম। মে মাসের ৭ তারিখ পটুয়াখালীর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কাছে সোনাতলা গ্রামে পাঠানো হলো। গ্রামটি নীলগঞ্জ নদীর ধারে। এই গ্রামে কয়েকজন ব্যাপ্টিস্ট ক্যাথলিক হতে চেয়েছেন। তাঁদের ধর্মশিক্ষা দিতে হবে। নৌকায় নদী পেরিয়ে গ্রামে পৌঁছলাম। তখন নদীর জল পার থেকে ছয়-সাত ফুট নিচে ছিল। এক সচ্ছল বাসিন্দার বাড়িতে উঠলাম। নদীর পার থেকে মাঠ পেরিয়ে মাটি থেকে দু-তিন ফুট ওপরে তাঁর বাড়ি। মাটি থেকে ১০-১১ ফুট ওপরে দোতলায় কাঠের ঘরে আছি। তাদের ১২টি মহিষ ছিল। বিরাট এলাকাজুড়ে চাষাবাদ করেন। পৌঁছানোর দ্বিতীয় দিন পুরো দিন ধরে বৃষ্টিপাত হলো। তৃতীয় দিন রাতে হঠাৎ জলোচ্ছ্বাস শুরু হলো। বঙ্গোপসাগরের বিরাট ঢেউ ও পানির তোড়ে সব ধুয়ে গেল। ভিটার ওপরে ২০ ফুট জল, মাটির ঘর জলে ধুয়ে গেল, ঘর ভেঙে গেল, প্রচণ্ড বৃষ্টি-বজ্রপাত-জলোচ্ছ্বাস—বিশাল ঢেউ বইছে। রাতের আধারে সাঁতরে এক খেজুরগাছে ১২ ঘণ্টা ঝুলে থাকলাম। নিচ দিয়ে প্রচণ্ড জল বয়ে যাচ্ছে। জলোচ্ছ্বাসে সেই এলাকার ৫৬ শতাংশ লোক মারা গেল। পাঁচ দিন পর সামান্য পোশাক পরা অবস্থায় খুব কষ্ট করে সাঁতরে বাড়ি ফিরলাম। ততক্ষণে অন্যরা ধরে নিয়েছেন, আমি আর বেঁচে নেই। ফিরেই প্রচণ্ড ডায়রিয়া ও কলেরায় অক্রান্ত হলাম। কানাডিয়ান সিস্টার, ডাক্তাররা জীবন বাঁচালেন। এরপর হলিক্রসের পবিত্র ক্রুশ সংঘে যোগদানের জন্য বরিশালের সাগরদীর ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউটে গেলাম এবং ধর্ম সাধনায় যোগ দিলাম। এক বছরের নভিশিয়েট (নব্যাশ্রম) হলো। বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। প্রার্থনা, ধ্যান, শিক্ষা, ধর্মশিক্ষায় মগ্ন হলাম। কানাডিয়ান এক ফাদার শিক্ষক, ছাত্র আমরা চার-পাঁচজন। ১৯৬২ সালে এই ক্যাসাক (ফাদারের সাদা পোশাক) পেলাম ও পবিত্র ক্রুশ সংঘের ব্রত গ্রহণ করলাম। তখন আমার বয়স ১৮ বছর। সারা জীবনের জন্য তিনটি ব্রত নিলাম—দারিদ্র্য, কৌমার্য ও বাধ্যতা। দারিদ্র্য বলতে আমার নিজের আর কিছু নেই, কোনো কিছুর ওপর মালিকানা, স্বত্বাধিকারও নেই। সংসার ত্যাগ বলতে শুধু এই নয়—বিবাহই করব না, সূচি বা পবিত্র থাকব। কোনো লালসার দিকেই অগ্রসর হব না। মানুষের ঊর্ধ্বে পরমেশ্বরকে ভালোবাসব। আর সর্বশেষ ব্রত হলো, ঈশ্বরের ইচ্ছার প্রতি আজীবন বাধ্য থাকব। ঈশ্বরের ইচ্ছা আমার ঊর্ধ্বতনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তিনি আমাকে পরিচালিত করেন, আমি তাঁর কথায় বাধ্য থাকব। কার্ডিনাল হলেও যেমন আমি পোপ মহোদয়ের বাধ্য। তিনি আমাকে যা বলেন, পালন করি। এই যে জীবনে কত পরিবর্তন এলো—ইচ্ছা না থাকলেও ঈশ্বরের প্রতি, তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি বাধ্য বলে সব গ্রহণ করছি। ফাদার হওয়ার জন্য চেষ্টা করেছি, কিন্তু আর্চবিশপ বা কার্ডিনাল হওয়ার জন্য চেষ্টা করিনি।

