kalerkantho


মহতী উদ্যোগ

কোরীয় দম্পতির বিদ্যালয়

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



কোরীয় দম্পতির বিদ্যালয়

সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে কোরিয়ান দম্পতির প্রতিষ্ঠিত এবিএপি বিদ্যালয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

বংশপরম্পরায় প্রতিটি পরিবারের পেশাই মাছ ধরা। কোনো পরিবারে বিশেষত ছেলে সন্তান জন্ম নেওয়ার পর থেকেই সে বেড়ে ওঠে সাগরের সান্নিধ্য নিয়ে।

ছয়-সাত বছর বয়স থেকেই পরিবারের বড়দের সঙ্গে নেমে পড়ে সাগরে। শুরু করে মাছ ধরা। একসময় পুরোদমে জেলে হয়ে ওঠাই যেন ওদের জীবনের লক্ষ্য হয়ে ওঠে। আর মেয়েসন্তানরা ঘরে থেকে রান্নাবান্না ও গৃহস্থালি সামাল দেয়। ১২-১৩ বছর বয়স হলেই নির্ধারিত নিয়তি বাল্যবিয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ওদের কাছে অনেক দূরের স্বপ্ন।

শিক্ষাবঞ্চিত এই জনপদ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী জেলেপল্লী। সমাজের অন্যান্য অংশ থেকে যুগের পর যুগ ধরে ওরা পিছিয়ে থাকা এক সমাজ। কিন্তু সময় থেমে থাকে না।

অবস্থার পালাবদলও অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা। সে জন্য প্রয়োজন উদ্যোগ, একটু সুযোগ। আর সেই সুযোগ এনে দিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার জনদরদি এক দম্পতি।

সাংকি কিম-মায়াংগোক কুন দম্পতির বাংলাদেশে কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। এ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনো স্বার্থও নেই তাঁদের। এমনকি বাংলা ভাষাটাও জানেন না তাঁরা। তবু বাঙালি জাতির এই অংশটির মাঝে শিক্ষার আলো ছড়ানোর মহতী উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা। সুদূর দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এসে ভাটিয়ারী জেলেপাড়ায় তাঁরা দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করেছেন অত্যাধুনিক একটি বিদ্যালয় ভবন। এবিএপি নামের এই বিদ্যালয়ে অনগ্রসর জেলে সম্প্রদায়সহ উপকূলীয় এলাকার প্রায় ২০০ শিশু পাচ্ছে জ্ঞানের আলো। দিনে দিনে এই উদ্যোগ সমাজসেবার অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একসময় সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি জেলেপল্লীর মানুষের কাছে শিক্ষার তেমন গুরুত্ব ছিল না। সব দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া এই পাড়াতেই একসময় বিদ্যালয় স্থাপনে এগিয়ে আসে কোরিয়ান একটি এনজিও ‘এবিএপি’ (এলাক্রিটি ফর পোভার্টি এলিভিয়েশন ইন বাংলাদেশ)। তারা একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে বিদ্যালয়টি চালাতে থাকে। কিন্তু নিজস্ব জায়গা বা বিদ্যালয় ভবন না থাকায় এই উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছিল না। ব্যাহত হচ্ছিল শিক্ষার অগ্রগতি। এ অবস্থায় এপিএবি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোরিয়ান নাগরিক ইক মো জং বিষয়টি সাংকি কিম ও মায়াংগোক কুন দম্পতির নজরে আনেন।

ইক মো জংয়ের মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন, ভাটিয়ারি জেলেপল্লীর মানুষগুলো শিক্ষায় অনেক পিছিয়ে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তারা লেখাপড়ায় আগ্রহী হয়ে উঠবে। কিন্তু অর্থাভাবে বিদ্যালয়ের জায়গা ও ভবন নির্মাণ করা যাচ্ছে না। সব শুনে বাংলাদেশি অনগ্রসর এই জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে এগিয়ে আসেন এই জনদরদি দম্পতি। তাঁরা বিদ্যালয়ের জন্য জমি ও অত্যাধুনিক ভবন নির্মাণে অর্থ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

