kalerkantho


পুলিশের আশকারায় বখাটেরা বেপরোয়া

দুপচাঁচিয়ায় দুই স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা

লিমন বাসার, বগুড়া   

১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



পুলিশের আশকারায় বখাটেরা বেপরোয়া

রজিফার পর মিলি, এবার কে—এমন প্রশ্ন এখন বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বখাটেদের অত্যাচারে দুই স্কুলছাত্রীর অপমৃত্যুর পর ঘুরেফিরে আসছে এসব প্রশ্ন।

পুলিশের সঙ্গে অভিযুক্ত বখাটে-সন্ত্রাসীদের যোগাযোগের অভিযোগ এবং এখন পর্যন্ত জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় প্রশ্নগুলো আরো জোরালো হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপচাঁচিয়ার বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে এমন তথ্য। তারা বলেছে, এলাকায় প্রকাশ্যে জুয়ার আসর, মাদক বিক্রি ও সেবনে পুলিশের সহযোগিতার কারণেই এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

দুপচাঁচিয়া উপজেলার মোস্তফাপুর গ্রামে মিলি খাতুন (১২) যে ঘরে আত্মহত্যা করে বলে প্রচার করা হয়েছে, সেটি টিনের চালার ছোট্ট একটি খুপরি ঘর। সেখানে একটি চৌকি ও ভাঙা টেবিল ছাড়া কিছুই নেই। স্থানীয়রা বলছে, পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মিলির পক্ষে একা নিজ ঘরের বাঁশের তীরের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো সম্ভব নয়। গ্রামবাসী বলছে, বখাটেরা মোস্তফাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী মিলিকে উত্ত্যক্ত করত অনেক আগে থেকেই। অসহায় মেয়েটি বিচার চাইতে পারেনি কারো কাছে। কারণ মিলির মতোই অসহায় হয়ে ছিল গ্রামের অন্য মানুষও।

ঘটনার নায়ক বুলু মণ্ডল (২৮) এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী। সব সময় অস্ত্র নিয়ে ঘোরা এই সন্ত্রাসীর সঙ্গে দহরম-মহরম ছিল দুপচাঁচিয়া থানা পুলিশের। বুলুর কাছ থেকে বখরা নিত তারা। এ কারণে এলাকায় বুলুর মারাত্মক প্রভাব ছিল।

গত সোমবার রাতে মোস্তফাপুর গ্রামে নিজের ঘর থেকে মিলি খাতুনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির সময় তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে—গ্রামবাসীর এমন দাবির মুখে পুলিশ লাশ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

এ ঘটনার মাত্র এক দিন আগে একই উপজেলার জিয়ানগর গ্রামে বখাটে যুবক হুজাইফাতুল ইয়ামিনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে রজিফা আক্তার সাথী (১৪) নামের এক স্কুলছাত্রী আত্মহত্যা করে। সে স্থানীয় জিয়ানগর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের এক নম্বর রোলধারী ছাত্রী ছিল। এ ঘটনায়ও পুলিশ এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

সন্ত্রাসী বুলু ও ছদরুলের দাপট : দুপচাঁচিয়ার মোস্তফাপুর গ্রামের জাহিদ হোসেন মণ্ডলের ছেলে বুলু মণ্ডল (২৮) ও আবুল ফকিরের ছেলে ছদরুল ফকির (২৫)। মিলি আত্মহননের ঘটনায় অভিযুক্ত তারা। বুলু বাড়িতে স্ত্রী, এক ছেলে ও মেয়ে নিয়ে থাকে। তার মেয়েও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। একই স্কুলে পড়া মিলির বান্ধবী ছিল সে। গতকাল গ্রামে গিয়ে বুলুর বাড়ি তালাবদ্ধ পাওয়া গেছে। আশপাশের মানুষ তার ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে রাজি হয়নি।

ছদরুলের বাড়িতে গিয়ে জানা গেছে, তার দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী তিন সন্তান নিয়ে বাবার বাড়ি কুলসরদিপুর গ্রামে থাকেন। দ্বিতীয় স্ত্রী আফরোজাও এক ছেলেকে নিয়ে মোস্তফাপুর গ্রামে থাকেন। ছদরুলের বাবা আবুল ফকির দিনমজুরের কাজ করেন। তিনি দাবি করেন, বুলুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও ওই ঘটনার সঙ্গে ছদরুল কোনোভাবেই জড়িত নয়।

গ্রামবাসী জানায়, বুলুর ভয়ে এলাকার কোনো মানুষই মুখ খোলে না। সে সুদ, জুয়া, মাদক কারবার ও সেবন করে। গ্রামের কয়েকজন নারীকেও হয়রানি-নির্যাতন করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার সঙ্গী ছদরুল চুরি করে দিন চালায়। বিভিন্ন মানুষের খড়ের পালায় অগ্নিসংযোগ, পুকুরের মাছ চুরিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত সে। বুলু সব সময় কোমরে অস্ত্র রাখে। কেউ কিছু বললেই অস্ত্র নিয়ে তেড়ে যায়।

পুলিশের সঙ্গে সখ্য : পুরো বগুড়ার মধ্যে দুপচাঁচিয়ায়ই এখন সবচেয়ে বড় জুয়ার আসর বসে। দূরদূরান্ত থেকে জুয়াড়িরা এসে সারা রাত জুয়া খেলে। তাদের মাদক সেবন করানো হয় ফ্রি। এর মধ্যে মোস্তফাপুরে আজিম উদ্দিন মিস্ত্রি চালান একটি আসর। এটি বাকাদহ খাড়িয়ার মধ্যে বসে। আজিম মিস্ত্রি দুপচাঁচিয়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। দুই মাস আগে জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দিন শেখ হেলালের হাতে ফুল দিয়ে শ্রমিক লীগে যোগ দিয়েছেন।

বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র দাবি করেছে, আজিম মিস্ত্রির খাস লোক হলো বুলু মণ্ডল। আজিমের অবর্তমানে জুয়ার বোর্ড পরিচালনার দায়িত্ব থাকে বুলুর ওপর। বুুলুর মাধ্যমেই থানায় প্রতি মাসের জুয়ার বোর্ডের বখরা হিসেবে ৯ লাখ টাকা দেন আজিম। আজিমের সহায়তায় বুলু তার নিজ গ্রাম মোস্তফাপুরে আরো একটি জুয়ার আসর চালাত। বর্তমানে সেটি বন্ধ রয়েছে।

দুপচাঁচিয়া পৌর শহরের মধ্যেই চকরামপুর এলাকায় আরো একটি বড় জুয়ার আসর চালায় শাহেদ আলী হুলু নামের একজন। সে থানায় দেয় মাসে ১১ লাখ টাকা। এ কারণে পুলিশ এ আসরের দিকে তাকায় না। প্রতিরাতে এলাকার স্কুল-কলেজের ছাত্র থেকে শুরু করে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন এসে জুয়ার আসরে অংশ নিয়ে নিঃস্ব হয়ে ঘরে ফেরে।

পৌর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মজিদ নামের একজন ব্যবসায়ী জানান, অনেক আগে একটি জুয়ার আসরে একজন পুলিশ সদস্য বিনা অনুমতিতে চলে গিয়েছিলেন। তথন ক্ষিপ্ত হয়ে হুলুর লোকজন তাঁর কোমরের বেল্ট খুলে নেয়। কিন্তু সে ঘটনার কোনো বিচার হয়নি। আবার দুপচাঁচিয়ায় বখাটের উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করা রজিফা আক্তার সাথীকে উত্ত্যক্তকারী হুজাইফাতুল ইয়ামিন ও তার বাবা আমিনুর রহমান মীরকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে পুলিশ তাদের লোকজনের হাতে লাঞ্ছিত হয়। সেখানে পুলিশের একটি ওয়াকিটকি ছিনিয়ে নেওয়া হয়, যা এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

মোস্তফাপুর গ্রামের বাসিন্দা গৃহবধূ সাবিনা ইয়াসমিন জানান, প্রতি সপ্তাহে বুলুর কাছে পুলিশ আসত। তারা টাকা নিয়ে চলে যেত। গ্রামের মানুষ জানে, পুলিশের সঙ্গে বুলুর সুসম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে ভয়ে কেউ কিছু বলত না।

একই রকম ঘটনা জানা গেছে আরেক বখাটে হুজাইফাতুল ইয়ামিনের ক্ষেত্রেও। তার যন্ত্রণায় এলাকার কোনো মেয়ে স্কুলে যাতায়াত করতে পারত না। এ ব্যাপারে একাধিকবার সালিস বৈঠক হলেও কোনো লাভ হয়নি। ইয়ামিন মাদক সেবন করে। রাতে জুয়ার আসরে বসত। তার বাবার একটি কীটনাশক ওষুধ বিক্রির দোকান রয়েছে। ছেলের অপকর্ম জেনেও তিনি বাধা দিতেন না।

এ ব্যাপারে জুয়ার আসর পরিচালনাকারী আজিম উদ্দিন মিস্ত্রি ও শাহেদ আলী হুলু সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি। তবে দুপচাঁপিয়া থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শাহেদ আলী হুলু জুয়ার আসর আমার এলাকায় বসত। পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আজিম মিস্ত্রির আসর বসত তিন থানার (কাহালু, ক্ষেতলাল ও দুপচাঁচিয়া) সীমান্তে। যার জন্য তাকে ধরা যেত না। তবে আমার এলাকায় যখন থাকত তখন জুয়ার আসর ভেঙে দিয়ে মামলাও করা হয়েছে। বুলু মাদকসেবী। পুলিশ তার কাছ থেকে কোনো টাকা নেয়নি। নিলে তো মামলা করত না। আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সর্বশেষ অবস্থা : স্কুলছাত্রী মিলি খাতুনের মা বেলি খাতুন অসুস্থ হয়ে মোস্তফাপুর বাজারে পল্লী চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসাধীন। তিনি সন্ত্রাসী বুলু ও ছদরুলের ফাঁসির দাবি জানিয়ে বলেন, তাঁর মেয়েকে অনেক দিন থেকেই এই বখাটে ও তার সহযোগী বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করত। ঘটনার কয়েক দিন আগেও রাস্তার মধ্যে মিলিকে মারধর করে বুলু। এতে তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়।

বেলি খাতুন জানান, তিনি স্বামী পরিত্যক্তা নারী। অন্যের বাড়িতে কাজ করে দিন চালান। মেয়েকে উত্ত্যক্তের বিষয়ে তিনি মিলির বাবা আব্দুর রশিদকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও কোনো ব্যবস্থা নেননি।

মোস্তফাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু জাফর জানান, মিলি শান্তশিষ্ট প্রকৃতির মেয়ে ছিল।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই নাছির হোসেন জানান, আত্মহত্যায় প্ররোচনাদানকারী বুলু ও ছদরুলকে গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার করতে পারলেই প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে।

রজিফা আক্তার সাথীর বাবার করা মামলার আসামি বখাটে হুজাইফাতুল ইয়ামিন ও তার বাবা আমিনুর রহমান মীরকে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি।


মন্তব্য