 

নটর ডেমের জীবন?

গ্রাম থেকে এসে নটর ডেম কলেজে ভর্তি হলাম। কলেজ তখন ইংরেজি মাধ্যম ছিল। আইএতে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ইফতেখার চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক বিশেষ রাষ্ট্রদূত, এখন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জিয়া উদ্দিন আমার সহপাঠী ছিল। আমরা যারা ফাদার হতে চেয়েছি, তারা তো বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে পারতাম না, অনার্সেরও সুযোগ ছিল না। তাই প্রথমে বাংলায় ও পরে আলাদাভাবে ইংরেজিতে ‘বিএ’ পাস করেছি। তখন এত ছাত্র ছিল না। নটর ডেমে চার বছর পড়েছি। প্রতিটি বিষয়ে ৫৮-৫৯ নম্বর পেয়েছি।

 

কোথায় থাকতেন?

পবিত্র ক্রুশ সংঘে (সিএসসি) যোগ দেওয়ায় ফাদারদের সঙ্গে থাকতাম। ফাদার টিম, ফাদার পিশোতোর সঙ্গে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে। যে বছর নভিশিয়েটে গেলাম, সেই বছর ফাদার পিশোতো বাংলাদেশে এলেন। ফাদার টিমকে নটর ডেমে পেয়েছি। আমি মানবিক বিভাগের ছাত্র বলে তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন না। তিনি জীববিদ্যা পড়াতেন। দেখতাম—মার্টিন হল থেকে হ্যারিংটন হলে প্রার্থনা করতে করতে যাচ্ছেন, সারা দিন মাইক্রোস্কোপ নিয়ে গবেষণা করছেন। ফাদার গিলেস্পি আমাদের ইতিহাস পড়াতেন। ফাদার রিচার্ড নোভাক ১৯৬৪ সালে রায়টের সময় নারায়ণগঞ্জে গিয়েছিলেন, দাঙ্গা সৃষ্টিকারীরা তাঁকে মেরে ফেলেছেন। ফাদার হুইলার তখন প্রিন্সিপাল ছিলেন। ফাদার জেমস ব্যানাস ছিলেন। ফাদার জোসেফ লুরুসো আমাদের ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। আমরা সবাই একসঙ্গে থাকতাম। পবিত্র ক্রুশ সংঘে প্রবেশ করলে আমরা একসঙ্গে হয়ে যাই। তাঁদের সঙ্গে একসঙ্গে প্রার্থনা, খাওয়া হতো। তাঁরা শিক্ষাবিদ ছিলেন। পবিত্র ক্রুশ সংঘের বৈশিষ্ট্যগুলো তাঁদের ভেতরে দেখেছি। শিক্ষকরা কাজ ও প্রার্থনায় ডুবে থাকতেন। ক্যাসাক পরে ক্লাসে যেতাম। হামিদ স্যার বিএর বাংলা ক্লাসে রসিয়ে বাংলা সাহিত্য, মধ্যযুগীয় গীতি কবিতা পড়াতেন। তখন কয়েকজন মাত্র ছাত্র ছিলাম। অন্যদের সঙ্গে ক্যাসাক পরা, ধর্মীয় জীবনে অভ্যস্ত আমাদের চার ছাত্রের সামনে এসব পড়াতে তিনি সামান্য ইতস্তত বোধ করতেন। আমার বাংলা সাহিত্য নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, ফাদার হতে হলে তো বাংলা, ইংরেজি ভালো করে জানতে হবে। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের আমিই প্রথম ছাত্র হিসেবে বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আলাদাভাবে বিএ পাস করেছি। ইতিহাসও সে কারণেই পড়েছি। এই তিনটি বিষয়ই আবশ্যিক ছিল। ইংরেজি সাহিত্যের কোনো নোট ছিল না। মূল বই পড়তে হতো। কখনো কখনো ব্রিটিশ ইনফরমেশন সার্ভিসেস লাইব্রেরিতে গিয়ে শেকসপিয়ারের নাটক, কবি উইলিয়াম ওয়ার্সওয়ার্থ, লর্ড টেনিসনের বিষয়ে কিছু পেলে টুকে আনতাম। এভাবে নোট তৈরি করেছি। পাস করার পর সেগুলো জুনিয়রদের দিয়ে দিয়েছি। আমার হাতেই ইংরেজি নোট করা চালু হয়েছে।