অবশেষে কোরীয় দম্পতির অর্থ সহায়তায় সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি এইচ আকবর আলী সড়কে জেলেপাড়ায় ৬০ লাখ টাকা দিয়ে জমি কিনে সেখানে ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে তিন তলাবিশিষ্ট সুদৃশ্য বিদ্যালয় ভবন। অত্যাধুনিক এই বিদ্যালয়ের চেয়ার-টেবিল, ব্ল্যাকবোর্ড, লাইটিং, ফ্যান থেকে শুরু করে কনফারেন্স রুম, শিক্ষকদের কক্ষ, এমনকি শিক্ষকদের বসবাসের জন্যও কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। আধুনিক শিক্ষার বিস্তারে প্রয়োজনীয় সবই করে দিয়েছেন এই দম্পতি। আর এমন সুন্দর পরিবেশ পেয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা উদ্বেলিত।

এবিএপি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অঞ্জু রানী দাস বলেন, ‘বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালে। কিন্তু নিজস্ব জায়গা ও ভবন ছিল না। কোরিয়ান দম্পতি সাংকি কিম ও মায়াংগোক কুন ব্যক্তিগত টাকা খরচ করে জমি কিনে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করে দিয়েছেন।

এলাকার অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি শিক্ষায়তনের চেয়ে এই বিদ্যালয় ভবন ও শ্রেণিকক্ষ অনেক উন্নত। শিক্ষার পরিবেশ মানসম্পন্ন করতে যা যা প্রয়োজন সবই করা হয়েছে। এই বিদ্যালয়ে কেজি ওয়ান থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। বর্তমানে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ১৭৩। ’

শিক্ষক ও অভিভাবকরা জানান, এখানকার বিশেষত জেলে পরিবারের সন্তানরা একসময় তেমন একটা বিদ্যালয়মুখী ছিল না। অত্যাধুনিক পরিবেশ পেয়ে এখন তারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছে। ভাটিয়ারি জেলেপাড়ার জেলে বাবুল জলদাশ বলেন, ‘আগে ছেলেমেয়েরা আমাদের সঙ্গে মাছ ধরা ও ঘরের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত। এ বিদ্যালয় হওয়ার পর উপলব্ধি করলাম—সুযোগ ও সচেতনতার অভাবে আমরা অশিক্ষিত রয়ে গেছি। কিন্তু এভাবে তো আর যুগের পর যুগ চলতে পারে না। ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। তাই মেয়ে শিউলিকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছি। ’

সংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিদ্যালয়টির নবনির্মিত ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন উদ্যোক্তা কোরিয়ান দম্পতি। সে সময় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে সাংকি কিম ও মায়াংগোক কুন বলেন, ‘নিজেদের সম্পদ এখানে উপকূলীয় এলাকার শিশুদের সুশিক্ষিত করার কাজে ব্যয় করতে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত। ’ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তাঁরা বলেন, ‘আমরা পাশে দাঁড়িয়েছি।

কিন্তু তোমাদেরকে লক্ষ্যে স্থির থাকতে হবে। লেখাপড়া করে অনেকদূর যেতে হবে, আলোকিত মানুষ হতে হবে। তাহলেই কোরিয়া থেকে এসে এখানে আমাদের এই উদ্যোগ সফল বলে মনে করব আমরা। ’

কোরিয়ান দম্পতির এই মহানুভবতাকে সাধুবাদ জানান ভাটিয়ারির ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ নাজিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘সুদূর কোরিয়া থেকে এসে এক দম্পতি আমাদের এলাকায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার আলো জ্বেলেছেন। তাঁদের এই মহতী উদ্যোগের সাফল্য ও লক্ষ্য পূরণে যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকতে চাই। ’

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, ‘অনগ্রসর শ্রেণিকে সুশিক্ষিত করতে কোরিয়ান দম্পতি এবং এনজিও এবিএপির উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। আমি বিদ্যালয়টি ঘুরে দেখেছি। খুবই সুন্দর একটি প্রতিষ্ঠান।

বিদেশ থেকে এসে কেউ আমাদের জাতির জন্য কাজ করছে এটি ভাবতেও ভালো লাগে। আশা করব, বিদেশি এই দম্পতির এমন মহতী উদ্যোগ দেখে আমাদের দেশের বিত্তশালী ব্যক্তিরাও জাতিকে শিক্ষিত করে তুলতে এগিয়ে আসবেন। ’


মন্তব্য