kalerkantho


সব কিছুতে জোড়াতালি

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সব কিছুতে জোড়াতালি

সকাল ৮টা ২০ মিনিট। পুরুষদের জন্য নির্ধারিত টিকিট কাউন্টারের সামনে চারজন এবং মহিলা কাউন্টারের সামনে ৯ জন সারিতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে।

তখনো কাউন্টারে টিকিট দেওয়া শুরু হয়নি।

ডান পাশ দিয়ে হাসপাতালের মূল ভবনে প্রবেশ করে সেখানে বহির্বিভাগের চিকিৎসকদের কক্ষের সামনের পাকা বসার স্থানে কয়েকজন লোককে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। এ সময় ২ থেকে ১০ নম্বর পর্যন্ত চিকিৎসকদের কক্ষগুলোর মধ্যে কয়েকটি খোলা এবং কয়েকটি তখনো তালাবদ্ধ দেখা যায়।

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে শেরপুর জেলা হাসপাতালে গিয়ে প্রথমে এমন চিত্র দেখা যায়। এরপর কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা-অসুবিধা, অনিয়মসহ নানা চিত্র দেখা গেছে।

সকাল ৮টা ৪০ মিনিট। খোলা হয়েছে ওষুধ কাউন্টার। টিকিট দেওয়া শুরু হলে রোগীর ভিড়ও বাড়তে থাকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর সারিও দীর্ঘ হতে থাকে।

পুরুষের চেয়ে নারীদের কাউন্টারেই ভিড় বেশি দেখা যায়। এ সময় বহির্বিভাগের ৫ নম্বর কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী নিজেকে ওই কক্ষের দায়িত্বে থাকা কর্মচারী দাবি করলেও তিনি নিজের নাম জানাতে চাননি। তবে তিনি জানান, এই কক্ষে নারী চিকিৎসক বসবেন। কিন্তু সাড়ে ৯টার আগে এই চিকিৎসক সাধারণত আসেন না।

সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে ৪ নম্বর কক্ষের সামনে সিরিয়াল নিয়ে চিকিৎসকের অপেক্ষা করছিলেন সদর উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের ভাটিপাড়া গ্রামের ফিরোজ মিয়া (৫২)। তিনি বলেন, ‘ডাক্তরেরা গাফেলতি করে, সুময়মতো আয়ে না, বয় না। এক ঘণ্টা ধইরা টিগেট কাইট্টা অফেক্ষা করতাছি, কিন্তুক ডাক্তর আইতাছে না। শইল খালি ম্যাজ ম্যাজ করে, বল-শক্তি পাইন্না। গরিব মানুষ, দিন কামলা দিয়া খাই। হাসপাতালের ওষুধ বালা, অইন্নাইগ্গা ডাক্তর দেহাবার আইছি। ’

সেই কক্ষের সামনের দেয়াল লাগোয়া পাকা আসনে বসে অপেক্ষা করছিল আরো কয়েকজন। তাদের মধ্যে শ্রীবরদী উপজেলার ইন্দিলপুর গ্রাম থেকে আসা আব্দুস সামাদ (৬৫) বলেন, ‘গতকাল (সোমবার) এসে ঘুরে গেছি, ডাক্তর দেহাবার পাইন্নাই, আইজ আবার আইছি। অণ্ডকোষে সমস্যা, একটা বড় হয়ে গেছে। এই ডাক্তরে নেইক্কা দিলে দোতালার আরেক ডাক্তরে নাকি দেকবো। কিন্তু অহনাও তো এই ডাক্তরই আয়ে নাই। ’ ৪ নম্বর কক্ষে বসার কথা মেডিক্যাল অফিসার ডা. রবিউল হক খানের।

দেখতে দেখতে বহির্বিভাগের বিভিন্ন কক্ষের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি পড়ে যায়। এর মধ্যে ৩, ৪, ৫ ও ৭ নম্বর কক্ষের সামনে সবচেয়ে বেশি রোগীর ভিড় দেখা যায়।

সকাল ৯টা ৩২ মিনিটে ৫ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করেন ডা. তাশফিকা বিনতে ফারুক। ৯টা ৪২ মিনিটে ডা. রবিউল হক খান প্রবেশ করেন ৪ নম্বর কক্ষে। কাছাকাছি সময়ে ৭ নম্বর কক্ষে ডা. উম্মে জান্নাতুল ফেরদৌস, ১০ নম্বরে ডা. হোসনে আরা সুমি এসে বসেন।