 

নটর ডেমের পর কোথায় গেলেন?

ফাদারদের ছয় বছরের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্স করতে হয়। দুই বছর দর্শনশাস্ত্র, চার বছর ‘ঐশ্বতত্ত্ব’ (ধর্মতত্ত্ব) পড়তে হয়। দুটিই বিএ লেভেলের পড়ালেখা। ফলে মোট তিনবার বিএ পড়েছি। করাচির সবজিমণ্ডিতে ‘খ্রাইস্ট দ্য কিং’ সেমিনারি ছিল। সে পর্যায়ের সেমিনারি এখন ঢাকার বনানীতে আছে। তখন পুরো পাকিস্তানের জন্য এই একটি প্রতিষ্ঠানই ছিল। পাকিস্তানের পাঞ্জাবি, গোয়ানিজ, বাঙালিরা পড়তে যেত। পাঞ্জাবি ও বাংলাদেশ থেকে আমরা মোট ১৮ জন ছাত্র শেষ পর্যন্ত পড়েছি। হল্যান্ডের সাধু ফ্রান্সিসের অনুসারী ফ্রান্সিসক্যানের সদস্যরা আমাদের শিক্ষক ছিলেন। ছয় বছর ইংরেজি মাধ্যমে পড়েছি। গভীরভাবে ইসলাম, বৌদ্ধধর্ম, গ্রিক-প্রাচীন-আধুনিক-ভারতীয় দর্শন, ঐশ্বতত্ত্বের ইতিহাস, দুই হাজার বছরের নানা ধারা ও মতবাদ পড়েছি। ফাদার বেঞ্জামিন ও আমি আইএতে ক্লাসমেট ছিলাম। ১৯৬১-৬৩ শিক্ষাবর্ষে পাস করায় সে আমেরিকায় পড়তে গেল। বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে এসেছি বলে নিয়মের পার্থক্যে আমি যেতে পারিনি। সেখানে সে দুই বছর দর্শনশাস্ত্র পড়ে এক বছর নভিশিয়েটের পর করাচিতে ফিরল। তত দিনে আমি নটর ডেমে দুই বছর বিএ পড়লাম। করাচিতে আবার আমাদের দেখা হলো। করাচিতে থাকার সময় প্রতিবছর ছুটিতে দেশে ফিরতাম। আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম, দেশে আমাদের ওপর এই ধরনের নির্যাতন হচ্ছে। ফলে আমাদের মন খারাপ ছিল। আর পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তান-পশ্চিম পাকিস্তান ভাগ হোক তা চাইত না। ধর্মীয় আবহ থাকায় পুরোপুরি যে বিরুদ্ধাচরণ করতে পেরেছে তা নয়, কিন্তু দেশভাগ তো আবেগিক, মানবিক বিষয় ছিল। আমাদের ১৬ জন সেখানে আটকে পড়েছিলেন। দুই বছর তাঁরা রেড ক্রসের মাধ্যমে আফগানিস্তান হয়ে দেশে ফিরেছেন। ১৯৭০ সালে জলোচ্ছ্বাস হলো, ছুটিতে দেশে ছিলাম। জুন মাসে সপ্তাহখানেক নোয়াখালীর দক্ষিণে চর মহিপুরে পুনর্বাসন, ত্রাণ বিতরণ ইত্যাদি কাজ করতে হয়েছে। কোনো যানবাহনই ছিল না। হেঁটে দুর্গম এলাকা পাড়ি দিতে হয়েছে। দুইবার ডাকাতের কবলে পড়েছি।

