kalerkantho


শ্রদ্ধাঞ্জলি

দূর থেকে কাছে বঙ্গবন্ধু

নওশাদ জামিল   

১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



দূর থেকে কাছে বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪২তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান। ছবি : কালের কণ্ঠ

একজনের কাছে কাছ থেকে দেখা আপনজন, শ্রদ্ধার পাত্র, গর্বের ধন—জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অন্যদের কাছেও তিনি সে রকমই; ব্যবধান কেবল দূরত্বের। তাইতো কাছ থেকে দেখা ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে আরো বেশি করে জানল দূর থেকে জানা স্কুল শিক্ষার্থীরা। দূরের বঙ্গবন্ধু কাছে এলেন এই তরুণদের।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সদ্য নির্মিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় কাছের ও দূরের বঙ্গবন্ধুভক্তদের তথ্য-বিনিময় হলো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪২তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে এ শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সচিব ছিলেন ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সালের ১২ আগস্ট পর্যন্ত খুব কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিজীবন, নানা কর্মপন্থা ও রাষ্ট্রদর্শন তাঁর পাথেয়।

সেই ড. ফরাসউদ্দিনের কথা শোনার জন্য গতকাল সন্ধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে হাজির হয় বিভিন্ন স্কুলের অসংখ্য শিক্ষার্থী। স্কুল ড্রেস পরা এই তরুণ-তরুণীরা এসেছিল টানা বৃষ্টি উপেক্ষা করে।

বৃষ্টিভেজা হয়েও তন্ময় হয়ে তারা শুনেছে ও জেনেছে মহানুভব বঙ্গবন্ধুর কথা, বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শন ও তাঁর প্রজ্ঞা।

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণা করে ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত উদার ও মহানুভব মানুষ। দয়া, ক্ষমা, মহত্ত্ব—শব্দগুলো তাঁর সঙ্গে জুতসই। তাঁর উদারতার সুযোগ পেয়েই ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পেরেছিল। ’ 

শ্রাবণের বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় শুরু হয় বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত এ কথামালা। আবেগভরা কণ্ঠে ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘বিভিন্ন সময় ষড়যন্ত্রের কথা বঙ্গবন্ধুর কানে আসত। খন্দকার মোশতাক আহমদের কথা নানাজন বলত। হেসে উড়িয়ে দিতেন তিনি। বিশ্বাস করতেন, কোনো বাঙালি তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। মানুষের প্রতি তাঁর ছিল এমনই অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস। ’

অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে স্মৃতিচারণা ও একক বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধুর সাবেক একান্ত সচিব, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। আবৃত্তিশিল্পী রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় এতে স্বাগত বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী। পরে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ থেকে পাঠ করেন আবৃত্তিশিল্পী ফয়জুল্লাহ সাঈদ। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী সাবিরা মাহবুব জনি। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করে মুক্তবিহঙ্গ একাডেমি, ইস্কাটন গার্ডেন হাই স্কুল ও হযরত শাহ আলী মডেল হাই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা।

কথামালায় উঠে এলো—গণভবনে না থেকে বঙ্গবন্ধু থাকতেন তাঁর বাসায়, ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে। নিরাপত্তাব্যবস্থা তত কড়া ছিল না সেখানে। আজকের এ যুগে তা কল্পনাও করা কঠিন। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে যে কেউ দেখা করতে পারত, কথা বলতে পারত।

মানুষের প্রতি অতিরিক্ত বিশ্বাসই সর্বনাশের কারণ হয়েছে উল্লেখ করে ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, “নতুন গণভবন নির্মাণ করা হলে অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে পরামর্শ দিয়েছিলেন সেখানে উঠতে। তখন তিনি বলেছিলেন, তোরা কি আমাকে সাধারণ মানুষ থেকে দূরে রাখতে চাস?”

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িটি যখন কতিপয় সেনা কর্মকর্তা ঘিরে ফেলেন তখন বঙ্গবন্ধু তৎকালীন সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহকে ফোন করেছিলেন। বলেছিলেন প্রতিরোধ করার জন্য। অন্য প্রান্ত থেকে সেনাপ্রধান সফিউল্লাহ বলেছিলেন, ‘আমার কিছু করার নেই। আপনি পালিয়ে যান। ’

সফিউল্লাহর এমন আচরণকে দেশদ্রোহ হিসেবে উল্লেখ করেন ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘তৎকালীন সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহ বলেছেন অফিসাররা বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা জানত। যড়ষন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিল। তখন সেনাপ্রধান হয়ে তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। ’

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক নেতৃত্বেই স্বাধীন ভূখণ্ড উপহার দিয়েছিলেন বাঙালি জাতিকে। সারা জীবন বাঙালি জাতির উন্নয়নের কথা ভেবেছেন, কাজ করে গেছেন তিনি। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে গড়ে চার দিনের এক দিনই কারাগারে কাটিয়েছেন। কারাগারে বসেও তিনি ভেবেছেন এ জাতির কথা। ’

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পঁচাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই পর্যন্ত দীর্ঘ একুশ বছর ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলো নানা অপপ্রচার চালিয়েছে, মিথ্যাচার করেছে। কিন্তু ইতিহাসের সত্য কখনো চাপা থাকে না। সেই সত্য এখন দিবালোকের মতো প্রস্ফুটিত হয়েছে। যত দিন যাচ্ছে, ততই স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে উঠছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর ভরসাতেই, তাঁর নেতৃত্বগুণেই একাত্তরে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। তাঁর দেখানো পথেই বাংলাদেশ সারা বিশ্বে এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা তন্ময় হয়ে শুনছিল বঙ্গবন্ধুর কথা। বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্বল্পসময়েই একটি যুগান্তকারী আদর্শ সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন। প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার সুরক্ষার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি ব্যক্তিমালিকানা, সমবায় ও রাষ্ট্রায়ত্ত—এই তিন স্তরের মালিকানা পদ্ধতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার চেষ্টা চালান। বঙ্গবন্ধুর ধারাবাহিকতা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার অনুসরণ করে ইতিমধ্যে দেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করেছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী ও সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই তাঁর স্বপ্ন সফল হবে, বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা সম্ভব হবে। ’


মন্তব্য