১০টা ২০ মিনিটে ওষুধ বিতরণ কক্ষের সামনে একজনকে রোগীদের টিকিট নিয়ে নিজের মোবাইল ফোনে ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলতে দেখা যায়। জানতে চাইলে তিনি নিজের নাম খোরশেদ আলম এবং বিকন ফার্মার বিক্রয় প্রতিনিধি বলে দাবি করেন। তিনি কেন রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের ছবি তুলছেন—এমন কথা বলতেই ‘ভাই ভুল হয়ে গেছে। নতুন চালরি নিয়েছি, বুঝিনি’ বলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।

১০টা ২৮ মিনিটে ৬ নম্বর কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, ডেন্টাল সার্জন মো. জাহাঙ্গীর আলমের চেয়ার খালি। তাঁর সহকারী মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ডেন্টাল) মো. আনোয়ার হোসেন রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। তিনি জানান, ডা. জাহাঙ্গীর তিন দিনের ছুটিতে আছেন।

সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে ৫ নম্বর কক্ষের সামনে এক নারীকে হাউমাউ করে কেঁদে ঊঠতে দেখা যায়। তিনি কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগে পাঁচ হাজার টাকা ছিল। ভাতিজিকে চিকিৎসক দেখানোর জন্য আধা ঘণ্টা ধরে সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ ব্যাগে হাত দিয়ে দেখেন তাঁর টাকা নেই। তিনি বলতে থাকেন, ‘আমার কী হবেগো, ট্যাহা কোডাই পামু গো। ’ শহরের নবীনগর এলাকায় তাঁর বাড়ি বলে ওই নারী জানান।

এর আগে সকালে হাসপাতালে এসে কার্যালয় কক্ষ, পুরুষ ওয়ার্ড, দোতলার মহিলা ওয়ার্ড ও তিন তলার শিশু ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা যায়, দেয়ালে দেয়ালে লেখা রয়েছে, ‘দালাল, পকেটমার থেকে সাবধান’, ‘যেখানে সেখানে পানের পিক-থুথু ফেলবেন না, ধূমপান নিষেধ’, ‘লাইনে দাঁড়িয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে সেবা নিন’, ‘আপনার শিশুকে টিকা দিন’—এমন আরো নানা ধরনের স্বাস্থ্য ও সচেতনতামূলক বার্তা।

হাসপাতালের কর্মচারীদের কয়েকজন জানালেন, আগের চেয়ে হাসপাতালের পরিবেশ অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়েছে। তবে অধিক রোগী আর তাদের সঙ্গে আসা লোকজনের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।  

সকাল ১১টা। তখনো হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. নাহিদ কামাল আসেননি। ৩ নম্বর কক্ষে বসে এদিন শিশু রোগী দেখার কথা ছিল তাঁর। কক্ষের সামনে শিশু রোগী ও অভিভাবকদের ভিড় লেগে যায়। যে কারণে জরুরি বিভাগের দায়িত্বে থাকা মেডিক্যাল অফিসার ডা. খায়রুল কবীর এক ফাঁকে ৩ নম্বর কক্ষে এসে রোগী দেখেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে সকালের দিকে আসতে না পারলেও পরে অফিস করেন আরএমও ডা. নাহিদ কামাল। এদিন তিনি একটি লাশের ময়নাতদন্ত শেষ করেন।

সকাল সোয়া ১১টা। জরুরি বিভাগে পরিচিত এক কর্মচারী এই প্রতিনিধিকে দেখে বলে ওঠেন, ‘কী ভাই, কখন এলেন, কী ব্যাপার। ’ উদ্দেশ্যের কথা বলতেই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মচারী কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘আসলে এভাবে হয় না, কেউ আসবে ৮টায়, কেউ সাড়ে ৯টায়-১০টায়। আইন সবার জন্যই সমান থাকা দরকার। ইনডোর ও আউটডোরের মেডিক্যাল অফিসাররা সাড়ে ৯টা-১০টার আগে হাসপাতালেই আসেন না, রোগীও দেখেন না। আবার দুপুর ১টা-দেড়টার মধ্যে আউটডোরে রোগী দেখা বন্ধ হয়ে যায়। ’