 

কিভাবে দেশে এলেন?

১৯৭১ সালের মার্চ থেকে তো খুবই উদ্বিগ্ন ছিলাম—কী হয়, না হয়? ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে জুন মাসে দেশে ফিরে এলাম। দেশের পরিস্থিতি তত ভালো ছিল না। ঊর্ধ্বতন ও আমি মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, কোর্সের ছয় মাস বাকি থাকলেও আর ফিরে যাব না। করসপনডেনস কোর্সের মাধ্যমে স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে মেকআপ করলাম। ধর্মগৃহ নটর ডেম, না হয় পাদ্রি শিবপুরের ফাদারের বাড়িতে থাকতাম। বাড়িতে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যেতাম, কিন্তু থাকতাম না। বান্দরবানেও ফাদারদের কাছে শিখতে গিয়েছি।

 

মুক্তিযুদ্ধের সময় উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা?

বরিশালের সাগরদীতে আমাদের ধর্মসংঘ ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউটে ছিলাম। এক পাশে পাকিস্তান আর্মি-রাজাকার, অন্যদিকে মুক্তিবাহিনী অবস্থান নিয়েছিল। আমাদের অঞ্চলটি মুক্তিবাহিনীর দখলে ছিল। পাদ্রি শিবপুরের কানাডিয়ান ফাদার জারমেঁ গ্রামেজো পুরোপুরিভাবে মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করেছেন, সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিলের (অবঃ) সাক্ষাৎ সহকর্মী ছিলেন। আমাদের গ্রামে মেজর জলিল সেই ফাদার বাড়িতেও ছিলেন। জারমেঁর সহযোগিতায় আমাদের স্কুল কম্পাউন্ডে ৩০০ মুক্তিবাহিনী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়িতে গিয়েছি, কিন্তু সংসার ত্যাগ করেছি বলে রাতে থাকিনি। চাইলে থাকতে পারতাম, কিন্তু কখনো ইচ্ছা হয়নি। পাকিস্তানি বাহিনী পিডাব্লিউডিতে থাকত। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর বরিশাল মুক্ত হলো। সেদিন আমাদের ঘর ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউটে দুটি মর্টার পড়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের ওপরও মর্টার ছুড়েছিল। সেখান থেকে যখনই তারা দুটি জাহাজে ভর্তি হয়ে পালিয়ে গেল, ভারতীয় বিমানবাহিনী সেগুলো আক্রমণ করে ডুবিয়ে দিল। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। তিন সপ্তাহ পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি আমি ফাদার হলাম। স্বাধীন বাংলাদেশের আমিই প্রথম ফাদার। এ আমার জীবনের অন্যতম প্রেরণা। 

 

দেশ পুনর্গঠনে কিভাবে অংশ নিলেন?

বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় ‘খ্রিস্টান অর্গানাইজেশন ফর রিলিফ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন’র একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হলো। তখন ফাদার টিম বরিশালের দক্ষিণে মহিপাড়ায় পুনর্বাসনের কাজ করতেন। এক কানাডিয়ান ফাদার এই প্রকল্পটির দায়িত্বে ছিলেন, তিনি এসব কাজে যুক্ত হতে চাননি বলে আমি গৌরনদী ক্যাথলিক চার্চ মিশনের হয়ে প্রকল্পটির দায়িত্ব নিলাম এবং সামাজিক কাজে জড়িয়ে গেলাম। তখন গৌরনদী উপজেলায় ১০ হাজার পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ, তাদের পুনর্বাসনে কাজ করতে হয়েছে। আওয়ামী লীগের সব নেতাকর্মীর ঘরবাড়ি রাজাকার ও পাকিস্তানিরা পুড়িয়ে দিয়েছিল। আবুল হাসনাত

আবদুল্লাহসহ সবার ঘরবাড়ি পুড়ে গিয়েছিল। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাটিতে হিন্দুদের অনেক বাড়িঘর পুড়িয়ে ফেলেছিল। তাঁরা সবাই ভারতে চলে গিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তাঁরা ফিরে এলেন। সব হারানো এই মানুষদের উন্নয়নে কাজ শুরু করতে হলো। প্রকল্পটির অনেকগুলো দিক ছিল—কৃষিতে সাহায্য দান, ঘর তৈরির জন্য টিন সরবরাহ, রাস্তাঘাট তৈরি ইত্যাদি কাজ করতে হয়েছে। কৃষকদের গরু ছিল না। আমাদের ৪০টি পাওয়ার টিলার ছিল। সেগুলো দিয়ে জমি চাষাবাদের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। ঘর বানিয়ে দিয়েছি, রাস্তাঘাট তৈরি করে দিয়েছি, যেন লোকেরা কাজ করতে পারে। গ্রামে মাটির রাস্তা, সেতু, পুল তৈরি করে দিয়েছি। সেরনিয়াবাত আমার কম্পাউন্ডে এসেছিলেন, তাঁরা আমাদের সাহায্য করেছেন। অফিসে আমার সঙ্গে ২৫ জন কর্মী ছিলেন। সারা বেলা কাজের বিনিময়ে পয়সা পেতেন। বিদেশ থেকে ফান্ডিং আসত। বিশাল এই কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমার বিশাল অভিজ্ঞতা হলো। হিন্দু-মুসলমান, খ্রিস্টান সবাইকে নিয়ে গ্রামে গ্রামে কর্ম কমিটি করেছি। ফলে সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা হলো। পরিকল্পনা, গবেষণা, মাঠ জরিপ, মানুষকে নিয়ে কাজ করা শিখলাম। কাজটি এত ভালো হলো যে এর পর থেকে আমার সব গবেষণা, ভাবনা-চিন্তা ইত্যাদি সামাজিক চেতনা, মানব উন্নয়নের দিকেই ধাবিত হয়েছে।  তখন এক ডলার সমান চার টাকা ছিল। আমার মাধ্যমে প্রকল্পটিতে মোট ৪৫ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে। এটি আট কোটি টাকার প্রকল্প ছিল। সফল হয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় কাজও করতাম। তবে যুদ্ধের পরে মানুষের তো খাদ্য, বস্ত্র, কৃষিকাজ শুরু, পণ্য উত্পাদন করা ও জীবিকা নির্বাহ করা প্রয়োজন। ফলে মানবসেবাই তখন সবচেয়ে জরুরি ছিল। টানা দেড় বছর এই কাজ করেছি। প্রকল্পের শেষ দিকে খাওয়াদাওয়া, চলাফেরার কোনো ঠিক নেই বলে জন্ডিস, হেপাটাইটিস হয়ে গেল। অসুস্থ হয়ে গেলাম।

(২৬ জুন ২০১৮, কাকরাইল চার্চ, ঢাকা)



মন্তব্য