kalerkantho


মুন্সীগঞ্জে মাজারের খাদেম-ভক্ত দুই বোনকে গলা কেটে হত্যা

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মুন্সীগঞ্জে মাজারের খাদেম-ভক্ত দুই বোনকে গলা কেটে হত্যা

প্রতীকী ছবি

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার কাটাখালির ভিটি শীলমন্দির এলাকায় একটি মাজারের খাদেম ও ভক্ত দুই বোনকে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গত মঙ্গলবার রাতের কোনো এক সময় মাজারের ভেতরেই এই হত্যার ঘটনা ঘটে।

খবর পেয়ে পুলিশ গতকাল বুধবার সকালে তাঁদের লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করে।

নিহতরা হলেন ভিটি শীলমন্দিরের হজরত শাহ সোলেমান বা বারেক লেংটার মাজারের খাদেম আমেনা বেগম (৬০) এবং ভক্ত ও তাঁর বোন তাইজুন খাতুন (৪৮)। আমেনা গজারিয়া উপজেলার চরঝাপটা গ্রামের মৃত খালেক মিঝির স্ত্রী। আর তাইজুন সদর উপজেলার বকচর গ্রামের কাশেম বেপারীর স্ত্রী।

এই জোড়া খুনের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ মাজারের প্রতিষ্ঠাতা ও খাদেম মাসুদ কোতওয়াল (৫৫) এবং স্থানীয় বাবু (২৫) নামের এক ব্যক্তিসহ পাঁচজনকে আটক করেছে।

এদিকে ঘটনাস্থলে মানিব্যাগ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সামগ্রী পাওয়া গেছে। সে ক্ষেত্রে হত্যার আগে ওই দুই নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কি না বা হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে এসব ফেলে রাখা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। মাজারের জমি, টাকা-পয়সা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ ছিল কি না তাও পুলিশ খতিয়ে দেখছে।   

তবে ময়নাতদন্তের পর মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. এস এস শওকত কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের লক্ষণ পাওয়া যায়নি।

তবে পরীক্ষার জন্য আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। তিনি জানান, দুই নারীকে একইভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, মাজারের খাদেম মাসুদ কোতওয়াল গতকাল সকালে মাজারে গিয়ে দরজা খোলা এবং গলা কাটা অবস্থায় ওই দুই নারীর লাশ দেখতে পান বলে পুলিশকে জানান। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

নিহতের স্বজনদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, তাইজুন ঢাকায় থাকেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি এই মাজারে বোনের কাছে এসেছিলেন। এর আগেও তিনি বেশ কয়েকবার মাজারে এসেছেন।

মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ময়নাতদন্ত শেষে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলের আশপাশে পাওয়া কিছু আলামতে হত্যার আগে তাঁদের ধর্ষণ করা হয়েছে নাকি ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে এসব ফেলে রাখা হয়েছে সন্দেহ করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত শেষে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

তিনি আরো বলেন, মাজারে আয়ের টাকা নিয়েও এ ঘটনা ঘটতে পারে। বিস্তারিত তদন্তের পর এ বিষয়ে জানা যাবে। তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাজারের খাদেম মাসুদ কোতওয়ালসহ পাঁচজনকে আটক করে মুন্সীগঞ্জ সদর থানায় রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

সদর থানার ওসি মো. আলমগীর হোসাইন জানান, মাজার নিয়ে বিরোধ বা ধর্ষণজনিত কারণে এই হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। মাজারের জমি, টাকা-পয়সা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ ছিল কি না—এসব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে।

এদিকে গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, ক্ষেতের (জমির) মাঝে বালু দিয়ে ভরাট করে তৈরি টিনশেড একটি ঘর। সামনে একটি সাইনবোর্ডে লেখা আছে, ‘হজরত শাহ সোলেমান লেংটা বাবার (পাগল)/দিলু লেংটা/এখানে বারেক লেংটার মাজার/মৃত্যু : ২৮ শ্রাবণ, ১৪০৫ সন/খাদেম-মাসুদ লেংটা’। ঘরের এক পাশে মাজার আরেক পাশে খাদেম আমেনা থাকতেন। মাজারের আশপাশে বসতি কম।

তবে মাজারের খাদেম ও ভক্তের খুন হওয়ার খবর জানতে পেরে গতকাল স্বজনদের পাশাপাশি শত শত মানুষ মাজারে ভিড় করে। বয়স্ক এই নারীদের এভাবে হত্যার ঘটনায় সবাই বিস্ময় প্রকাশ করে।

স্থানীয় ৪, ৫, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হোসনে আরা জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমেনা খাতুন মাজারটির দেখভাল করছেন। প্রতি বৃহস্পতিবার এখানে ভক্তরা আসে। জিকির হয়। গানবাজনা হয়। প্রতি চৈত্র মাসে এখানে ওরসও হয়।

তবে মাজারের আশপাশের লোকজন জানায়, মাজারকে ঘিরে মাদকের আড্ডা বসত।

আমেনার ছেলে মো. জাবেদ জানান, তাঁর বাবা খালেক মিজি মারা যাওয়ার পর থেকেই তাঁর মা মাজারে খাদেম হিসেবে ছিলেন। গতকালও মায়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে তাঁর কথা হয়েছিল। কে বা কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে সে সম্পর্কে তিনি কিছু ধারণা করতে পারছেন না।

এ ছাড়া তাইজুনের ছেলে কফিল উদ্দিন ও মেয়ে রূপজান জানান, তাঁদের মা দুই ছেলের সঙ্গে ঢাকার শ্যামপুরে থাকতেন। প্রায়ই তিনি এই মাজারে আসতেন। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি মাজারে আসেন। তাঁদের মায়ের কোনো শত্রু নেই বলে দাবি এই ভাই-বোনের।

আটক হওয়ার আগে মাজারের খাদেম মাসুদ কোতওয়াল জানান, ১৯৮৮ সালের বন্যার পর তিনি এই মাজার প্রতিষ্ঠা করেন। প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তিনি বলেন, তাঁর একটা অসুখ ছিল। অনেক ডাক্তার দেখিয়েও তিনি ভালো হচ্ছিলেন না। পরে বারেক লেংটার অসিলায় তিনি ভালো হন। এরপর বারেক লেংটা মারা গেলে তিনি এখানে তাঁর মাজার প্রতিষ্ঠা করেন। এর পর থেকে তিনি এই মাজারের খেদমত করেন। তবে মাসুদ জানান, গরু পালন ও দুধ বিক্রি করে তাঁর সংসার চলে।  


মন্তব্য