শেরপুর জেলা হাসপাতালের তথ্য পরিসংখ্যান সহকারী মো. ইয়াসিন বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালটি ১০০ শয্যার। কিন্তু এখানে রোগী ভর্তি থাকছে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ২৭০ জন। বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকে। ১০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও এখানে অনুমোদিত পদের অর্ধেক চিকিৎসকও নেই। ’ তিনি জানান, ৩৬টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৬ জন। উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ছয়জন চিকিৎসককে ডেপুটেশনে এনে কোনোমতে কাজ চালানো হচ্ছে। মেডিক্যাল অফিসারের সাত পদের বিপরীতে আছেন তিনজন। জরুরি বিভাগের তিনটি মেডিক্যাল অফিসারের পদের বিপরীতে আছেন মাত্র একজন। গাইনি বিভাগের দুটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট। প্রায় আট বছর ধরে অর্থোপেডিক কনসালট্যান্টের পদটি খালি। শূন্য রয়েছে শিশু, নাক-কান-গলা ও কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদ। প্যাথলজি, রেডিওলজি, ডেন্টাল, ও এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট পদও শূন্য। এ ছাড়া মেডিক্যাল অফিসারের দুটি পদ, রেডিওলজিস্ট একটি এবং সহকারী সার্জনের দুটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।

বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারে বসেন অফিস সহকারী মোতাহার আলী। তিনি জানান, হাসপাতালের বহির্বিভাগ সকাল ৮টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে দুপুর ১টার পর নতুন করে কোনো টিকিট দেওয়া হয় না। কারণ তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। তবে বহির্বিভাগের চিকিৎসকরা টিকিট থাকা পর্যন্ত রোগী দেখে থাকেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার বহির্বিভাগে পুরুষ ৩৬৩ ও নারী ৪৭১ মিলিয়ে ৮৩৪ জন রোগী টিকিট কেটে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। জরুরি বিভাগেও দুপুর ২টা পর্যন্ত ৪৪ জন রোগী এদিন চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন।

আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. নাহিদ কামাল বলেন, ‘অর্ধেক ডাক্তারও নাই। সব কিছু চলছে জোড়াতালি দিয়ে। ’ তিনি জানান, এক শ জনের খাবার ভাগ করেই ভর্তি রোগীদের খেতে দিতে হচ্ছে। অনেক সময় এতে নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখিও হতে হচ্ছে।

তবে আরএমও বলেন, “তার পরও আমরা সাধ্যমতো সাধারণ মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। এখন হিসাব বিভাগে এক জায়গায় রসিদ দিয়ে সকল ‘ইউজার ফি’ (ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা, কেবিন ভাড়া) নেওয়া হচ্ছে। এতে করে আর্থিক প্রতারণা রোধ হওয়ার পাশাপাশি এক স্থানে মানুষ সেবা পাচ্ছে। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার জন্য স্থানীয় দানশীলদের সহায়তায় সাতজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাখা হয়েছে। ”

ডা. নাহিদ আরো বলেন, ‘চিকিৎসকরা যাতে সময়মতো হাসপাতালে আসেন এ জন্য তিনটা সভা করেছি। বহির্বিভাগে সবাই যাতে সকাল ৯টার মধ্যে নিজ নিজ কক্ষে বসে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে পারেন সেই চেষ্টা চলছে। এ জন্য আমরা প্ল্যানিং করছি। নানাভাবে চেষ্টা করছি। কিন্তু অতিরিক্ত রোগীর চাপ ও চিকিৎসক সংকটের কারণে অনেক সময় কর্তব্যরত ডাক্তাররাও হাঁপিয়ে উঠছেন। ’

এ ছাড়া আরএমও ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিদের চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি জানান। তিনি হাসপাতালে সেবার মান উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে নেওয়া পদক্ষেপের কথা জানান।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), শেরপুর শাখার সাধারণ সম্পাদক ও জেলা হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. নাদিম হাসান বলেন, ‘আমাদের জেলা হাসপাতালে চিকিৎসক সংকটই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। ইনডোরে খুব বেশি সমস্যা না হলেও বহির্বিভাগে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে। জরুরি বিভাগে চিকিৎসক সংকট। তা ছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরও প্রচণ্ড সংকট রয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের শূন্য পদগুলো পূরণ করা দরকার। ’


মন্তব্য